বিবাহের পর মতিকে লইয়া কুমুদ চলিয়া গিয়াছ।

কোথায়! হনিমুনে! গাওদিয়ার গেঁয়ো মেয়ে মতি, তাকে লইয়া কুমুদ চলিল হনিমুনে। কিছু টাকা দে শশী।

পরাণের কাছে এ ব্যাপারটা বড় দুর্বোধ্য ঠেকিয়াছে। কনে-বউকে সঙ্গে লইয়া অনির্দিষ্ট ভ্রমণে বাহির হওয়া? এ কোনদেশী রীতি মতিকে লইয়া গিয়া উঠিতে পারে এমন আত্মীয়স্বজন কুমুদের কেহ নাই পরাণ তাহা জানিত। সে আশা করিয়াছিল কুমুদ এখন সন্ত্ৰীক কিছুদিন শশীর বাড়িতেই বাস করিবে। তারপর মতির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করিয়া সংসার পাতিয়া বসিবে শহরে অথবা গ্রামে। রাতারাতি বোনটাকে লইয়া কোথায় উধাও হইয়া গেল কুমুদ?

এ বিবাহে পরাণের আনন্দ হয় নাই, শুধু শশীর মুখ চাহিয়া সে সম্মতি দিয়াছিল। হোক সে গরিব গ্রাম্য গৃহস্থ, মতির সে বড়ভাই, কুমুদের গুরুজন,–কিন্তু আগাগোড়া কী উদ্ধত অপমানজনক ব্যবহার কুমুদ তার সঙ্গে করিয়া গিয়াছে! শশীও এটা লক্ষ করিয়াছিল। রাগ তাহার কম হয় নাই। মতিকে যদি কুমুদ বিবাহ করিতে পারে, মতির দাদাকে সম্মান করিতে পারবে না? কিন্তু মুখে সে কিছুই বলে নাই কুমুদকে। শুধু তার সামনে পরাণের সঙ্গে করিয়াছিল প্রীতি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার,–কুমুদ যাতে দেখিয়া শিখিতে পারে। শশীর এ চেষ্টার বিশেষ কিছু ফল হয় নাই। মতির আত্মীয়-পরিজনের প্রতি অসীম অবজ্ঞা দেখাইয়া মতিকে কুমুদ গ্রহণ করিয়াছিল।

মাঠে পরাণের খেজুররস জ্বাল হইতেছে। দুপুরে ছাড়া শশীর সময় হয় না বলিয়া পরাণ দেড় মাইল পথ হাটিয়া আসিয়া কাজের ক্ষতি করিয়া শশীর কাছে বসিয়া থাকে। চওড়া সবল কাঁধদুটি যেন তাহার শ্রাত্তিতে ঢালু হইয়া আসে। বলে পত্র দেয় না কেন ছোটোবাবু?

শশী অপরাধীর মতো বলে, কী জানো পরাণ, চিঠিপত্র লেখা কুমুদের অভ্যাস নেই। কলেজে পড়বার সময় ওর বাবা হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে লিখে ওর খবর নিতেন।

তাই বলে একবারটি জানাবে না কোথায় গেল, কোথায় উঠল, কী বিত্তান্ত? মা ইদিকে কাঁদাকাটা জুড়েছে।

কুমুদকে মনে মনে অভিশাপ দিয়া শশী বলে, আসবে পরাণ, পত্র আসবে। খবর না দিয়া পারে? আজ হোক কাল হোক খবর একটা দেবেই।

পরাণ কেমন একপ্রকার স্তিমিত বিষন্ন দৃষ্টিতে শশীর দিকে চাহিয়া থাকে। নীরবে সে যেন কিসের নালিশ জানায়, মূক প্রাণীর মতো। শশীর অস্বস্তির সীমা থাকে না। হারু ঘোষের পরিবারে ভালোমদের দায়িত্ব শশীকে কেহ দেয় নাই, তবু চিরদিন ওদের মঙ্গল করিতে চাহিয়াছে বলিয়া আপনা হইতে দায়িত্ব যেন তাহার জন্মিয়াছে। কিন্তু কী মঙ্গল সে করিতে পারিয়াছে ওদের? তার দোষ নাই, তবু তারই জন্য কুসুম যেন কেমন হইয়া গেল। একটা খাপছাড়া বিপজ্জনক বিবাহ হইল মতির হয়তো পরাণ আজ এসব হিসাব করিয়া দেখিতেছে, হয়তো তাদের অসমান বন্ধুত্বের ফলাফলে বিচলিত হইয়া উঠিয়াছে পরাণ, ভীত হইয়া ভাবিতেছে ভালো করিতে চাহিয়া আরও না জানি কত মন্দ শশী তাদের করিবে!

শশী জানে মুখ ফুটিয়া পরাণ কোনো বিষয়ে তাহাকে দোষী করিরে না।– শুধু বিষন্ন চিন্তিত মুখে দুর্বোধ্য-রহস্য-দ্রষ্টা শিশুর মতো তার দিকে চাহিয়া থাকিবে। দীর্ঘদেহ নির্ভরশীল সরল লোকটির জন্য শশীর মন মমতায় ভরিয়া যায়। ভাবে যেমন করিয়াই হোক মতিকে সুখী করিতে কুমুদকে সে বাধ্য করবে। মতি বদলাক, মতিকে কুমুদ যেমন খুশি গড়িয়া তুলুক-তার মুখে চোখে উপচানো সুখের সঙ্গে পরাণের ঘটা চাই।

শুধু মতির জন্য নয়, নানা দিকে শশীর চিত্তা বাড়িয়াছে। তার মধ্যে বিন্দুর সম্বন্ধে চিন্তাটা গুরুতর। দিন দিন বিন্দু কেমন হইয়া যাইতেছে। ভুলিয়া থাকিতে পারবে বলিয়া প্রকান্ড সংসারটা চালানোর ভার শশী মাসি-পিসির কবল হইতে ছিনাইয়া বিন্দুর হাতে তুলিয়া দিয়াছিল। বিন্দু জীবনে কখনও সংসার পরিচালনা করে নাই। সে কেন এ ভার বহন করিতে পরিবে? তা ছাড়া বিন্দুর ভালোও লাগে নাই। সব ভার সে আবার একে একে মাসি-পিসিকে ফিরাইয়া দিয়াছে। কাজ করিতে বিন্দুর আলস্য বোধ হয়। মানুষের সঙ্গ তাহার ভালো লাগে না। কথাবার্তা কারো সঙ্গেই সে বেশি বলে না, নিজের মনে চুপচাপ ঘরের কোণে বসিয়া থাকে। বসিয়া বসিয়া ঝিমায়। কত কাল অনবরত রাত জাগিয়া সে যেন নিদ্রাতুরা হইয়া আছে এমনিভাবে সর্বদা হাই তোলে অথচ ঘুমায় সে খুব কম। কিছু সে খাইতে চায় না, দিন দিন শুকাইয়া যাইতেছে। আধমরা মানুষের মতো শিথিল নিস্তেজ ভঙ্গিতে সে দীর্ঘ দিবারাত্রি যাপন করে।

শশী ডাক্তার মানুষ, বিন্দুকে নিজের ঘরে ডাকিয়া লইয়া সে জিভ দ্যাখে, হার্ট পরীক্ষা করে, শরীরের অবস্থা সম্বন্ধে জেরা করে। তারপর সন্দিগ্ধভাবে মাথা নাড়িয়া বলে, কিছু বুঝতে পারলাম না বাপু। গায়ের ডাক্তার, পেটে তো বিদ্যে নেই তেমন একটা ওষুধ দিচ্ছি, কদিন খা, তারপর আবার পরীক্ষা করে দেখব।

বিন্দু বলে, উঁহু, ওষুধ আমি খাব না!

শশী বলে, খাবি। মুখ দিয়ে না খাস, গা ফুঁড়ে দেব। বাপের বাড়ি এসে তুই যদি মরে যাস বিন্দু আমি থাকতে, আমার তাতে কী অপমান হবে বল দিকি?

বিন্দু কাঁদিয়া ফেলে। কাঁদিতে কাঁদিতেই বলে, কী করব দাদা, মনে বল পাই না, দিনরাত হুহু করে জ্বলে মনের মধ্যে।

শশী বলে, কাঁদিস না। আমার ওষুধ খেলেই মন ভালো হয়ে যাবে। বিন্দুর রোগ-নির্ণয় করা শশীর অসাধ্য মনে হয়। মনের মধ্যে দিনরাত হুহু করিয়া জ্বলে। কার জন্য জ্বলে, কেন? জীবনটা ব্যর্থ হইয়া গেল বলিয়া মানুষ কি শোকে এমন নিজীব মৃতপ্রায় হইয়া যায়? নন্দর প্রতি তীব্র বিদ্বেষই তো বিন্দুকে দুদিন সুস্থ ও সবল করিয়া তোলার পক্ষে যথেষ্ট। বিদ্বেষ যদি নাও হয়, আকাশছোয়া অভিমান বিন্দুকে নবজীবন দিতেছে না কেন? নন্দ ক্ষমা করিবে এই আশায় অতগুলি বছর বিন্দু যে অবস্থায় কাটাইয়া আসিয়াছে তাহাতে যদি আজ নন্দর জন্যই বিন্দুর মন হাহাকার করে, শশী তাহাতে বিস্মিত হইবে না। সংসারে এরকম অদ্ভুত মেয়ে দু-চারটা থাকে। কিন্তু নন্দর জন্য মন কেমন করিলে বিন্দুর তো উচিত অস্থির চঞ্চল হইয়া থাকা, কাজ ও অকাজের ভানে ছটফট করা। এমন সে অলস ও অবসন্ন হইয়া আসিবে কেন,—তৈলহীন প্রদীপের মতো কেন সে নিভিয়া যাইতে থাকিবে?

একদিন বিন্দু বলিল, দাদা আলমারির চাবি দাও। বই নেব।

শশী বলিল, বাঙলা বই বেশি তো নেই আলমারিতে। বই যদি পড়িস তো আনিয়ে দেব শহর থেকে।

আলমারিতে যা আছে তাই তো এখন পড়ি, শহর থেকে যখন আনিয়ে দেবে দিও!

শশী চাবির গোছাটা তাহার হাতে দিল। আলমারি খুলিয়া একখানা বই বাহির করিয়া আবার বিন্দু আলমারি বন্ধ করিল বটে, চাবি ফেরত দিল না। বলিল, চাবি আমার কাছে থাক। তুমি তো বেড়াও রোগী দেখে, আর একটা বই বার করতে হলে সারাদিন তোমার দেখাই পাব না।

শশী বলিল, গোছাসুদ্ধ রেখে কী করবি? বই-এর আলমারির চাবিটা খুলে নে।

বিন্দু বলিল, থাক না গোছাসুদ্ধই—ইচ্ছে হলে তোমার বাক্স-প্যাটরা ঘেঁটেও তো সময় কাটাতে পারব দু-দণ্ড? বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না আমি, চাবির দরকার হলে আমায় ডেকো।

এমন সহজভাবে সে কথাগুলি বলিল যে শশীর মনে কোনো সন্দেহই আসিল না। হয়তো অন্যমনস্ক ছিল বলিয়াও শশীর মনে পড়িল না ওষুধের আলমারিতে চার-পাঁচ শিশির গায়ে লাল অক্ষরে বিষ লেখা আছে। বিন্দুকে সে যে কতদিন উৎসুক লোভাতুর দৃষ্টিতে ওষুধের আলমারির দিকে চাহিয়া থাকিতে দেখিয়াছে খেয়াল করিলে তাও হয়তো শশীর মনে পড়িত।

সেদিন বিকেলে মাইল পাচেক দূরে একটা গ্রামে শশী রোগী দেখিতে গিয়াছিল। গ্রামে ফিরিতে রাত প্রায় নটা হইয়া গেল। বাড়ির সামনে পৌঁছিয়াই অন্দরে একটা গোলমাল শশীর কানে আসিল। বাহিরের ঘরগুলি অন্ধকার, জনপ্রাণী নাই। কেবল সিন্ধু এক অন্ধকারে দাঁড়াইয়া মৃদুস্বরে কাঁদিতেছে। শশী ভীত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী হয়েছে রে সিন্ধু?

সিন্ধু কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, মেজদি মরে যাচ্ছে দাদা।

ভিতরে যাইতে শশীর পা উঠিতেছিল না। বিন্দু মরিয়া যাইতেছে? কেন মরিয়া যাইতেছে? সিন্ধু গুছাইয়া তাকে কিছু বলিতে পারিল না। তবু ব্যাপারটা অনুমান করিতে শশীর দেরি হইল না। সন্ধ্যার সময় কী যেন বিন্দু খাইয়া ছিল, তাই এখন মরিয়া যাইতেছে। শশীর বুকের ভিতরটা হিম হইয়া গেল। ডাক্তার মানুষ সে, এরকম খবর পাইয়া জড়ভরতের মতো এখানে দাঁড়াইয়া থাকা উচিত নয়, এসব শশী বুঝিতে পারিতেছিল, তবু খানিকক্ষণ সে নড়িতে পারিল না। বিন্দু বিষ খাইয়াছে। মরিতে চায় বিন্দু? পলকের জন্য শশীর যেন মনে হয় বিন্দুর এ ইচ্ছা সফল হইতে দিলে মন্দ হয় না। আলমারিতে কী বিষ ছিল শশী জানে, সন্ধ্যার সময় বিন্দু যদি তাহ খাইয়া থাকে ওকে সে বঁাচাইতে পারবে। কিন্তু কী হইবে বাঁচাইয়া? বিন্দু ছেলেমানুষ নয়, জীবন সম্বন্ধে দু”প্রাপ্য অভিজ্ঞতা তাহার, ভাবিয়া চিন্তিয়া দুঃখের হাত এড়াইবার চরম পন্থাই সে যদি অবলম্বন করা ঠিক করিয়া থাকে, বাধা দেওয়া কি উচিত হইবে?

কপালের ঘাম মুছিয়া, বাহিরের বিস্তৃত অঙ্গন পার হইয়া কুন্দর ঘরের পাশ দিয়া শশী অন্দরের অঙ্গনে আসিয়া দাঁড়াইল। বিন্দু উঠানেই পড়িয়া আছে, নিজের বমির মধ্যে, বিস্রস্ত বসনে। বাড়ির সকলে এবং পাড়ার অনেকে চারিদিকে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। শশীকে দেখিয়া সকলে কলরব করিয়া উঠিল। মুখরা কুন্দ সকলের কণ্ঠ ছাপাইয়া বলিল, ও শশীদাদা, কী কাণ্ড করছে বিন্দুদিদি দেখুন।

মদের তীব্র গন্ধ শশীর নাকে লাগিতেছিল, সে বিহবলের মতো জিজ্ঞাসা করিল, কী হয়েছে রে কুন্দ?

কুন্দ বলিল, বিকেল থেকে যা কাণ্ড বিন্দুদিদি আরম্ভ করেছিল, যদি দেখতে শশীদাদা এই হাসে, এই কাঁদে, এক্ষুনি আবার গান ধরে দেয়-ভয়ে তো আমাদের হাত-পা সেদিয়ে গেল পেটের মধ্যে। কী করেছে-জানেন? আপনার ওষুধের আলমারি খুলে—

আর কিছু শুনিবার দরকার ছিল না। শশী বিন্দুর কাছে গিয়া বসিল। নাড়ি দেখিয়া কুন্দকে বলিল, এখানে এমন করে পড়ে আছে, ধুইয়ে মুছিয়ে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিতে পারলি না তোরা কেউ?

কুন্দও কৈফিয়ত দিয়া বলিল, ধরতে গেলে কামড়াতে আসে যে!

শশী বলিল, এখন তো ইশও নেই কুন্দ? এক কলসি জল নিয়ে আয়।

বিন্দুকে শশী স্নান করাইয়া দিল। তারপর কয়েকজনের সাহায্যে ধরাধরি করিয়া ঘরে শোয়াইয়া দিল।

 

এও একটা কলঙ্ক বইকী! ক দিন গ্রামে খুব একচোট হৈচৈ হইয়া গেল। ভদ্রপরিবারের অন্তঃপুরে এ কী বিসদৃশ কাণ্ড পুরুষমানুষ মদ খায়, মাতলামি করে, বমি করিয়া ভাসাইয়া দেয়, লোকে নিন্দা করে, কিন্তু আশ্চর্য হয় না। বাড়ির মেয়ে এমন বীভৎস ব্যাপারের নায়িকা হইতে পারে তা যে কল্পনা করাও যায় না। যারা উপস্থিত থাকিয়া বিন্দুর মাতলামি দেখিতে পায় নাই তারা আপশোশ করিয়া মরে,–সকলকে বিস্তারিত বর্ণনা শুনাইতে শুনাইতে প্রত্যক্ষদর্শীদের হয় সুখকর প্রাণান্ত।

সেদিন রাত্রে গোপাল থতোমতো খাইয়া গিয়াছিল, সারারাত্রি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় গুমরাইয়া গুমরাইয়া পরদিন সকালবেলা তাহার ক্রোধের আগুন দাউদাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। বিন্দুকে আনিবার অপরাধে শশীকে সে গালাগালি করিল। অকথ্য, চিৎকার করিয়া বিন্দুকে সে বারবার বলিল দূর হইয়া যাইতে। এমন হতভাগ্য যে মেয়ে, গোপালের বাড়িতে তার একদম ঠাই হইবে না। শশী নির্বাক হইয়া রহিল, বিন্দু ঘরে খিল দিয়াছিল, সেও কোনো সাড়াশব্দ দিল না। সমস্ত সকালটা বাড়ি তোলপাড় করিয়া, একজন মুনিষকে খড়ম দিয়া পিটাইয়া, জামা চাদর লইয়া ছাতা বগলে গোপাল বাহির হইয়া গেল। বলিয়া গেল, কলিকাতা যাইতেছে, কারণ গ্রামে তাহার মুখ দেখাইবার উপায় নাই। ফিরিয়া আসিয়া বিন্দুকে যদি গৃহে দেখিতে পায় বাড়িঘরে গোপাল আগুন ধরাইয়া দিবে।

মেজাজটা শশীর বিগড়াইয়া গিয়াছিল বিন্দুর উপরে কিন্তু তাহার রাগ হইল না। দিন-তিনেক বিন্দুর ঘরের বাহিরে আসিল না-দিবারাত্রি খিল দিয়া ঘরের মধ্যে নিজেকে নির্বাসিত করিয়া রাখিল। শুধু শশীর ডাকাডাকিতে বাহিরে আসিয়া পুকুরে একটা ডুব দিয়া আসে, ঘাড় গুঁজিয়া দুটি ভাত মুখে দেয়, তারপর আবার ঘরে গিয়া খিল বন্ধ করে। কেহ কথা বলিলে জবাবও দেয় না, মুখও তোলে না। তিনদিন পরে কী মনে করিয়া সে ঘরের বাহিরে আসিল, কুন্দর সঙ্গে সহজভাবে দুটি-একটি কথাও বলিল। কিন্তু মিশিতে পারিল না কারো সঙ্গে। এখানে আসিয়া অবধি যেরকম নিজীব নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করিতেছিল তেমনিভাবে দিন কাটিতে লাগিল।

একটা অনাবশ্যক ব্যস্ততার সঙ্গে শশী ঘুরিয়া বেড়ায়, কর্তব্য কাজগুলি সম্পন্ন করে। এতদিন সে রোগীর পরিবারের আত্মীয়-বন্ধুর মতো রোগী দেখিয়াছে, ওষুধের সঙ্গে দিয়াছে আশ্বাস। এখন সে গম্ভীরমুখে রোগীর নাড়ি টেপে, সামান্য কারণে রাগিয়া আগুন হইয়া ওঠে। কোনো কথা একবারের বেশি দুবার বলিতে হইলে বিরক্তির তাহার সীমা থাকে না।

সময়টা চৈত্র মাস। কড়া রোদে মাঠ ভাঙিয়া শশীর পালকি গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে যায়, হুহু করিয়া গরম বাতাস বহিতে থাকে। পালকির মধ্যে নিক্রিয় উত্তপ্ত অবসর শশী ভাবিয়া ভাবিয়া ক্ষয় করিয়া ফেলে। বিন্দুর কথা ভাবে, কুসুম ও মতির কথা ভাবে। কুসুম ও মতির সম্বন্ধে নূতন করিয়া কিছু ভাবিবার নাই। বিন্দুর কথা ভাবিয়া সে কুল-কিনারা দেখিতে পায় না। বিন্দুকে সে-ই নন্দর কবল হইতে ছিনাইয়া আনিয়াছে,-ওর সম্বন্ধেসমস্ত দায়িত্ব তাহার। বিন্দু যে বীভৎস কীর্তি করিয়া লোক হাসাইয়াছে, গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে অকথ্য দুর্নাম রটনা হইতেছে, এ জন্য শশী নিজেকে অরপাধী মনে করে। তারই দোষ। যে বিষয়ে সে দায়িত্ব গ্রহণ করে তাই ভেস্তাইয়া যায়। একটা অদৃশ্য দুর্বার শক্তি যেন অহরহ তার বিরুদ্ধে কাজ করিতেছে। রূপসী সেনদিদির স্নেহপাত্র ছিল, কুরূপা সেনদিদিকে এড়াইয়া চলিবার ইচ্ছার জন্য তাই নিজেকে আজ অশ্রদ্ধা করিতে হয়। পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করিয়াছিল। তারপর যেদিন আপন হইতেই ওদের অভিভাবকের আসনটি সে পাইয়াছে, সেদিন চিনিতে পারিয়াছে কুসুমের মন, নষ্ট করিয়াছে মতির ভবিষ্যৎ। এবার বিন্দুর এই অবস্থা দাঁড়াইল। বিন্দুকে আনিবার সময় কত কল্পনাই সে করিয়াছিল!—ধীরে ধীরে বিন্দুর মনকে সুস্থ করিয়া তুলিবে, গ্রামের শান্ত আবেষ্টনীতে মনে ওর শান্তি আসিবে, তার স্নেহ যত্ন সাহচর্যে স্বামীহীনা নারীর যত রস ও আনন্দ জীবনে থাকা সম্ভব ক্রমে ক্রমে সব আসিবে বিন্দুর জীবনে : বই পড়িতে এবং ভাবিতে শিখাইয়া একটি অপূর্ব অন্তর্লোক ওর জন্য সে সৃষ্টি করিয়া দিবে। তা যে কতদূর অসম্ভব আজ আর বুঝতে শশীর বাকি নাই।

ভাবিতে শশীর কষ্ট হয়, তবু ইহা সত্য যে শুধু নেশার জন্য বিন্দু সেদিন মদ খাইয়াছিল, আর কোনো কারণে নয়। একদিন হয়তো সাড়াশি দিয়া দাঁত ফাঁক করিয়া তাহাকে নন্দর ও-জিনিসটা গিলাইতে হইয়াছিল, আজ মদ ছাড়া বিন্দুর চলে না। তা ছাড়া, শুধু মদের নেশা নয়, সাত বছর ধরিয়া নন্দ তাহাকে যে উত্তেজনায় অস্বাভাবিক জীবন দিয়াছিল, সেই জীবনও বিন্দুর অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে। তাহার বিপুল বিকারগ্রস্ত বিরহ তো শুধু নন্দর জন্য নয়—লজ্জাকর বিলাসিতার জন্য, সংগীত ও উন্মত্ততার জন্য। গ্রামের বৈচিত্র্যহীন স্তিমিত নিস্তেজ জীবন বিন্দুর সহিতেছে না।

কী উপায় হইবে বিন্দুর? নন্দর কাছে ফিরিয়া যাইবে? তাহাতেও লাভ নাই। যে বিকৃত অভ্যস্ত জীবনের জন্য বিন্দু মরিয়া যাইতেছে, সে জীবনে ফিরিয়া গেলেও তার সমস্যার মীমাংসা হইবে না। গায়ের জোরে এই অস্বাভাবিক জীবনে বিন্দুর অভ্যাস জন্মানো হইয়াছে, তাই, গৃহস্থকন্যার একটি সংস্কারও তার মরিয়া যায় নাই। ওই অশান্ত উদাম লজ্জাকর অবস্থায় দিন কাটাইতে না পারিলে তাহার চলিবে না, কিন্তু সেজন্য লজ্জায় দুঃখে অনুতাপে যন্ত্রণাও সে পাইবে অসহ্য। আকণ্ঠ মদের পিপাসার সঙ্গে বিন্দুর মনে মদের প্রতি এমন মারাত্মক ঘৃণা আছে যে নেশার শেষে আত্ম গ্লানিতে সে আধমরা হইয়া যায়।

কী হইবে বিন্দুর?

বিন্দুর লজ্জা ভাঙিয়াছে। কোণঠাসা ভীরু জন্তুর একটা হীন সাহস জাগিয়াছে তাহার। রাতদুপুরে উঠিয়া আসিয়া সে দরজা ঠেলিয়া শশীর ঘুম ভাঙায়, ঘুমের ওষুধ চায়, মাথা ধরার প্রতিকার প্রার্থনা করে।

শশী বলে, চুপচাপ শুয়ে থাকবি যা, ঘুম আসবে। মাথাধরাও কমে যাবে।

বিন্দু কাঁদিয়া বলে, না দাদা, দাও ঘুমের ওষুধ,-এত কষ্ট সইতে পারি না।

নিশুতি রাতে তাহার শীর্ণ কম্পিত শরীর আর জ্বলজ্বলে চোখের গাঢ় তৃষ্ণ শশীকে উতলা করিয়া তোলে। বুঝাইয়া সে পারিয়া ওঠে না। বিন্দু কোনো কথা কানে তোলে না-অবুঝ শিশুর মতো ঘুমের ওষুধ চাহিতে থাকে।

শশী বলে, তোর একটু মনের জোর নেই বিন্দু?

বিন্দু বলে, মরে গেলাম আমি, মনের জোর কোথা পাব?

শশী একটা ওষুধ তৈরি করিয়া তাকে দেয়। বিন্দু সে ওষুধ মেঝেতে ঢালিয়া ফেলে। শশীর পা জড়াইয়া ধরিয়া বলে, একটু ভালো ওষুধ দাও, একটুখানি দাও। দাও না একটু ভালো ওষুধ আমাকে?

ব্রান্ডির বোতল শশী বাক্‌সে বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিল,–আলমারিতে রাখিতে সাহস পায় নাই। চাবির অভাবে কাচ ভাঙিয়া বোতলটা আয়ত্ত করা বিন্দুর পক্ষে অসম্ভব নয়। খানিকক্ষণ সে অবুলষ্ঠিতা বিন্দুর দিকে চাহিয়া থাকে। তারপর বলে, পা ছাড়, দিচ্ছি।

ওষুধের গ্লাসে ঘুমের ওষুধ খাইয়া বিন্দু ঘুমাইতে যায়। শশী চুপ করিয়া জাগিয়া বসিয়া থাকে। কত যে মশা কামড়ায় তাহাকে তাহার ইয়ত্তা নাই। শশী ভাবে, কেন সে এমন অক্ষম, এত অসহায়? শান্তি দিবে বলিয়া যাকে সে কুড়াইয়া আনিয়াছিল, রাতদুপুরে তাকে তার মদ পরিবেশন করিতে হয় কেন?

দিন-দশেক কলিকাতায় থাকিয়া গোপাল ফিরিয়া আসিল। বিন্দুর সম্বন্ধে সে আর কোনো উচ্চবাচ্য করিল না, মনে হইল বিন্দুর সেদিনকার অপরাধ সে বুঝি ক্ষমাই করিয়া ফেলিয়াছে। শশী তাহাকে চিনিত, গোপালের শান্তভাবে সেই শুধু একটু চিন্তিত হইয়া রহিল।

দিন-তিনেক নির্বিবাদে কাটিয়া গেল। তারপর একদিন সকালে শশীকে ভাকিয়া গোপাল বলিল, নন্দর সঙ্গে দেখা হয়েছিল শশী।

দেখা হইয়াছিল হঠাৎ, পথে!—গোপাল যাচিয়া দেখা করে নাই। গোপালের মানসিক প্রক্রিয়াটা ধরিতে না পারিয়া শশী একটু বিরক্ত হইয়া উঠিল।

বিন্দু অনেক দিন এসেছে, নন্দ ওদিকে রাগারগি করছে শশী,—দু-চার দিনের মধ্যে পাঠিয়ে দিতে বললে।

শশী স্পষ্ট জিজ্ঞাসা করিল, পাঠিয়ে দিতে বললে না আপনি কথার ভাবে অনুমান করলেন?

গোপাল জোর দিয়া বলিল, বললে, পাঠিয়ে দিতে বললে। তুমি ওকে রেখে আসতে পারবে?

শশী বলিল, পারব।

কাল দিন ভালো আছে, কালকেই রওনা হয়ে যাও।

তাই হোক। যাইতে যদি হয় বিন্দুকে, কাল গেলে কোনো ক্ষতি নাই। বিন্দুকে শশী কথাটা তখনি শুনাইয়া দিল। বিন্দু একটু হাসিল।

তাই চলো দাদা, সেই ভালো।

শশী বলিল, এমন জানলে তোকে আমি আনতাম না বিন্দু। শুধু কষ্ট পেলি, ওদিকে নন্দ রেগে রইল, কোনো লাভ হল না।

বিন্দু বলিল, লাভ হল বইকী দাদা চলে না এলে কী করে বুঝতাম ওখানে ওমনিভাবে থাকা ছাড়া আমার গতি নেই? এবার আর কিছু না হোক, মুক্তির কল্পনা করে অযথা ব্যাকুল হব না। হয়তো এবার মনও বসবে। হয়তো এবার খুব সুখেই থাকব।

বিদায় নেওয়া ঠিক হইয়া গেল বলিয়া বোধ হয় বিন্দু এতদিন পরে গ্রামের দিকে চাহিয়া দেখিল,–আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে মেলামেশা করিল। সেদিনকার কাণ্ডের পর সকলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করিতে আজ বিন্দুর সংকোচ হওয়া উচিত ছিল। এ বাড়ির উঠানে নিজের বমির মধ্যে সে যে একদিন গড়াগড়ি দিয়াছিল, সকলের সঙ্গে হঠাৎ তার অবাধ অকুণ্ঠ ব্যবহার দেখিয়া মনে হইল না সেকথা বিন্দুর স্মরণ আছে। রান্নাঘরে কুন্দর ছেলেকে কোলে করিয়া বসিয়া অনেকক্ষণ সে সকলের সঙ্গে গল্প করিল, হাসিল পর্যন্ত। সে যেন স্বামীর গৃহে সহজ ও সাধারণ বধূজীবন যাপন করিয়া বহুদিন পরে বাপের বাড়ি আসিয়াছে,–জীবনে তাহার গ্লানি নাই, অস্বাভাবিকতা নাই,—মনভরা তাহার নির্মল আনন্দ।

খবর পাইয়া পাড়াসুদ্ধ মেয়েরা বিন্দুকে দেখিতে আসিল। অনেকে তাহারা বিন্দুকে জন্মাইতে দেখিয়াছে। বিন্দু আজ তাদের কাছে আকাশের পরীর চেয়েও রহস্যময়ী। অনেক দিন আগে একবার আসিয়া গ্রামকে সে চমকাইয়া দিয়াছিল, এবারও দিয়াছে। আবার সে ফিরিয়া যাইতেছে তাহার অজ্ঞাত রহস্যময় প্রবাসে, তাদের গায়ের মেয়ে বিন্দু। কুসুম এবং পরাণও আসিল। কুসুম চুপিচুপি বিন্দুকে বলিল, বড্ড যে হাসিখুশি দিদি?

বিন্দু বলিল, বরের কাছে যাব যে ভাই!-শীর্ণ মুখে সে অকথ্য হাসি হাসিল।

আবার কবে আসবে?

আর তো আসব না বউ।

পরাণ শশীকে বলিল, মতিদের খোঁজ করবেন ছোটোবাবু?

শশী বলিল, করব বইকী। বৈশাখ মাস পড়ল না? বৈশাখ মাসে কুমুদ সরস্বতী অপেরায় যোগ দেবে বলেছিল পরাণ। দলটার ঠিকানা অবশ্য আমি জানি না, তবে খোঁজ পেতে কষ্ট হবে মনে হয় না।

খবর যদি পান ছোটোবাবু, মতিকে নিয়ে আসবেন। দু-মাস হল গেছে, ছেলেমানুষ তো, কাঁদাকাটা করছে হয়তো।

দু-মাস গিয়াছে? তাই তো বটে। পরাণের মুখের দিকে শশী চাহিতে পারে না! দুমাস হইল মতি গ্রামছাড়া, এর মধ্যে একটা খবরও আসে নাই টাকা চাহিয়াও কুমুদ যদি একখানা পত্র লিখিত! যদি দেখা হয় কুমুদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করিতে হবে। বুঝাইয়া দিতে হইবে সে কতবড় দায়িত্বজ্ঞানহীন রাস্কেল।

আচ্ছা, মতি তো একখানা চিঠি লিখিতে পারিত তাহার আকাবাঁকা অক্ষরে? কেন লিখিল না? কুমুদের সঙ্গে খেলা করিয়া সময় পায় না? এ ক্ষমতা কুমুদের আছে,– মানুষকে সে আত্মভোলা করিয়া দিতে পারে। তা ছাড়া হয়তো কুমুদ যেমন বিবরণ যেমন লেখে, মিলনের তেমনি অতল উচ্ছল আনন্দে মতি বিশ্বসংসার ভুলিয়া গিয়াছে? শশী একটু হাসে। মতিকে উপন্যাসের নায়িকার মতো ভাবিতে আরম্ভ করিয়াছে, সেও তো কম কল্পনাপ্রবণ নয়!

পরদিন বিন্দুকে সঙ্গে করিয়া শশী কলিকাতায় রওনা হইয়া গেল। দিন এবং রাত্রি কাটিল পথে, কথা তাহারা বলিল খুব কম। কে ভাবিয়াছিল এ ভাবে বিন্দুকে আবার ফিরাইয়া দিতে হইবে। বিন্দুর বাড়ির সেই ফরাশ-পাতা, তবলা তাকিয়া ও কুদৃশ্য ছবিতে সাজানো ঘরখানা শশীর মনে ভাসিয়া উঠিতেছিল। সে ভাবিতেছিল, তার আলমারিতে বোতলের পাশে লেবেল-আঁটা বিষের শিশি ছিল, বিন্দু কেন বিষ খাইল না?

বেলা প্রায় দশটার সময় তাহারা বিন্দুর বাড়ি পৌঁছিল। দারোয়ান খুব ঘটা করিয়া সেলাম করিল বিন্দুকে, বিন্দুর দাসী একগাল হাসিল। নন্দ নামিয়া আসিল, নির্লজ্জ অকুণ্ঠ নন্দ। হাসিমুখে শশীকে অভ্যর্থনা করিয়া সে বলিল, এসো এসো, আসতে আজ্ঞা হোক।

শশী বলিল, আসতে পারব না নন্দ। কাজ আছে।

বিন্দু মিনতি করিয়া বলিল, একটু বসে যাবে না দাদা?

কাজ আছে বিন্দু।

শশী নামিয়া দাঁড়াইয়াছিল, এবার গাড়িতে উঠিয়া বসিল। বিন্দু তাকে আর নামিতে অনুরোধ করিল না, শুধু বলিল, গাঁয়ে ফেরার আগে যদি সময় পাও, একবারটি খবর নিয়ে যেও।

বিন্দু ভিতরে চলিয়া গেল। শশীর গাড়ি চলিতে আরম্ভ করিবে, গাড়োয়ানকে থামিতে বলিয়া নন্দ কাছে আগাইয়া আসিল। শশীর মনে হইল নন্দ খুব রোগা হইয়া গিয়াছে, গিয়াছে, চোখে রাতজাগার চিহ্ন।

খবর নিতে বোধ হয় আসবে না?—নন্দ জিজ্ঞাসা করিল।

কী করে বলি? সময় পাব না হয়তো।—বলিল শশী।

নন্দ একটু ভাবিল, এলে ভালো করতে শশী। ওকে কাল বাড়ি নিয়ে যাব ভাবছি— মা ওরা সব যে বাড়িতে আছেন সেইখানে। এ বাড়িটা বেচে দেব। নতুন লোকের মধ্যে গিয়ে পড়ে একটু হয়তো বিব্রত হয়ে পড়বে, তুমি গিয়ে দেখা করলে ভালো লাগবে ওর। মন বসতে সাহায্য হবে।

শশী অবাক হইয়া বলিল, বিন্দুকে বাড়ি নিয়ে যাবে?

নন্দ বলিল, তাই ভাবছিলাম। এখানে যখন থাকতে চায় না, বাড়িই চলুক। একবার তোমার সঙ্গে চলে গেল, পরের বার যদি জন্মের মতো আমাকে ত্যাগ করে বসে? কী জানো শশী, বুড়োবয়সে এসব হাঙ্গামা ভালো লাগে না। এখানে নিজের মনে কত আরামে ছিল,-ভিড় নেই, ঝঞ্ঝাট নেই, সব বিষয়ে স্বাধীন। তা যদি ভালো না লাগে, চলুক তবে যেখানে থাকতে ভালো লাগবে সেইখানে—আমার কী? আমি কাজের মানুষ, কাজ নিয়ে থাকি নিজের।

এ সুবুদ্ধি তোমার আগে হল না কেন নন্দ?

নন্দ হঠাৎ একথার জবাব দিতে পারিল না। তারপর ছেলেমানুষের মতো বলিল, আগে কী করে জানব যে পালিয়ে যাবে? বেশ তো হাসিখুশি দেখতাম।

শশী একবার ভাবিল, নন্দকে বুঝাইয়া এ মতলব ত্যাগ করিতে বলে। সাত বছর ধরিয়া যে অন্যায় সে করিয়াছে, আজ অসময়ে কেন তার প্রতিকারের চেষ্টা? চেষ্টা সফল হইবার সম্ভাবনাও নাই। ঘোমটা টানিয়া বিন্দু আজ এতকাল পারে শাশুড়ি ননদ সতিনের সংসারে নিরীহ বধূটি সাজিতে পারবে কেন? তা যদি পরিত, গাওদিয়ার উত্তেজনাহীন সহজ জীবন তাহার অসহ্য হইয়া উঠিত না।

শেষ পর্যন্ত কিছু না-বলাই শশী মনে করিল। নন্দর সঙ্গে এ আলোচনা করা চলে না।

 

গতবার কুসুমদের সঙ্গে করিয়া যে হোটেলে উঠিয়াছিল এবারও শশী সেইখানে গেল। কুমুদের দেখা পাইবার আশায় মতি যে এখানে আগ্রহে ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিল সেকথা শশীর মনে আছে। মতি? অতটুকু মেয়ে মতি? কী মন্ত্রই কুমুদ জানে, বেহিসাবী নিষ্ঠুর যাযাবর কুমুদ!

পরদিন শশী কুমুদের খোঁজ করিল। একটা থিয়েটারের সাজপোশাকের দোকানে বিনোদিনী অপেরার ঠিকানা পাওয়া গেল, সরস্বতী অপেরার সন্ধান কেহ শশীকে দিতে পারিল না। কুমুদ বলিয়াছিল, বিনোদিনী অপেরার সঙ্গে তাহার সম্পর্ক চুকিয়াছে, ওখানে খোঁজ করিয়া লাভ হইবে কি না সন্দেহ। তবু শশী শেষবেলায় চিৎপুরে একটা বাড়ির দোতলায় অধিকারীর সঙ্গে দেখা করিল।

সদ্য-ঘুম-ভাঙা অধিকারী বলিল, কুমুদ? অঘ্রাণ মাস থেকে সে শালাকে আমরাও খুঁজছি মশায়। ভাওতা দিয়ে তিন মাসের মাইনে আগাম নিয়ে সরেছে। দুদিন পরে শ্রীপুরে রাজবাড়িতে বায়না ছিল, একেবারে ডুবিয়ে দিয়ে গেছে মশায়। অধিকারী আরক্ত চোখে কটমট করিয়া শশীর দিকে চাহিল, মশায়ের কী সর্বনাশটা করেছে শুনতে পাই?

শশী একটু হাসিল, সে কথা শুনে আর কী হবে? সরস্বতী অপেরার ঠিকানাটা বলতে পারেন?

সরস্বতী অপেরা? নামও শুনিনি।

এইখানে তবে ইতি কুমুদকে খোঁজ করার? শশী চলিয়া আসিতেছিল, অধিকারী বলিল, কুমুদের সঙ্গে আপনার দেখা হবে কি?

শশী বলিল, তা বলতে পারি না। হওয়া সম্ভব।

অধিকারী বলিল, দেখা হলে একবার জিজ্ঞেস করবেন তো এই কি ভদরলোকের ছেলের কাজ? আচ্ছা থাক, ওসব কিছু জিজ্ঞেস করে কাজ নেই, বাবুর আবার অপমানজ্ঞানটি টনটনে বলবেন যে আধর মল্পিক ও দুশো-চারশো টাকার জন্য কেয়ার করে না। পালাবার কী দরকার ছিল রে বাপু, অ্যাঁ? চাইলে ও কটা টাকা তোকে আর আমি দিতাম না,–তিন বছর তুই আমার দলে আছিল, ছেলের মতো তোর পরে মায়া বসেছে।

গলাটা অধিকারীর ধরিয়া আসিল, কে জানে শ্লেষ্মায় কি মমতার চোখ পিটপিট করিয়া বলি, আমার ছেলেপিলে নেই, জানেন? একটা মেয়ে ছিল, বাপ বটে আমি, তবু বলি দেখতে-শুনতে মেয়ের আমার তুলনা ছিল না মশায়-রঙ যাকে বলে আসল গৌর তাই। কুমুদের সঙ্গে বিয়ে দেব ভেবেছিলাম, তা ছোড়ার কি আর বিয়ে-টিয়ের মতলব আছে-একদম পাষণ্ড। তাই না কেষ্টনগরের এক ডাকাতের হাতে মেয়ে দিতে হল, যন্ত্রণা দিয়ে মেয়েটাকে তারা মেরে ফেললে। সেই থেকে কী যে হল আমার, সংসারে আর মন নেই-দল একটা করেছি, কেউ ডাকলে-ডুকলে পালা গেয়ে আসি-কিছু ভালো লাগে না মশায়। আছি শতেক জ্বালায় আধমরা হয়ে, কুমুদ ছোড়া কিনা ডুবিয়ে গেল আমাকেই,-ছোড়ার দেহে একফোঁটা মায়াদয়া নেই। আমি হলে তো পারতাম না বাপু একটা শোকাতুর মানুষের ঘাড় ভেঙে পালাতে,–পারতাম না। ছোঁড়াটা কী!

বিস্ময়ে ও আবেগে অধিকারী শুধু মাথাই নাড়িল খানিকক্ষণ। তারপর আরও বেশি অন্তরঙ্গ হইয়া বলিল, আপনাকে খুলেই বলি দাদা, কুমুদ গিয়ে থেকে দলটা কানা হয়ে গেছে। খাসা পার্ট বলত, বিশ বছর আছি এ লাইলে, অমনটি আর দেখিনি। দেখা হলে বলবেন, টাকা গেছে যাক, আসুক, কাজ করুক, পুরোনো কাসুন্দি ঘাটাবার পাত্র অধর মল্লিক নয়। দশ-বিশ টাকা মাইনে বেশি চায়, আমি কি বলেছি দেব না? ছোঁড়াটা কী!

দিন তিনেক শশী আরও কয়েকটা দলে কুমুদের খোঁজ করিল, কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। অনেক রোগী ফেলিয়া আসিয়াছে, বেশিদিন কলিকাতায় বসিয়া থাকিবার উপায় শশীর ছিল না। পরদিন সে গাওদিয়া ফিরিয়া যাইবে ঠিক করিল। বাকি জীবনটা কলিকাতায় বসিয়া মতির খোঁজ করিলে তো তার চলিবে না। গ্রামে ফিরিবার এই আভ্যন্তরিক তাগিদ সেদিন রাত্রে শশীকে একটু অবাক করিয়া দিল। শশীর ঘরখানা রাস্তার উপরে। অনেক রাত্রে চৌকির প্রান্তে জানালার ধারে সে বসিয়া ছিল। পথে তখন লোক চলাচল কমিয়াছে, দোকানপাট বন্ধ হইয়াছে। কাল তাহাকে গ্রামে ফিরিতে হইবে। একদিন গ্রাম ছাড়িয়া আসিয়া বৃহত্তর বিস্তৃততর জীবন গঠনের কল্পনা করিয়া সে দিন কাটায়, আর ইতিমধ্যেই এমন অবস্থা দাঁড়াইয়াছে যে এক সপ্তাহ বাহিরে আসিয়া তাহার থাকা চলেনা। কলেরা, বসন্ত, কালাজ্বর, টাইফয়েড এবং আরও অনেক ছোট-বড় রোগে আক্রান্ত যাদের সে ফেলিয়া আসিয়াছে, একে একে তাদের কথা মনে পড়িলে আর একটা দিনও অকারণে কলিকাতায় বসিয়া থাকিবার সংকল্পে নিজেকে তাহার খেয়ালি, বর্বর মনে হইতেছে। কে জানে ওদের কে ইতিমধ্যেই গিয়াছে মরিয়া, কার অবস্থা গিয়াছে খারাপের দিকে ফিরিয়া গিয়া আবার ওদের রোগশয্যা পার্শ্বে বসিতে না পারিলে মনে তো স্বস্তি পাইবে না। এ কী বন্ধন, এ কী দাসত্ব?

শশীর রাগ হয়। এ দায়িত্ব সে মানিবে না, এত কিসের নীতিজ্ঞান? গ্রামে তো সে ফিরিবে না এক মাসের মধ্যে-সে কি মানুষের জীবন-মরণের মালিক? যতদিন গ্রামে ছিল, যে ডাকিয়াছে চিকিৎসা করিয়া আসিয়াছে এখন যদি রোগীরা তার চিকিৎসার অভাবে মরিয়া যায়, মরুক। তিন বছর আগে সে ডাক্তারি পাস করে নাই, তখন কী করিয়াছিল গাঁয়ের লোক? এখনো তাই করুক। শশী কিছু জানে না।

Print Friendly
%d bloggers like this: