রিটায়ার করিবার বছর তিনেক আগে নীলমণিবাবু এই জেলার সদর থানার কর্তা হইয়া আসেন। তাঁহার তিনটি প্রধান গুণ ছিল; যে-বুদ্ধি থাকিলে তদন্তকর্মে কৃতকার্য হওয়া যায় সে-বুদ্ধি তাঁহার প্রচুর পরিমাণে ছিল; তিনি অতিশয় কর্মঠ ছিলেন; এবং তিনি ঘুষ লইতেন না। শহরটা পুলিস সেরেস্তায় দাগী শহর বলিয়া পরিচিত ছিল; খুন-জখম এবং আরও নানা প্রকার অবৈধ ক্রিয়াকলাপ এখানে লাগিয়া থাকিত। নীলমণিবাবু পূর্ব হইতে এ শহরের সহিত পরিচিত ছিলেন‌, শহরের ধাত জানিতেন। তিনি আসিয়া দৃঢ় হস্তে শাসনের ভার তুলিয়া লইলেন।

বছর দেড়েক কাটিয়া গেল। নীলমণিবাবুর সতর্ক শাসনে শহর অনেকটা শান্ত-শিষ্ট ভাবে আছে। নীলমণিবাবুর অভ্যাস ছিল হস্তায় দু’একবার কাহাকেও কিছু না বলিয়া গভীর রাত্রে সাইকেলে চড়িয়া বাহির হইয়া পড়িতেন। শহরের একটা অংশ ছিল বিশেষভাবে অপরাধপ্রবণ; তাহারই অন্ধকার অলিগলিতে তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতেন; পাহারাওয়ালারা নিয়মিত রোঁদ দিতেছে কিনা লক্ষ্য করিতেন। তাঁহার সাইকেলে আলো থাকিত না; সঙ্গে থাকিত পিস্তল এবং একটি বৈদ্যুতিক টর্চ। প্রয়োজন হইলে টর্চ জ্বালিতেন।

যে-রাত্রির ঘটনাটা লইয়া এই কাহিনীর আরম্ভ সে-রাত্রে নীলমণিবাবু সাইকেল চড়িয়া যথারীতি বাহির হইয়াছেন। নিষুতি রাত‌, কোথাও জনমানব নাই‌, রাস্তার আলোগুলো দূরে দূরে মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছে। ভদ্র পাড়া যেখানে অভদ্র পাড়ার সঙ্গে মিশিয়াছে সেইখানে আম-কাঁঠালের বাগান-ঘেরা কয়েকটা পুরাতন বাড়ি আছে। বাড়িগুলি জীর্ণ‌, আম-কাঁঠালের গাছগুলি বৰ্ষীয়ান। পূর্বে বোধ হয় এই স্থান ভদ্রপল্লীর অন্তর্ভুক্ত ছিল‌, এখন ভদ্রপল্লী ঘৃণাভরে দূরে সরিয়া গিয়াছে; ক্ষয়িষ্ণু বাড়িগুলি দুই পক্ষের মাঝখানে সীমানা রক্ষা করিতেছে। এখানে যাহারা বাস করে তাহাদের সামাজিক অবস্থাও ত্রিশঙ্কুর মত স্বৰ্গ ও মর্তের মধ্যবর্তী।

মন্থর গতিতে সাইকেল চালাইয়া এই পাড়ার ভিতর দিয়া যাইতে যাইতে নীলমণিবাবু দেখিলেন, সম্মুখে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে কয়েকজন লোক একটি মাচার মত বস্তু কাঁধে লইয়া একটি বাড়ির ফটিক হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে। তাহদের ভাবভঙ্গী সন্দেহজনক।

নীলমণিবাবু জোরে সাইকেল চালইলেন; কাছাকাছি আসিয়া বৈদ্যুতিক টর্চ জ্বালিয়া লোকগুলার মুখে ফেলিলেন‌, উচ্চকণ্ঠে হুকুম দিলেন‌, ‘দাঁড়াও।’

চারজন লোক ছিল; তাহার একসঙ্গে কাঁধ হইতে মাচা ফেলিয়া পলায়ন করিল‌, মুহূৰ্তমধ্যে অন্ধকারে অদৃশ্য হইয়া গেল। কিন্তু অদৃশ্য হইবার পূর্বে একজনের মুখ নীলমণিবাবু অস্পষ্টভাবে দেখিতে পাইয়াছিলেন; সে ওই বাড়ির মালিক সুরেশ্বর ঘোষ।

পলাতকেরা বিভিন্ন দিকে গিয়াছে‌, নীলমণিবাবু তাহাদের ধরিবার চেষ্টা করিলেন না। তিনি মাচার নিকট গিয়া সাইকেল হইতে নামিলেন‌, এবং মাচার উপর টর্চের আলো ফেলিলেন।

মাচা নয়‌, মড়া বহিবার চালি। তাহাতে বাঁধা-ছাঁদা অবস্থায় পড়িয়া আছে একটি স্ত্রীলোকের দেহ। স্বাস্থ্যুবতী সধবা যুবতী‌, দেহে কোথাও আঘাতের চিহ্ন নাই; কিন্তু মৃত।

নীলমণিবাবু হুইসল্‌ বাজাইলেন। একজন পাহারাওয়ালা কনস্টেবল কাছেপিঠে ছিল‌, দৌড়াইতে দৌড়াইতে আসিল। প্রতিবেশীরাও ঘুম ভাঙিয়া নিজ নিজ গৃহ হইতে বাহির হইল।

প্রতিবেশীরা সকলেই মৃতদেহ সনাক্ত করিল; সুরেশ্বরের স্ত্রী হাসি। বাড়িতে অন্য কেহ থাকে না‌, কেবল সুরেশ্বর ও তাহার স্ত্রী হাসি।

নীলমণিবাবু কনস্টেবলকে থানায় রওনা করিয়া দিলেন‌, তারপর দু’জন প্রতিবেশীকে লইয়া বাড়ি অনুসন্ধান করিলেন। বাড়িটি একতলা হইলেও আকারে ছোট নয়‌, ছয়খানি ঘর। কিন্তু অধিকাংশ ঘরই ব্যবহার হয় না। দুইটি ঘরে ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া যায়; তন্মধ্যে একটি শয়নের ঘর। এই ঘরটি বেশ বড়‌, তাহার দুই পাশে দুইটি খাট। দুইটি খাটেই বিছানা পাতা; একটিতে কেহ শয়ন করে নাই‌, অপরটি দেখিয়া মনে হয় ব্যবহৃত হইয়াছে। কিন্তু বাড়িতে কেহ নাই।

বাগানেও কেহ নাই; বড় বড় আম-কাঁঠালের গাছগুলা সারি দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। নীলমণিবাবু প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করিলেন‌, ‘মেয়েটির অসুখ করেছিল। কিনা আপনারা জানেন?

একজন প্রতিবেশী বলিল‌, ‘অসুখ করেনি। আজই বিকেলবেল ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে বিনোদবাবুর সঙ্গে কথা বলছিল?’

‘তাই নাকি! বিনোদবাবু কে?’

‘বিনোদ সরকার‌, সোনারূপের দোকান আছে।’

 

ফটকের কাছে ফিরিয়া আসিয়া নীলমণিবাবু দেখিলেন‌, থানা হইতে দুইজন সাব-ইন্সপেক্টর ও কয়েকজন জমাদার কনস্টেবল প্রভৃতি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। তিনি অল্প কথায় ব্যাপার বুঝাইয়া দিয়া একজন সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে মৃতদেহ হাসপাতালে রওনা করিয়া দিলেন‌, চারজন কনস্টেবল চালি বহিয়া লইয়া গেল।

প্রতিবেশীরা তখনও কেহ চলিয়া যায় নাই‌, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করিয়া জল্পনা করিতেছিল। নীলমণিবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন‌, ‘মেয়েটির স্বামীর পুরো নাম কি?’

একজন বলিল‌, ‘সুরেশ্বর ঘোষ।’

‘সে কোথায়?’

প্রতিবেশীরা কিছু বলিতে চায় না; শেষে একজন অনিচ্ছাভরে বলিল‌, ‘সুরেশ্বর সন্ধ্যের পর খেয়ে-দোয়ে বেরিয়ে যায়‌, রাত্রি একটা-দেড়টার আগে বাড়ি ফেরে না।’

‘কোথায় যায়?’

‘শুনেছি কালীকিঙ্কর দাসের দোকানে তাসের আড়ড়া বসে‌, সেখানে যায়।’

‘কালীকিঙ্কর দাসের দোকান কোথায়?’

প্রতিবেশীরা ঠিকানা দিল। নীলমণিবাবু তখন জমাদারকে অকুস্থলে বসাইয়া সাব-ইন্সপেক্টরকে সঙ্গে লইয়া কালীকিঙ্কর দাসের দোকানের উদ্দেশ্যে চলিলেন। প্রতিবেশীদের বলিয়া গেলেন‌, ‘কাল সকালে আসব‌, আপনাদের এজেহার নেব।’

কালীকিঙ্করের দোকান সুরেশ্বরের বাড়ি হইতে আধ মাইল দূরে‌, শহরের নিকৃষ্ট অংশ পার হইয়া যেখানে বাজার-হাট আরম্ভ হইয়াছে সেইখানে। লোহা-লক্কড়ের দোকান। বাজারের এই অংশটির নাম লোহাপটি।

নিষুতি বাজারের ভিতর দিয়া নীলমণিবাবু কালীকিঙ্করের দোকানের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। দোকানের সামনে রাস্তার পাশে ভারী ভারী লোহার ছড় গুচ্ছাকারে পড়িয়া আছে। কিন্তু দোকানের দ্বার বন্ধ। নীলমণিবাবু নিঃশব্দ পদে এদিক-ওদিক ঘুরিয়া দেখিলেন‌, পাশের একটি জানালার ফুটা দিয়া শীর্ণ আলোকরশ্মি বাহিরে আসিতেছে। তিনি সন্তৰ্পণে জানালার কাছে গিয়া ফুটার মধ্যে চক্ষু নিবিষ্ট করিলেন।

তক্তপোশের উপর ফরাস পাতা; চারজন লোক বসিয়া নিবিষ্টমনে তাস খেলিতেছে। তাহাদের মাঝখানে ফরাসের উপর কিছু টাকা ও নোট জমা হইয়াছে। বাজি রাখিয়া খেলা চলিতেছে। তিনি তাসের খেলা।

সাব-ইন্সপেক্টর সাইকেল লইয়া রাস্তায় দাঁড়াইয়া ছিল। নীলমণিবাবু হাত নাড়িয়া তাহাকে ইশারা করিলেন‌, সে সাইকেল রাস্তায় শোয়াইয়া দিয়া দ্বারের সামনে গিয়া দাঁড়াইল। নীলমণিবাবু তখন জানালায় টোকা দিলেন।

চারজন খেলোয়াড় একসঙ্গে জানালার দিকে ঘাড় ফিরাইল‌, চারজোড়া চোখ শঙ্কিত উৎকণ্ঠায় চাহিয়া রহিল; তারপর একজন এক খামচায় সম্মুখের টাকাকড়ি তুলিয়া লইয়া পকেটে পুরিল।

নীলমণিবাবু কড়া সুরে বলিলেন‌, ‘দোর খোল।’

চারজন মুখ তাকাতাকি করিল‌, তারপর একজন গলা উচু করিয়া বলিল‌, ‘কে?’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘পুলিস। দোর খোল।’

আবার খেলোয়াড়দের মধ্যে মুখ তাকাতাকি। তারপর একজন‌, বোধ হয় দোকানের মালিক কালীকিঙ্কর দাস‌, উঠিয়া গেল। নীলমণিবাবু জানালা হইতে সরিয়া দ্বারের সম্মুখে দাঁড়াইলেন। দ্বার খুলিল। রোগা অস্থিসার লোকটা দুইজন ইউনিফর্ম পরা পুলিস কর্মচারীকে দেখিয়া এক পা পিছাইয়া গেল‌, ‘কে! কি চাই?’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘তুমি কালীকিঙ্কর দাস?’

‘হ্যাঁ। কি চাই?’

‘এখানে আর কে কে আছে?’

কালীকিঙ্কর ঢোক গিলিয়া বলিল‌, ‘আমার তিনজন বন্ধু আছে।’

নীলমণিবাবু আর বাক্যব্যয় করিলেন না‌, ইন্সপেক্টরকে সঙ্গে লইয়া দোকানে প্রবেশ করিলেন। পাশে অফিস-ঘরের দরজা; অফিস-ঘরে গিয়া তিনি দেখিলেন‌, তিনজন খেলোয়াড়। তখনও ফরাসের উপর বসিয়া আছে‌, একজন তাস ভাঁজিতেছে। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া সকলকে নিরীক্ষণ করিলেন। সকলেরই বয়স পয়ত্ৰিশ হইতে চল্লিশের মধ্যে‌, চেহারায় কোনও বৈশিষ্ট্য নাই। কেবল এক ব্যক্তি‌, যে-ব্যক্তি তাস ভাঁজিতেছিল‌, হাড়ে-মাসে মজবুত গোছের লোক। দেখিয়া মনে হয় এই লোকটাই পালের গোদা।

নীলমণিবাবু প্রশ্ন করিলেন‌, ‘সুরেশ্বর ঘোষ কর নাম?’

মজবুত লোকটি ভুরু তুলিয়া চাহিল‌, তারপর তাস রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ‘আমি সুরেশ্বর ঘোষ। কি দরকার? তার স্বর শান্ত ও সংযত।

নীলমণিবাবু একে একে চারজনের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া বলিলেন‌, ‘তোমরা দুপুর রাত্রে মড়া নিয়ে ঘাটে পোড়াতে যাচ্ছিলে। ভেবেছিলে একবার পুড়িয়ে ফেলতে পারলে আর কোনো ভয় নেই।’

চারজনের মুখেই অকৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়া উঠিল। সুরেশ্বর বলিল‌, ‘মড়া! কি বলছেন। কার মড়া?’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘ন্যাকামি করে পর পাবে না। আমি দেখেছি তোমাকে। যে-চারজন মড়া নিয়ে যাচ্ছিল‌, তুমি তাদের একজন।’

সুরেশ্বর বলিল‌, ‘কবেকার কথা বলছেন?’

‘আজকের কথা বলছি। আজ রাত্ৰি বারোটার কথা।’

‘বাজে কথা বলছেন। আজ রাত্রি সাড়ে আটটার সময় আমরা এখানে তাস খেলতে বসেছি‌, এক মিনিটের জন্যে কেউ বাইরে যাইনি।’

‘বটে! সারাক্ষণ তাস খেলেছ! জুয়া?’

তিনজনে ঘাড় চুলকাইতে লাগিল। সুরেশ্বর কিন্তু তিলমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, জুয়া খেলছিলাম। আমরা চার বন্ধু মিলে মাঝে মাঝে খেলি।’

নীলমণিবাবু দেখিলেন। এখানে ইহাদের কাবু করা যাইবে না‌, থানায় লইয়া যাইতে হইবে। বলিলেন‌, ‘আপাতত জুয়া খেলার অপরাধে আমি তোমাদের অ্যারেস্ট করছি। থানায় চল।’

অতঃপর কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটি চলিল‌, শেষ পর্যন্ত তাহারা থানায় যাইতে রাজী হইল। নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘যদি জামিন যোগাড় করতে পোর‌, আজ রাত্তিরেই ছেড়ে দেব।’

রাস্তায় কিছুদূর যাইবার পর সুরেশ্বর বলিল‌, ‘মড়ার কথা কী বলছিলেন? কার মড়া?’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘তোমার স্ত্রীর।’

সুরেশ্বর রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইয়া পড়িল‌, ‘অ্যাঁ! আমার স্ত্রী! কি বলছেন আপনি?’

‘বলছি‌, তোমার স্ত্রী খুন হয়েছে।’

‘না না! এসব কি রকম কথা! আমি বিশ্বাস করি না। হাসি!–না‌, আমি বাড়ি চললাম।’

‘বাড়ি গিয়ে কোন লাভ নেই। মৃতদেহ হাসপাতালে চালান দেওয়া হয়েছে।’

থানায় পৌঁছিয়া নীলমণিবাবু চারজনকে হাজতে পুরিলেন। তারপর অফিসে বসিয়া একে একে তাহাদের জেরা আরম্ভ করিলেন। প্রথমে ডাকিলেন সুরেশ্বরকে। সে টেবিলের পাশের একটি চেয়ারে উপবিষ্ট হইলে জিজ্ঞাসা করিলেন‌, ‘তুমি কি কাজ কর?’

সুরেশ্বর বলিল‌, ‘অনেক রকম ব্যবসা আছে। পাইকিরি ব্যবসা। আমি পয়সাওয়ালা লোক‌, পুচকে দোকানদার নই।’

‘বাড়িটা তোমার?’

‘হ্যাঁ।’

‘কতদিন কিনেছ?’

‘পাঁচ-ছয় বছর হবে। উনিশ হাজার টাকায় কিনেছিলাম।’

নীলমণিবাবুকে টাকার কথা শুনাইয়া লাভ হইল না‌, তিনি অটলভাবে প্রশ্ন করিয়া চলিলেন,  ‘কতদিন আগে বিয়ে করেছিলে?’

‘সাত বছর আগে।’

‘শ্বশুরবাড়ি কোথায়?

‘এই শহরে।’

‘শ্বশুরের নাম কি?’

‘দিনমণি হালদার।’

‘সে এখন কোথায়?’

‘জানি না। সম্ভবত জেলে।’

‘জেলে?’

‘হ্যাঁ। জেল আমার শ্বশুরের ঘর-বাড়ি।’

‘হুঁ। শ্বশুরের সঙ্গে তোমার সদ্ভাব আছে?’

‘মুখ দেখাদেখি নেই।’

নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া রহিলেন। শেষে বলিলেন‌, ‘বৌয়ের সঙ্গে তোমার সদ্ভাব ছিল?’

একটু দ্বিধা করিয়া সুরেশ্বর বলিল‌, বিয়ের সাত বছর পরে যতটা সম্ভাব থাকা সম্ভব ততটা

‘ছেলে-পিলে নেই?’

‘না। বৌ বাঁজা।’

নীলমণিবাবু আঙুল তুলিয়া বলিলেন‌, ‘আজ রাত্ৰি বারোটার সময় তুমি আর তোমার বন্ধুরা মিলে তোমার স্ত্রীর মৃতদেহ বাড়ি থেকে বার করে নিয়ে যাচ্ছিলে, আমি টর্চের আলো ফেলে তোমাকে দেখেছি।’

সুরেশ্বর নিরুত্তাপ কষ্ঠে বলিল‌, ‘আপনি ভুল দেখেছেন। রাত্ৰি বারোটার সময় আমি আর আমার বন্ধুরা কালীকিঙ্করের দোকানে বসে তাস খেলছিলাম।’

‘হুঁ। তোমার স্ত্রীর স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল?’

‘মেয়েমানুষের স্বভাব-চরিত্রের কথা কে বলতে পারে? তবে পাড়া-পড়াশীরা বদনাম দিত।’

‘কি বদনাম দিত?

‘আমি রাত্রি করে বাড়ি ফিরি। কয়েক মাস থেকে কে একজন নাকি বাগানে এসে হাসির সঙ্গে দেখা করত।’

‘স্ত্রীকে এ বিষয়ে কিছু জিগ্যেস করেছিলে?’

‘করেছিলাম। সে বলেছিল সব মিথ্যে কথা।’

‘আর কিছু?

‘আর কি! একবার হাসির আলমারি খুলে তার মধ্যে এমন কয়েকটা গয়না দেখেছিলাম যা আমি তাকে দিইনি।’

‘কোথা থেকে গয়না এল বৌয়ের কাছে খোঁজ নিয়েছিলে?’

‘কি হবে খোঁজ নিয়ে? মেয়েমানুষ যদি নষ্ট হতে চায় কেউ তাকে আটকাতে পারে না।’

‘কিন্তু খুন করতে পারে।’

‘আমি হাসিকে খুন করিনি।’

নীলমণিবাবু আরও অনেকক্ষণ নানাভাবে জেরা করিলেন‌, কিন্তু সুরেশ্বরকে টলাইতে পারিলেন না। বরং তাহার ঠোঁট-কাটা স্পষ্টবাদিত দেখিয়া মনে হয় সে সত্য কথা বলিতেছে।

সুরেশ্বরকে হাজতে ফেরৎ পাঠাইয়া নীলমণিবাবু কালীকিঙ্করকে ডাকিয়া আনিলেন। কালীকিঙ্করীরের হাড়-বাহির-করা শরীরের মধ্যে লৌহ-কঠিন একটি মন ছিল‌, নীলমণি অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহা বাঁকাইতে পারিলেন না। চার বন্ধু রাত্রি সাড়ে আটটার সময় তাহার দোকানে তাস খেলিতে বসিয়াছিল‌, নীলমণিবাবু আসা পর্যন্ত এক মুহুর্তের জন্যও কেহ বাহিরে যায় নাই‌, এ কথার নড়চড় হইল না।

অন্যান্য বিষয়ে কিন্তু কালীকিঙ্কর সোজাসুজি উত্তর দিল। সুরেশ্বর তাহার আজীবনের বন্ধু‌, তাহার ঘরের খবর সবই কালীকিঙ্কর জানে। সুরেশ্বরের অবস্থা আগে ভাল ছিল না‌, যুদ্ধের বাজারে সে পয়সা করিয়াছে। হাসিকে সে বিবাহ করিয়াছিল গরীব অবস্থায়। হাসির ব্যাপটা ছিল। একাধারে চোর এবং বোকা; চুরি করিয়া ধরা পড়িয়া যাইত এবং জেলে যাইত। হাসির মায়েরও বদনাম ছিল। বস্তিতে বাস করিলে ভদ্রলোকের মেয়েরও চালচলন খারাপ হইয়া যায়; যেমন দেখিবে তেমনি তো শিখিবে। হাসির বাপ যখন জেলে থাকিত তখন নাকি হাসির মায়ের ঘরে লোক আসিত। সুরেশ্বর যখন হাসিকে বিবাহ করিতে উদ্যত হয়‌, তখন বন্ধুরা সকলেই মানা করিয়াছিল; কিন্তু সুরেশ্বর কাহারও কথা শুনিল না। তারপর যুদ্ধের বাজারে সুরেশ্বর টাকা করিয়াছে‌, বাড়ি কিনিয়াছে; কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তেমন বনিবনাও নাই। সুরেশ্বর বাড়িতে বেশি থাকে না‌, বাহিরে বাহিরে দিন কটায়। কিন্তু তাই বলিয়া সে স্ত্রীকে খুন করিয়াছে একথা একেবারেই সত্য নয়। সুরেশ্বর তেমন লোকই নয়। সে ভদ্র সন্তান; জীবনের আরম্ভে অনেক দুঃখ-কষ্ট পাইয়া বস্তিতে থাকিয়া বড় হইয়াছে বটে‌, কিন্তু তার মনটা খুব উঁচু।

কালীকিঙ্করের বন্ধু-প্রশস্তি শেষ হইলে নীলমণিবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সুরেশ্বরের শ্বশুর দিনমণি হালদার এখন কোথায়?’

কালীকিঙ্কর বলিল‌, ‘বছর দুই আগে দিনু হালদার জেল থেকে বেরিয়ে এখানে এসেছিল। হাসির মা তখন মরে গেছে। দিনু হালদার দু’তিন দিন মেয়ে-জামাইয়ের কাছে ছিল। একদিন সুরেশ্বরের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। দিনু হালদার কোথায় চলে গেল। তারপর থেকে আর তাকে দেখিনি। বয়স হয়েছিল‌, জেল খেটে শরীরও ভেঙে পড়েছিল। হয়তো মরে গেছে।’

অতঃপর নীলমণিবাবু কালীকিঙ্করকে ফেরৎ পাঠাইয়া দেবু মণ্ডলকে আনাইলেন। দেবু মণ্ডল কয়লা ও জ্বালানি কাঠের ব্যবসা করে; বিত্তবান ব্যক্তি। সুরেশ্বরের বাল্যবন্ধু‌, সুখে-দুঃখে। নিত্য-সহচর। সুরেশ্বরের স্ত্রীকে খুন করিয়া তাহারা পোড়াইতে লইয়া যাইতেছিল একথা সর্বৈব মিথ্যা। তাহারা তাস খেলিতেছিল। বন্ধু-পত্নীর চরিত্র সম্বন্ধে মতামত প্রকাশ করিতে সে অক্ষম; তবে হাসি সদ্যবংশের মেয়ে ছিল না একথা যথার্থ।

দেবু মণ্ডলকে নীলমণিবাবু ভাঙিতে পারিলেন না‌, নূতন কোনও তথ্যও আবিষ্কৃত হইল না। তিনি অবশেষে বলিলেন‌, ‘শ্মশান ঘাটে তোমার কাঠের আড়ৎ আছে?’

দেবু মণ্ডল থতমত খাইয়া বলিল‌, ‘আছে। শহরে দুটো আড়ৎ আছে‌, আর শ্মশানে একটা।’

নীলমণিবাবু কুঞ্চিত চক্ষে কিছুক্ষণ তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন‌, ‘এবার সত্যি কথা বলবো?

দেবু মণ্ডল বলিল‌, ‘সত্যি কথাই বলছি।’

চতুর্থ ব্যক্তির নাম বিলাস দত্ত। ঠিকাদারদের কাজ করে‌, বিলডিং কনট্র্যাক্টর; অতিশয় মিষ্টভাষী ও রসিক। নীলমণিবাবুকে একটি অশ্লীল রসিকতা শুনাইয়া ঘাড় নিচু করিয়া জিভ কাটিল। তাঁস খেলার ব্যাপার সম্বন্ধে কিন্তু তাহার মনে লেশমাত্র সংশয় নাই। নীলমণিবাবু দেখিলেন বিলাস দত্ত যে শ্রেণীর লোক‌, সে অজস্র মিথ্যা কথা বলিবে কিন্তু কাজের কথা একটিও বলিবে না। তিনি হতাশ হইয়া বলিলেন‌, ‘তুমি ঠিকাদার‌, তোমার অনেক বাঁশ আছে?’

বিলাস দত্ত বলিল‌, ‘বাঁশ! আছে বৈকি‌, এন্তার বাঁশ আছে। ভারা বাঁধবার জন্যে দরকার হয় কিনা।’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘হুঁ, মড়ার চালি বাঁধবার জন্যেও দরকার হয়।’

বন্ধু চতুষ্টয়ের জেরা শেষ করিতে রাত কাবার হইয়া গেল।

পরদিন। কিন্তু তাহদের আর হাজতে আটকাইয়া রাখা গেল না। তাহদের উকিল জামিন দিয়া তাহদের খালাস করিয়া লইয়া গেলেন। নীলমণিবাবুর মনে অভ্রান্ত বিশ্বাস জন্মিয়ছিল যে, সুরেশ্বর ঘোষ স্ত্রীকে খুন করিয়াছে এবং বাকি তিনজন এই ব্যাপারে লিপ্ত আছে। কিন্তু প্রমাণ নাই; তিনি যাহা চোখে দেখিয়াছেন তাহার কোন সমর্থক নাই; তাঁহার সাক্ষ্য উকিলের জেরায় উড়িয়া যাইবে। তাই বর্তমানে তিনি তাহাদের নামে খুনের অভিযোগ আনিতে পারিলেন না। কেবল জুয়া খেলার অভিযোগেই তাঁহাকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইল।

তিনি কিন্তু খুনের তদন্তে বিরতি দিলেন না। তিনি দুইজন সহকারী লইয়া সুরেশ্বরের প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করিলেন‌, তাহদের বয়ন শুনিলেন। শেষে বেলা প্ৰায়‌, একটার সময় সুরেশ্বরের বাড়িতে গেলেন। ফটকে একজন কনস্টেবল পাহারায় ছিল‌, সে বলিল‌, সুরেশ্বর বেলা এগারোটা নাগাদ ফিরিয়া আসিয়াছে এবং বাড়িতে আছে।

নীলমণিবাবু গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন‌, সুরেশ্বর শয়নকক্ষের একটা খাটে শুইয়া ঘুমাইতেছে। পুলিসের জুতার শব্দে সে রক্তবর্ণ চক্ষু মেলিয়া উঠিয়া বসিল‌, জড়িত স্বরে বলিল‌, ‘আবার কী চাই?’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘আমরা বাড়ি তল্লাশ করতে এসেছি।’

‘করুন তল্লাশ। যা ইচ্ছে করুন।’ বলিয়া সে আবার শয়নের উপক্রম করিল। তাহার বোধ হয় বেলা পর্যন্ত ঘুমানো অভ্যাস‌, তার উপর কাল সারা রাত্রি জাগরণে গিয়াছে‌, আজ বোধ হয় সারা দিন ঘুমাইবে। কিন্তু–স্ত্রীর মৃত্যুতে তাহার মনে কি একটুও দাগ পড়ে নাই? খুন করুক বা না করুক‌, এমন নিশ্চিন্ত ভাবে ঘুমাইতেছে কি করিয়া!

যাহোক‌, নীলমণিবাবু তাহাকে ঘুমাইতে দিলেন না। বলিলেন‌, ‘তোমার স্ত্রীর গয়নাগুলো দেখতে চাই।’

সুরেশ্বর বিরক্ত মুখে উঠিয়া একটা দেয়াল-আলমারির কপাট খুলিল‌, তাহার একটা তাকে কাপড়-চোপড়ের পেছন হইতে এক থাবা সোনার গহনা বাহির করিল। আটপৌরে গহনা কিছু আছে‌, তাছাড়া তোলা গহনা। নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘এর মধ্যে কোন গয়না তুমি দাওনি?

সুরেশ্বর একটা আংটি‌, এক জোড়া কানের দুল‌, একটা চুলের কাঁটা বাছিয়া তাঁহার হাতে দিল। এ গহনাগুলি নূতন‌, ব্যবহৃত হয় নাই।

নীলমণিবাবু সেগুলি নিজের পকেটে রাখিয়া বলিলেন‌, ‘এগুলো আমি রাখছি। পরে ফেরৎ দেব।’

তারপর তাহার সমস্ত বাড়ি ও বাগান তন্ন তন্ন করিলেন‌, কিন্তু এমন কিছুই পাওয়া গেল না। যাহা হইতে হাসির মৃত্যুর কোন হদিস পাওয়া যায়।

বৈকালে সাড়ে তিনটার সময় নীলমণিবাবু সুরেশ্বরের বাড়ির তদন্ত শেষ করিলেন এবং সহকারীদের ফেরৎ পাঠাইয়া নিজে বিনোদ সরকারের দোকানের দিকে চলিলেন। বাজারের মধ্যে বিনোদ সরকারের সোনা-রূপার দোকানটা তাঁহার দেখা ছিল‌, বেশ বড় দোকান‌, দোকানের মধ্যে কারিগরদের কাজ করিবার কারখানা।

বিনোদবাবু দোকানে ছিলেন‌, একটি সুসজ্জিত কক্ষে টেবিলের সামনে বসিয়া গড়গড়ায় তামাক টানিতেছিলেন। লোকটির বয়স অনুমান পঞ্চাশ‌, কিন্তু ভারি শৌখিন মানুষ। গায়ে তসরের পাঞ্জাবি‌, গিলে করা ফরাসডাঙার ধুতি‌, গোঁফের উপর-নিচে কামাইয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম করিয়া তোলা হইয়াছে‌, মাথার সম্মুখ ভাগে এক গোছা চুল তিনদিক হইতে টাকের আক্রমণ কোনমতে ঠেকাইয়া রাখিয়াছে। আকৃতি একটু খর্ব‌, কিন্তু তদনুপাতে বেশ গোলগাল।

পুলিস দেখিয়া তিনি একটু বিব্রত হইলেন‌, বলিলেন‌, ‘কি ব্যাপার বলুন তো? আমার দোকানে কি কোন গণ্ডগোল হয়েছে?’

নীলমণিবাবু সামনের চেয়ারে বসিলেন‌, বলিলেন‌, না। আপনার কাছে কিছু খবর জানতে এসেছি।’

বিনোদবাবু ধাতস্থ হইলেন‌, নীলমণিৰাবুর দিকে পানের ডিবা ও জদার কোটা বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন‌, ‘কি খবর?’

নীলমণিবাবু পান লইলেন না‌, জদার কোটা হইতে এক চিমটি জাদা লইয়া মুখে দিলেন‌, ধীরে ধীরে বলিলেন‌, ‘সুরেশ্বর ঘোষের স্ত্রী মারা গেছে আপনি জানেন?’

বিনোদবাবু চেয়ার হইতে প্রায় লাফাইয়া উঠিলেন‌, ‘হাসি মারা গেছে! সে কি! কাল বিকেলে যে আমি তাকে দেখেছি।’

‘কাল রাত্রে মারা গেছে।’

‘রাত্ৰে! কিন্তু বিকেলবেলা সে তো ভালই ছিল। কিসে মারা গেল? কী হয়েছিল তার?’ ‘আমার বিশ্বাস কাল রাত্রে তাকে খুন করা হয়েছে।’

‘খুন!’ বিনোদবাবু আস্তে আস্তে চেয়ারে বসিলেন‌, কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিয়া হঠাৎ টেবিলের উপর প্রচণ্ড চাপড় মারিয়া বলিলেন‌, ‘সুরেশ্বর খুন করেছে। ও ছাড়া আর কেউ নয়।’

‘সুরেশ্বরের কিন্তু অকাট্য অ্যালিবাই আছে।’

‘থাক‌, অ্যালিবাই‌, এ সুরেশ্বরের কাজ। সুরেশ্বর আর ওর ওই তিনটে বন্ধু মহা ধূর্ত আর পাজি। ওদের অসাধ্য কোজ নেই।’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘আপনি হাসিকে অনেক দিন থেকে চেনেন?’

‘ওকে তিন-চার বছর বয়স থেকে দেখে আসছি।’ তিনি নলটি মুখ হইতে লইয়া কিছুক্ষণ তাহার অগ্রভাগ পরিদর্শন করিলেন‌, একবার নীলমণিবাবুর দিকে চকিত কটাক্ষ নিক্ষেপ করিলেন; তারপর হ্রস্ব স্বরে বলিলেন‌, ‘আপনি পুলিস‌, আপনার কাছে লুকোব না‌, কম বয়সে আমি একটু-ইয়ে-হাসির মায়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সে আজ বিশ-বাইশ বছর আগেকার কথা। হাসির ব্যাপটা ছিল। হতভাগা চোর‌, নেশাখোর‌, জালিয়াৎ। স্ত্রী-কন্যাকে খেতে দিতে পারত না। হাসির মা পেটের দায়ে-কিন্তু সে যাক। বছর কয়েক আগে হাসির মা মারা গেল। মৃত্যুকালে আমাকে ডেকে মিনতি করে বলে গিয়েছিল‌, হাসিকে তুমি দেখো‌, জামাইয়ের মন ভাল নয়।–তার মৃত্যু-শয্যার অনুরোধ আমি এড়াতে পারিনি; হাসিকে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসতাম। হাসির মা সতীসাধবী ছিল না‌, কিন্তু তার প্রকৃতি ছিল বড় মধুর।’

কিছুক্ষণ আর কোন কথা হইল না। তারপর নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘তাহলে আপনার সন্দেহ সুরেশ্বরবাবু হাসিকে খুন করেছে?’

বিনোদবাবু যেন স্মৃতি-সমূত্রের তলদেশ হইতে উঠিয়া আসিলেন‌, ‘অ্যাঁ! হ্যাঁ, আমার তাই বিশ্বাস।‘

‘কিন্তু কেন? মোটিভ কি?’

‘দেখুন‌, সুরেশ্বর যখন হাসিকে বিয়ে করেছিল‌, তখন তার চালচুলো কিছু ছিল না। তারপর যুদ্ধের বাজারে সে বড়লোক হল। তখন তার উচ্চাশা হল সে ভদ্রসমাজে মিশবে‌, দশজনের একজন বলে গণ্য হবে। কিন্তু হাসি বেঁচে থাকতে সে-সম্ভাবনা নেই; হাসির মা-বাপের কেচ্ছা! শহরে কে না জানে? তাই সুরেশ্বর হাসিকে মেরেছে। এবার নতুন বিয়ে করে ভদ্রলোক হয়ে বসবে।’

‘হাসির স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল?’

‘হেলাগোলা মেয়ে ছিল‌, মনে ছল-কপট ছিল না। একটু হয়তো পুরুষ-ঘেঁষা ছিল‌, ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে থাকত‌, রাস্তা দিয়ে লোক গেলে ডেকে কথা কইত। কিন্তু তাতেও তাকে দোষ দেওয়া যায় না। পাড়ার মেয়েরা ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বলত না‌, কেউ বা বাঁকা কথা বলত। হাসিও তো মানুষ‌, তারও তো কথা কইবার দুটো লোক দরকার। আমি জোর করে বলতে পারি‌, অন্য দোষ তার যতাই থাক‌, মন্দ সে ছিল না।’

নীলমণিবাবু কোটা হইতে আর এক টিপ জব্দ মুখে দিলেন‌, তারপর পকেট হইতে গহনাগুলি বাহির করিয়া বিনোদবাবুর সম্মুখে রাখিলেন‌, ‘দেখুন তো‌, এগুলো চিনতে পারেন?

‘হাসির গয়না নাকি?’ বলিয়া বিনোদবাবু সেগুলি হাতে তুলিয়া লইলেন‌, তারপর মাথা নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘এ গয়না। আমি হাসিকে কখনো পরতে দেখিনি।’

‘আপনি কখনো তাকে গয়না উপহার দেননি?’

বিনোদবাবু মাথা নাড়িলেন‌, ‘না। আমি তাকে পুজো আর দোলের সময় একখানা করে শাড়ি দিতাম। গয়না কখনো দিইনি।’

নীলমণিবাবু বলিলেন‌, ‘এ গয়না কি আপনার দোকানে তৈরি?’

বিনোদবাবু ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া গহনাগুলি আবার পরীক্ষা করিলেন‌, বলিলেন‌, ‘না‌, এ গয়না আমার কারিগরের তৈরি নয়। কিন্তু‌, দাঁড়ান—’ তিনি ঘণ্টি টিপিয়া চাকরকে ডাকিলেন-‘রামদয়ালকে পাঠিয়ে দাও।’

চশমা চোখে বয়স্থ কারিগর রামদয়াল আসিলে, তাহার হাতে গহনাগুলি দিয়া বলিলেন, ‘দেখ তো‌, এ গয়না কি আমাদের তৈরি?’

রামদয়াল ভাল করিয়া দেখিয়া বলিল‌, ‘আজ্ঞে না‌, এ গয়না। কলকাতার কারিগরের তৈরি।’

‘আচ্ছা‌, যাও।’

নীলমণিবাবুও উঠিলেন, গহনাগুলি পকেটে রাখিয়া বলিলেন, ‘আজ তবে উঠি, যদি দরকার হয় আবার আসব।’

Print Friendly
%d bloggers like this: