দেবালোকে প্রমীলা

মাত্র ইহলোকেই যে প্রমীলা পুরুষ ভজে, তা নয়। দেবলোকেও সে ঘরকন্না করে পুরুষ দেবতাদের সঙ্গে, দেবলোকের অন্তঃপুরে। মানুষ তার দেবতাদের নিজ প্রতিরূপেই কল্পনা করে নিয়েছিল। সেজন্য আমরা মনুষ্যলোকের অন্তঃপুরের সঙ্গে দেবতাদের অন্তঃপুরের কোনো প্ৰভেদ দেখি না। মনুষ্যলোকের অন্তঃপুরে যেমন একদিকে দেখা যায় পাতিব্ৰত্য ও অপরদিকে ব্যভিচার, দেবলোকের অন্তঃপুরেও তেমনই একদিকে দেখা যায় পতিভক্তির চরম নিদর্শন ও অপরদিকে ব্যভিচারী স্বামী ও স্ত্রী। মনুষ্যলোকে যেমন সাধী স্ত্রী বিব্রত হয় মুরাপায়ী স্বামীকে নিয়ে এবং ব্যাধি ও মহামারীর প্রকোপে, দেবলোকেও তাই।

ইন্দ্রকে বলা হ’ত দেবরাজ। সেজন্য ইন্দ্রের অন্দরমহলাই ছিল আদশ অন্দরমহল। ইন্দ্রের অন্দরমহলে বাস করত ইন্দ্রের স্ত্রী ও সন্তান। বোধহয় ইন্দ্রের পিতাও ওই একই সংসারে থাকত।

ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্ৰাণী নামে পরিচিত। ইন্দ্রের স্ত্রী বলেই তাকে ইন্দ্ৰাণী বলা হ’ত। তা না হলে, তার আসল নাম ছিল শচী। তৈক্তিরীয় ব্ৰাহ্মণ অনুযায়ী ইন্দ্ৰ যৌন আবেদনে আকৃষ্ট হয়ে অন্য সুন্দরীদের প্রত্যাখ্যান করে ইন্দ্ৰাণীকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু অন্যান্য গ্রন্থে আছে যে, ইন্দ্ৰ ইন্দ্রাণীর সতীত্ব নষ্ট করে ও তার পিতা পুলোমাকে হত্যা করে ইন্দ্ৰাণীকে বিবাহ করেছিল।

প্ৰজাপতির ন্যায় ইন্দ্র স্বয়ম্বু দেবতা নয়। ত্বষ্টা তার পিতা, অদিতি তার মাতা। স্বাভাবিকভাবে মায়ের গর্ভদ্বার দিয়ে ইন্দ্ৰ নিৰ্গত হয়নি। ইন্দ্ৰ মায়ের পেট বিদীর্ণ করে পেটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

ইন্দ্রের মতো স্বামীকে নিয়ে ঘর করায় শচীয় যথেষ্ট কৃতিত্ব ছিল। শুধু তাই নয়, দেবলোকের অন্য মেয়েদের মতো শচীর চরিত্র কলঙ্কিত ছিল না। শচী ছিল পতিপরায়ণ স্ত্র, যদিও অন্দরমহলে শচীর স্বস্তি ছিল না। স্বামী ছিল সুরাপায়ী ও ব্যভিচারী। দেবতাদের সুরা ছিল সোমরস, যা মনুষ্যলোকেও ঋষিয়া ও মানুষেরা পান করত। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে ইন্দ্র এত সোমরস পান করত যে, তার উদর ছিল সোমরসের হ্রদ। অত্যধিক সোমরস পানের ফলে তার উদর সবসময়। স্ফীত হয়ে থাকত। সুরাপায়ী, দেবতা হলেও, যৌনজীবনে ইন্দ্ৰ ইন্দ্ৰাণীর প্ৰতি অমনোযোগী ছিল না। এর কারণ মনে হয় ইন্দ্ৰাণী এক বিশেষ রকম রমণ-পদ্ধতিতে অভিজ্ঞা ছিল। এটা আমরা জানতে পারি বাৎস্যায়নের কামসূত্র থেকে। নাগরিক সমাজের লোকেরা কিভাবে তাদের যৌনজীবনকে সুখময় করে তুলত, তার পরিচয় দিতে গিয়ে, বাৎস্যায়ন তাঁর ‘কামসূত্ৰ’-তে মানুষ যতরকম পদ্ধতিতে (coital postures) রতিক্রিয়ায় প্ৰবৃত্ত হতে পারে তার এক বিবরণ দিয়েছেন। বাৎস্যায়ন এক বিশেষ রকম পদ্ধতিতে রমণের নাম দিয়েছেন ‘ইন্দ্রাণিক রতি’। তিনি বলেছেন, যেহেতু ইন্দ্ৰাণী শচী এই বিশেষ পদ্ধতিতে রতিক্রিয়া করতে ভালবাসতেন, সেইহেতু এই পদ্ধতির নাম ‘ইন্দ্রাণিক রতি’। পদ্ধতি যাই হোক, ইন্দ্রের ঔরসে শচীর এক পুত্র হয়েছিল, নাম জয়ন্ত।

মনুষ্যসমাজে মানুষ যেমন ব্যাধি ও মহামারীতে বিব্রত হয়, ইন্দ্রের অন্দরমহলেও একবার তাই ঘটেছিল। ইন্দ্রের একমাত্র পুত্র জয়ন্তু একবার বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। কাহিনীটা সুন্দরভাবে বিবৃত করেছেন দাশু রায় তাঁর পাঁচালীতে। এই কাহিনী অনুযায়ী রাজা নহুষ একবার পুত্ৰেষ্টি যজ্ঞ করেছিলেন। যজ্ঞাগ্নি নিৰ্বাপিত হয়ে শীতল হলে, তা থেকে এক পরমাসুন্দরী রমণী আবির্ভূত হন। ব্ৰহ্মা ষ্ঠার নাম দেন শীতলু, এবং বলেন, ‘তুমি পৃথিবীতে গিয়ে বসন্তের কালাই ছাড়াও। এরূপ করলে লোকে তোমার পূজা করবে।‘ শীতলা বললেন, ‘আমি এক পৃথিবীতে গেলে লোকে আমার পূজা করবে না, আপনি আমার একজন সঙ্গী দিন।‘ ব্ৰহ্মা পৃষ্ঠাকে কৈলাসে শিবের কাছে যেতে বলেন। শীতলা কৈলাসে গিয়ে শিবের কাছে তার প্রয়োজনেয়। কথা বলেন। মহাদেব চিন্তিত হয়ে ঘামতে থাকেন। তঁরা ঘাম থেকে জরামুর নামে এক ভীষণাকার অসুর স্বষ্টি হয়। জরাসুর শীতলার সঙ্গী হয়। কিন্তু শীতলা বলেন, ‘দেবতারা যদি আমার পূজা না করেন, তাহলে পৃথিবীর লোক আমার পূজা করবে। কেন? তখন শিব তাঁকে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশে ইন্দ্রপুরীতে যেতে বলেন। ইন্দ্রপুরীর রাস্তা দিয়ে যাবার সময় জ্বরাসুরের মাথা থেকে বসন্তের কলাইয়ের ধামাটা রাস্তায় পড়ে যায়। সে-সময় ইন্দ্রের ছেলে জয়ন্ত সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। শীতলা তাকে ধামাটা জ্বরাসুরের মাথায় তুলে দিতে বলেন। ইন্দ্রের ছেলে এটা তার পক্ষে মৰ্যাদাহানিকর মনে করে ব্ৰাহ্মণীকে ঠেলে ফেলে দেয়। শীতলার আদেশে জরাসুর ইন্দ্রের ছেলেকে আক্রমণ করে। এর ফলে ইন্দ্রের ছেলে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়। তারপর শীতলা দেবসভায় গিয়ে ইন্দ্ৰকে আশীৰ্বাদ করেন। ইন্দ্ৰ তো চটে লাল! ভাবেন, সমস্ত জগতের লোক তাঁকে পূজা করে, আর এ কোথাকার এক বুড়ী এসে র্তাকে আশীৰ্বাদ করছে! এর আস্পর্ধা তো কম নয়! ইন্দ্র তাকে মেরে তাড়িয়ে দেন। তারপর ইন্দ্র নিজেও বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। অন্য দেবতারাও হন। মহামায়ার দয়া হয়। তিনি গিয়ে শিবের শরণাপন্ন হন। শিব বলেন, ‘দেবতারা সকলে শীতলার পূজা করুক, তাহলে রোগমুক্ত হবে।‘ তখন দেবতারা ঘটা করে শীতলার পূজা করে। (সম্পূর্ণ কাহিনীটির জন্য লেখকের ‘বাঙলা ও বাঙালী’ গ্রন্থের ১০২-১০৩ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।

ইন্দ্র ও তার পুত্র জয়ন্ত দুজনেই যখন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, তখন ইন্দ্রের অন্দরমহলে ইহলোকের স্ত্রী ও জননীদের মতো, ইন্দ্রাণীকেও বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছিল। আবার ইহুলোকের মেয়েদের মতো ইন্দ্ৰাণীকেও শীতলা। পুজার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

ইন্দ্ৰাণী অত্যন্ত পতিপরায়ণা রমণী ছিল। এটা আমরা জানতে পারি রাজা নহুষের কাহিনী থেকে। একবার দেবতা ও মহৰ্ষিরা ব্ৰহ্মহত্যা ও মিথ্যাচারে বৃত্ৰাসুরকে নিহত করার জন্য ইন্দ্রকে স্বৰ্গ থেকে বিতাড়িত করেন। তঁরা রাজা নহুষকে ইন্দ্রের আসনে বসান। কিন্তু ইন্দ্র ছিল ব্যভিচারী দেবতা। সুতরাং আসনের দোষ যাবে কোথায়? নহুষ কামার্তে হয়ে ইন্দ্রের স্ত্রী শচীকে হস্তগত করবার চেষ্টা করে। শচী বিপদাপন্ন হয়ে নিজেকে নহুষের কামলালসা থেকে রক্ষা করবার জন্য দেবগুরু বৃহস্পতির শরণাপন্ন হয়। বৃহস্পতির পরামর্শে শচী নহুষকে বলে যে, নাহুষ যদি সপ্তর্ষি-বাহিত যনে তার কাছে আসে, তাহলে সে নহুষের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। নাহুষ সপ্তর্ষি-বাহিত শিবিকায় যাবার সময় অগস্ত্যের মাথায় পা দিয়ে ফেলে। এর ফলে, অগস্ত্যের শাপে নহুষ অজগরসর্পরূপে বিশাখাযুপ বনে পতিত হয়। এভাবে শচীর সতীত্ব রক্ষা পায়।

কিন্তু শচী পতিপরায়ণা হলেও, ইন্দ্ৰ একান্তভাবে স্ত্রীপরায়ণ ছিলেন না। অন্য দেবতাদের মতো ইন্দ্ৰ ব্যভিচারী দেবতা ছিলেন। অজাচারী হবার জন্যও তিনি একবার উদ্যত হয়েছিলেন। তাঁর ব্যভিচারের সর্বজনবিদিত দৃষ্টান্ত হচ্ছে গৌতম ঋষির অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী অহল্যাতে উপগত হওয়া। অহল্যা ইন্দ্ৰকে চিনতে পেরেও সে-সময় কামার্তা ছিল। বলে দুর্মাতিবশত ইন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গমে রত হয়েছিল। (এ সম্বন্ধে লেখকের ‘বাঙলা ও বাঙালী’, পৃষ্ঠা ৮৪ দেখুন)।

ইন্দ্রের অজাচারের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঋগ্বেদের ১৫২৷৷১৩ সম্বন্ধে সায়ন ভাষ্যে। সে উল্লেখ অনুযায়ী ইন্দ্র একবার বৃষণশ্চ রাজার কন্য মেনা হয়েছিল। পরে ইন্দ্ৰ ইন্দ্ৰত্বে ফিরে আসবার পর মেনাকে প্রাপ্তযৌবনা দেখে স্বয়ং তার সঙ্গে সহবাস অভিলাষ করেছিল। কিন্তু ইন্দ্রের এসব ব্যভিচার ও অজাচারপ্রবৃত্তি নিয়ে ইন্দ্রের অন্দরমহলে শচীর সঙ্গে তার কোনদিন বাকবিতণ্ডা বা কলহ ঘটেনি।

আগেই বলেছি যে, ইন্দ্রের সংসারে বোধহয় তার পিতাও বাস করত। এটা আমরা জানতে পারি ইন্দ্রের সুরাপানের বহর থেকে। বলা হয়েছে, ইন্দ্র এমনই সুরাসক্ত ছিল যে, তার পিতার কাছ থেকেও কেড়ে নিয়ে সে সুরা পান করত।

***

সূক্তসংখ্যার দিক দিয়ে বিচার করলে, ইন্দ্রের পরেই অগ্নি ছিল আৰ্যদের দ্বিতীয় প্রধান দেবতা। অগ্নি দ্যাবাপৃথিবীর পুত্র। আবার বলা হয়েছে, অরণিদ্বয় অগ্নির জনক-জননী। জাত হওয়া-মাত্ৰই অগ্নি জনকজননীকে ভক্ষণ করেছিল। আবার মহাভারতে বলা হয়েছে যে, ধর্মের ঔরসে ও বসুভাৰ্যার গর্ভে অগ্নির জন্ম।

প্রথম উক্তি অনুযায়ী অগ্নির সংসারে তার পিতামাতার অবস্থানের প্রশ্ন ওঠে না। দ্বিতীয় উক্তি সম্বন্ধে মহাভারত নীরব। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে, অগ্নির অন্দরমহলে ছিল মাত্র তার স্ত্রী স্বাহা ও তিন পুত্ৰ–পাবক, পবিমান ও শুচি।

ইন্দ্রের অন্দরমহলে শচী যেমন ছিল নিষ্কলঙ্কা রমণী, অগ্নির সংসারে স্বাহ ছিল তেমনই অপবিত্ৰা। স্বাহা ছিল। দক্ষের মেয়ে। বিয়ের আগেই * স্বাহা অত্যন্ত কামাসক্ত ছিল। একবার সপ্তষিদের যজ্ঞে অগ্নি সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের দেখে কামার্ত হয়ে ওঠে। স্বাহা এটা লক্ষ্য করে। স্বাহা তখন এক-এক ঋষিপত্নীর রূপ ধরে ছয়বার অগ্নির সঙ্গে মিলিত হয়। পরে স্বাহা অগ্নির স্ত্রী হয়। কিন্তু অগ্নির অন্তঃপুরে এসেও স্বাহার স্বভাব পরিবর্তিত হয় না। নিজের স্বামীকে ছেড়ে, স্বাহা কৃষ্ণকে স্বামিরূপে পাবার জন্য তপস্যা করতে থাকে। তার মানে, স্বাহ নিজ স্বামীর পরিবর্তে পরপুরুষ কৃষ্ণকেই ভজনা করত। বিষ্ণুর বরে স্বাহা দ্বাপরে নগ্নজিৎ রাজার মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করে ও কৃষ্ণকে স্বামিরূপে পায়।

মনুষ্যলোকের মতো অগ্নিও ব্যাধিমুক্ত ছিল না। মহাভারতে আছে অগ্নি শ্বেতকী রাজার যজ্ঞে অতিরিক্ত হব ভক্ষণ করে দুঃসাধ্য অগ্নিমান্দ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। পরে কৃষ্ণ ও অৰ্জ্জুনের সাহায্যে রোগমুক্ত হয়।

***

বৈদিক যুগের অপর প্রধান দেবতা হচ্ছে সূৰ্য। সূর্যের সংসারেও ছিল অশান্তি। তার স্ত্রী সংজ্ঞা তাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সংজ্ঞা বিশ্বকৰ্মার মেয়ে। সূর্যের সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছিল। সংজ্ঞার গর্ভে সূর্যের তিন সন্তান হয়-বৈবস্বত মনু, যম ও যমুনা। কিন্তু সূর্যের অসহ্যু তেজ সহ্য করতে না পেরে, সংজ্ঞা নিজের অনুরূপ ছায়া নামে এক নারীকে সূর্যের কাছে রেখে, উত্তর কুরুবর্ষে ঘোটকীর রূপ ধারণ করে বিচরণ করতে থাকে। সূৰ্য প্রথম এটা বুঝতে পারেনি। ছায়ার সঙ্গেই সূর্য ঘর করতে থাকে এবং ছায়ার গর্ভে সাবর্ণি মনু ও শনি নামে দুই পুত্র ও তপতী নামে এক কন্যা হয়। পরে সূৰ্য যখন এটা জানতে পারে, তখন সূৰ্য বিশ্বকৰ্মার কাছে গিয়ে নিজের তেজ হ্রাস করে অশ্বরূপ ধারণ করে ঘোটকীরূপিণী সংজ্ঞার কাছে এসে তার সঙ্গে সঙ্গমে রত হয়। * এই মিলনের ফলে প্ৰথম যুগল-দেবতা অশ্বিনীকুমার ও পরে রেবন্তের জন্ম হয়। সূর্যের তেজ সংহত হয়েছে দেখে, সংজ্ঞা তখন নিজের রূপ। ধারণ করে স্বামিগুহে ফিরে আসে।

সূৰ্যও পরস্ত্রীতে উপগত হ’ত। মহাভারত অনুযায়ী সূর্যের ঔরসে ও কুন্তীর গর্ভে কর্ণের জন্ম হয়। আবার রামায়ণ অনুযায়ী ঋক্ষরজার গ্রীবায় পতিত সূর্যের বীর্য থেকে সুগ্ৰীবের জন্ম হয়।

সূর্যের অন্দরমহলে ঘটেছিল এক অজাচারের (incest) ঘটনা। যম সূর্যের পুত্র। ঋগ্বেদ অনুযায়ী যমী তার যমজ ভগিনী। ঋগ্বেদে দেখি, যমী তার যমজ ভ্রাতা যমের কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করছে। কাহিনীটি ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দশম সুক্তে আছে। সেখানে যমী। যমকে বলছে, ‘চল আমরা এক নির্জন স্থানে গিয়ে সহবাস করি, কেননা বিধাতা মনে মনে চিন্তা করে রেখেছেন যে তোমার ঔরসে আমার গর্ভে আমাদের পিতার এক সুন্দর নপ্ত (নাতি) জন্মিবে।‘ যম তার উত্তরে বলে, ‘তোমার গর্ভসহচর তোমার সঙ্গে এ-প্রকার সম্পর্ক কামনা করে না। যেহেতু তুমি সহোদর ভগিনী, তুমি অগম্যা৷’ যমী তার উত্তরে বলছে, ‘যদিও মানুষের পক্ষে এরূপ সংসৰ্গ নিষিদ্ধ, দেবতারা এরূপ সংসৰ্গ ইচ্ছাপূর্বক করে থাকে। তুমি আমার প্রতি অভিলাষযুক্ত হও, এস এখানে আমরা উভয়ে শয়ন করি। আমি তোমার নিকট আমার নিজ দেহ সমৰ্পণ করে দিই।‘ যমের উক্তি : ‘তোমার ভ্রাতার এরূপ অভিলাষ নেই।‘ উত্তরে যমী বলে, ‘তুমি নিতান্ত দুর্বল পুরুষ দেখছি।‘ (ঋগ্বেদ ১০.১০.৭-১৪)

***

দেবতাদের গুরু হচ্ছে বৃহস্পতি। বৃহস্পতির অন্তঃপুরেই ঘটেছিল দেবলোকের সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি। বৃহস্পতির স্ত্রী হচ্ছে তারা। তারার রূপলাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে চন্দ্র একবার তারাকে হরণ করে। এই ঘটনায় বৃহস্পতি ক্রুদ্ধ হয়ে চন্দ্ৰকে শাস্তি দেবার জন্য দেবতাদের সাহায্য প্রার্থনা করে। তারাকে প্ৰত্যপণের জন্য দেবতা ও ঋষিগণ চন্দ্ৰকে অনুরোধ করে। চন্দ্ৰ তারাকে ফেরত দিতে অসম্মত হয় এবং দৈত্যগুরু শুক্রচার্যের সাহায্য প্রার্থনা করে। রুদ্রদেব বৃহস্পতির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দেবাসুরের মধ্যে এক ভীষণ যুদ্ধের আশঙ্কায় ব্ৰহ্মা মধ্যস্থ হয়ে বিবাদ মিটিয়ে দেন। চন্দ্ৰ তারাকে বৃহস্পতির হাতে প্রত্যপণ করে। কিন্তু তারা ইতিমধ্যে চন্দ্র কর্তৃক গর্ভবতী হওয়ায়, বৃহস্পতি তাকে গৰ্ভত্যাগ করে তার কাছে আসতে বলে। তারা গৰ্ভত্যাগ করার পর এক পুত্রের জন্ম হয়। এর নাম দসু্য সুস্তম। ব্ৰহ্মা তারাকে জিজ্ঞাসা করেন, এই পুত্র চন্দ্রের ঔরসজাত কিনা। তারা ইতিবাচকউত্তর দিলে চন্দ্ৰ সেই পুত্রকে গ্ৰহণ করে ও তার নাম রাখে বুধ।

এখানে উল্লেখনীয় যে, দেবগুরু বৃহস্পতি নিজেও সাধুচরিত্রের দেবতা ছিলেন না। তিনি কামলালসায় অভিভূত হয়ে নিজ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রী মমতার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বলপূর্বক তার সঙ্গে সঙ্গম করেছিলেন।

কচ দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র। সঞ্জীবনীবিদ্যা হরণ করে আনবার জন্য বৃহস্পতি কচকে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এই উপলক্ষেই সৃষ্ট হয়েছিল শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর সঙ্গে কচের অনুপম প্ৰেমকাহিনী।

***

দেবগুরু বৃহস্পতি ছাড়া, বৈদিক যুগের তিন প্ৰধান দেবতার অন্দরমহল সম্বন্ধে আমরা বললাম। এবার আমরা পৌরাণিক যুগের তিন শ্ৰেষ্ঠ দেবতা-ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের অন্দরমহল সম্বন্ধে বলব। বেদ বা ব্ৰাহ্মণ-গ্ৰন্থসমূহে ব্ৰহ্মার উল্লেখ নেই। সৃষ্টিকর্তা হিসাবে ব্ৰহ্মার স্থলে আছে হিরণ্যগৰ্ভ প্ৰজাপতির উল্লেখ। মনুসংহিতা অনুযায়ী যিনিই ব্ৰহ্মা, তিনিই প্ৰজাপতি। তার মানে, পৌরাণিক যুগে ব্ৰহ্মাই ছিলেন সৃষ্টিকর্তা।

সৃষ্টির প্রারম্ভেই ব্ৰহ্মা অজাচারে (incest) লিপ্ত হয়েছিলেন। ব্ৰহ্মা প্ৰথমে নয়জন মানসপুত্র সৃষ্টি করেন। তারপর এক কন্যা সৃষ্টি করেন। এই কন্যার নাম শতরূপা। ব্ৰহ্মা এই কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে একেই বিবাহ করেন। এই কন্যার গর্ভ হতেই স্বয়ম্বুব মনুর জন্ম হয়। আবার অন্য কাহিনী অনুযায়ী মনুর সঙ্গে শতরূপার বিবাহ হয়েছিল এবং বিবাহান্তে মনু ও শতরূপ। যখন ব্ৰহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘পিতঃ, আমরা কোন কর্মের দ্বারা আপনার যথোচিত সেবা করব? ব্রহ্মা বলেছিলেন, ‘তোমরা মৈথুন কর্ম দ্বারা প্ৰজা উৎপাদন কর। তাতেই আমার তুষ্টি।’ এককথায় ব্রহ্মা এক মহান (biological truth-এর প্রবক্তা।

তবে অধিকাংশ পুরাণ অনুযায়ী আমরা ব্ৰহ্মার অন্দরমহলে দেখি শতরূপার পরিবর্তে তাঁর স্ত্রী হিসাবে সরস্বতীকে। ব্ৰহ্মার দুই কন্যাদেবসেনা ও দৈত্যসেনা। দেবসেনা বিয়ে করেছিল শিবানীর পুত্ৰ কাৰ্তিকেয়াকে। আর দৈত্যসেনাকে কেশী দানব বলপূর্বক হরণ করে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল।

নারীর সৌন্দৰ্য দেখবার জন্য ব্ৰহ্মা লালায়িত। পুরাণে আছে, বিশ্বকর্ম যখন অপ্সরা তিলোত্তমাকে সৃষ্টি করে এবং সৃষ্টির পর তিলোত্তম। যখন দেবতাদের প্রদক্ষিণ করে, তখন তাকে দেখবার জন্য ব্ৰহ্মার চারদিকে চারটি মুখ সৃষ্টি হয়েছিল।

 

***

 

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী প্ৰজাপতি কশ্যপের ঔরসে অদিতির গর্ভে বিষ্ণু জন্মগ্রহণ করেন। বিষ্ণুর দুই স্ত্রী লক্ষ্মী ও সরস্বতী। বিষ্ণুর পুত্ৰ কামদেব। কামদেবের স্ত্রী রতি। অথর্ববেদ অনুযায়ী কামদেব মঙ্গলময় দেবতা। কিন্তু পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী তিনি প্রেম ও প্ৰণয়ের দেবতা।

শ্ৰীমদভাগবত অনুযায়ী পঞ্চম (রৈবত) মন্বন্তরে বিষ্ণু শুক্রের ঔরসে ও তাঁর স্ত্রী বৈকুণ্ঠার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। লক্ষ্মী তার স্ত্রী। লক্ষ্মীর ইচ্ছা অনুযায়ী বিষ্ণু বৈকুণ্ঠলোকে তার আবাসস্থল ও অন্তঃপুর স্থাপন করেন। লক্ষ্মী সাধ্বী স্ত্রী। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিষ্ণু ব্যভিচারে লিপ্ত হতেন। তিনি তুলসী ও বৃন্দার সতীত্ব নাশ করেছিলেন।

দ্বাপরে বিষ্ণুই কৃষ্ণ। রাধিকা তার প্রণয়িনী। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুযায়ী, গোলোকে একদিন রাধিকা কৃষ্ণকে তুলসীর সহিত রতিক্রিয়ায় রত দেখে তুলসীকে অভিশাপ দেয়, ‘তুই মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করবি।‘ কিন্তু কৃষ্ণ তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘তুমি মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করলেও তপস্যা দ্বারা আমার এক অংশ পাবে।‘ তুলসী শঙ্খচূড়ের স্ত্রীরূপে মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করে। বিষ্ণু ছলনা দ্বারা তুলসীর সতীত্বনাশ করে। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী শিলারূপী বিষ্ণু সর্বদ তুলসীযুক্ত হয়ে থাকেন। মতান্তরে, বিষ্ণু যখন জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দার সতীত্ব নাশ করেন, তখন বৃন্দা বিষ্ণুকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে বিষ্ণু বৃন্দাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘তুমি স্বামী জলন্ধরের সঙ্গে সহমৃতা হও। তোমার ভস্মে তুলসী, ধাত্রী, পলাশ ও অশ্বখ এই চারিপ্ৰকার বৃক্ষ উৎপন্ন হবে। ’ এই কাহিনী অনুযায়ী বৃন্দা থেকেই তুলসীর উৎপত্তি।

দ্বাপরে বিষ্ণু কৃষ্ণ হয়ে যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁর অন্তঃপুরে ষোল হাজার একশত স্ত্রী ছিল। (বিষ্ণুপুরাণ অনুযায়ী ষোল হাজার একশত, ষোল হাজার নয়)। সাধারণ লোকের ধারণা, এরা সকলেই গোপকন্যা। কিন্তু সে-ধারণা ভুল। বিষ্ণুপুরাণ (৫। ১১১৪) অনুযায়ী তারা নানা দেশ থেকে অপহৃত নারী ছিল। পুরাণে লিখিত আছে যে, একই সময় পৃথক পৃথক ভাবে কৃষ্ণ সেইসকল কন্যার ধর্মানুসারে বিধি অনুযায়ী পাণিগ্রহণ করেছিলেন, যাতে সেই কন্যাগণ, প্ৰত্যেকে মনে করেছিল যে কৃষ্ণ শুধুমাত্র তাকেই বিবাহ করলেন। তাছাড়া, প্রতি রাত্রেই তিনি তাদের প্রত্যেকের ঘরে গমনপূর্বক বাস করতেন। (‘নিশাসু চ জগৎস্রষ্টা তাসাং গেহেষু কেশবঃ’)।

***

এবার শিবের কথায় আসা যাক। শিবের নিবাস কৈলাসে। সেখানেই তার অন্দরমহল। শিবেব অনুচররা হচ্ছে নন্দী ও ভূঙ্গী, বিদ্যাধরী-বিদ্যাধরীরা ও প্রমথগণ। শিব মহাযোগী। কিন্তু শিবের ধনদৌলত অনেক। সেজন্য শিবের একজন ধনরক্ষক ছিল। নাম যক্ষরাজ কুবের। কুবেরের পিতা পৌলস্ত্য বা বিস্ৰবা, মাতা ভরদ্ধাজ-কন্যা দেববর্ণিনী। কুবেরের বৈমাত্রেয় ভাই রাবণ। রাবণ লঙ্কার অধিকার চাইলে কুবের কৈলাসে গিয়ে বাস করে। শিব তাকে তার ধনরক্ষক নিযুক্ত করে। কুবেরের স্ত্রী আহুতি; নলকুবর ও মণিগ্রীব তার দুই ছেলে ও মীনাক্ষী তার মেয়ে।

শিবকে সব দেবতাই মান্য করে। সেজন্য শিবকে মহাদেব বলা হয়। শিবের মানসন্ত্ৰম-জ্ঞান খুব বেশি। ব্ৰহ্মা একবার শিবকে অপমানসুচক কথা বলেছিলেন বলে নিজের একটা মুণ্ড হারিয়েছিলেন। (আগে ব্ৰহ্মার পাঁচ মুণ্ড ছিল, কিন্তু সেই থেকেই ব্ৰহ্মার চার মুণ্ড হয়)। শিব অত্যন্ত রাগী মানুষ। কিন্তু আবার সহজেই তুষ্ট হন। শিব সংহারকর্তা। আবার সংহারের পর সৃষ্টিকর্তাও বটে।

অন্তঃপুরের মধ্যে শিবের মতো স্বামীকে নিয়ে ঘর করা শিবানীর পক্ষে খুব মুশকিলের ব্যাপার ছিল। শিব প্রথম বিয়ে করেছিলেন দক্ষকন্যা সতীকে। ভূগুষজ্ঞে শিব শ্বশুরকে প্ৰণাম করেননি বলে, দক্ষ ক্ৰন্ধ হয়ে শিবহীন যজ্ঞ করে। সতী অনিমন্ত্রিতা হয়েও সেই যজ্ঞে উপস্থিত হয়। সেখানে সতীকে দেখে দক্ষ শিবনিন্দা শুরু করায়, সতী যজ্ঞস্থলে প্ৰাণত্যাগ করে। শিব সে-সংবাদ পেয়ে দক্ষালয়ে যায় ও দক্ষযজ্ঞ নাশ করে। দক্ষের মুগুচ্ছেদ করেন। তারপর সতীর মৃতদেহ নিয়ে প্ৰলয়-নাচন নাচতে শুরু করেন। তখন বিষ্ণু সুদর্শনচক্র দ্বারা সতীর দেহ খণ্ড-খণ্ড করে কেটে ফেলেন। যে-সব জায়গায় সতীর দেহখণ্ড পড়ে, সে-সব জায়গাই পরে পীঠস্থান হয়ে দাঁড়ায়। সতী পরে জন্মান্তরে হিমালয়-কন্যা পাৰ্বতী হয়ে জন্মগ্রহণ করে ও কঠোর তপস্যা দ্বারা শিবকে পতিরূপে পায়।

শিব অত্যন্ত সংযমী দেবতা। ব্ৰহ্মার আদেশে বিশ্বকর্ম যখন তিলোত্তমাকে সৃষ্টি করেছিল, ব্ৰহ্মা তখন তার চার মুণ্ড ও ইন্দ্ৰ তার সহস্ৰ নয়ন দিয়ে তাকে দেখেছিলেন। দেবতাদের মধ্যে শিবই তখন স্থির হয়ে বসেছিলেন। সেজন্য শিবের নাম স্থাণু।

শিব সংযমী দেবতা বলে, সব সময়েই কঠোর তপস্যায় রত থাকতেন। অন্দরমহলে শিবানীর সঙ্গে তাঁর মিলন বড় একটা হ’ত না। এই মিলন ঘটাবার জন্য দেবতারা কামদেবকে নিযুক্ত করেছিল। এই মিলনের ফলে দেবসেনাপতি কাৰ্তিকেয়ার জন্ম হয়। এছাড়াও শিব ও শিবানীর আরও ছেলেপুলে হয়েছিল; যথা, পুত্র গণেশ ও দুই কন্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতী। কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ অনুযায়ী শিব ও শিবানীর রমণক্রিয়া দেখবার জন্য অগ্নিদেবের একবার কৌতূহল হয়েছিল। সেজন্য অগ্নি পারাবতাকারে সেই রমণক্রিয়া দেখতে এসেছিল। শিবানী অগ্নিদেবকে দেখে রমণক্রিয়া হতে নিবৃত্ত হন। শিব তখন ক্রোধবশত তাঁর বীর্য অগ্নিদেবের প্রতি নিক্ষেপ করেন। অগ্নিদেব সে-বীর্ষের তেজ সহ্য করতে না পেরে তা গঙ্গায় বিসর্জন দেয়। আর একবার শিবানীকে দেখে ফেলবার জন্য কুবেরের এক চক্ষু বিনষ্ট হয়েছিল।

মহাযোগী হলেও শিব খুব আমুদে দেবতা ছিলেন। সঙ্গীত ছিল তার প্রিয় বিনোদনের উপায়। সঙ্গীতজ্ঞ হিসাবে শিবের খুবই সুনাম ছিল। সঙ্গীতবিদ্যায় শিব নারদকেও পরাহত করেছিলেন। শিবের সঙ্গীতের শ্ৰোতা ছিলেন ব্ৰহ্মা ও বিষ্ণু। একবার নারদের গর্ব খর্ব করবার জন্য রাগরাগিণীগণ পথে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে থাকে। নারদ কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, নারদের সুরাহীন গানের জন্যই তাদের এই দুর্দশা; শিব সুললিত কণ্ঠে গান করলে তারা আবার পূর্বরূপ ফিরে পেতে পারে। নারদ তখন শিবকে বহুভাবে তুষ্ট করে, শিবকে গান করতে রাজি করান, কিন্তু শিব বলেন যে, উপযুক্ত শ্রোতা না পেলে তিনি গান করবেন না। তখন ব্ৰহ্মা ও বিষ্ণু শ্রোতা হন।

নৃত্যেও শিবের প্রসিদ্ধি সর্বজনবিদিত। নৃত্যকুশলী বলেই শিবের নাম নটরাজ।

অন্দরমহলে শিবানী শিবের সঙ্গে কৌতুক-পরিহাস করতে ছাড়তেন না। শিবানী একবার পরিহাসচ্ছলে শিবের দুই নেত্রী হস্তদ্বারা আবৃত করেন। তখন সমস্ত পৃথিবী তমাচ্ছন্ন ও আলোকবিহীন হয়। তাতে পৃথিবীর সব মানুষ বিনষ্ট হবার উপক্রম হয়। পৃথিবীর লোকদের রক্ষা করবার জন্য শিব তখন ললাটে তৃতীয় নেত্ৰ উদ্ভব করেন।

স্বামী ও পুত্রদের খাওয়াতে শিবানীকে বেশ বেগ পেতে হ’ত। এর এক মনোরম চিত্র মধ্যযুগের কবি রামেশ্বর তার ‘শিবায়ন কাব্যে দিয়েছেন। রামেশ্বরের বর্ণনা : ‘তিন ব্যক্তি ভোক্ত এক অন্ন দেন সতী। / দুটি সুতে সপ্তমুখ, পঞ্চমুখ পতি ॥ / তিন জনে বার মুখে পাঁচ হাতে খায়। / এই দিতে এল নাঞি হাঁড়ি পানে চায়৷। / সুক্ত খায়্যা ভোক্তা যদি হস্ত দিল শাকে। / অন্নপূর্ণ অন্ন আনি রুদ্রমূর্তি ডাকে।। / কাৰ্তিক গণেশ বলে অন্ন আন মা। / হৈমবর্তী বলে বাছা ধৈৰ্য হইয়া খা।। / উল্বন চর্বণে ফির‍্যা ফুরাইল ব্যঞ্জন। এককালে শূন্য থালে ডাকে তিনজন॥ / চটপট পিষিত মিশ্রিত কর্য যুষে। / বাউবেগে বিধুমুখী ব্যস্ত হয়্যা আসে।। / চঞ্চল চরণেতে নূপুর বাজে আর। / রিনি রিনি কিঙ্কিণী কঙ্কণ ঝনকার। ৷’

***

দেবালোকের চিত্তবিনোদনের জন্য ছিল অপ্সরা ও গন্ধর্বগণ। এরা তাদের নৃত্য, গীত ও অভিনয় দ্বারা সর্বদা মুখরিত করে রাখত ইন্দ্রের দেবসভা। অপ্সরারা ছিল দেবলোকের বারযোষিৎ। রূপলাবণ্য, সৌন্দর্য ও নৃত্যগীতে পারদর্শিতার জন্য অপ্সরাদের ছিল বিশেষ প্ৰসিদ্ধি। অপসারদের মধ্যে উর্বশী ছিল অনন্যাসুন্দরী। বেদে আছে যে, উর্বশীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মিত্র ও বরুণের রেতঃপাত হয়েছিল। উর্বশী সম্বন্ধে একাধিক কাহিনী প্ৰাচীন গ্ৰন্থসমূহে আছে। তার মধ্যে একটা কাহিনী হচ্ছে রাজা পুরুরবার সঙ্গে উর্বশীর মিলন। অপর এক কাহিনী হচ্ছে অৰ্জ্জুন যখন দিব্যাস্ত্ৰ সংগ্রহের জন্য দেবলোকে গিয়েছিল, উর্বশী তখন অনঙ্গের বশবর্তী হয়ে অৰ্জ্জুনের সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিল। উর্বশী ছাড়াও দেবলোকে অপূর্ব লাবণ্যময়ী ও সুন্দরী আরও অপ্সরা ছিল; যথা— মেনকা, রম্ভ, তিলোত্তমা, ঘৃতাচী, সুকেশী, মধুঘোষা, অলম্বুষা, বিদ্যুৎপর্ণা, সুবাহু, সুপ্রিয়া, সরসা, পঞ্জিকাস্থলা ও বিশ্বাচী।

অপ্সরাদের যৌনসম্পর্ক ছিল গন্ধৰ্বদের সঙ্গে। সঙ্গীতবিদ্যায় তারা বিশেষ পারদর্শী ছিল। দেবলোকে তারা অপ্সরাদের সঙ্গে গায়ক হিসাবে যোগদান করত। অপসারদের সঙ্গে তারা অবাধে মেলামেশা করত। সেজন্য নারী ও পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশার ফলে যে বিবাহ হয়, তাকে গান্ধৰ্ব-বিবাহ বলা হয়। অন্সর ও গন্ধৰ্বদের সমৃদ্ধিশালী পুরী ও প্ৰাসাদ ছিল। সেখানেই অবস্থিত ছিল তাদের অন্দরমহল। মর্ত্যের সরোবরেও তারা মাঝে মাঝে দেবকীন্তাদের সঙ্গে প্ৰমোদ করতে আসত। (দেবলোকে প্রমীলাদের পুরুষভজনা সম্বন্ধে বিশদ বিবরণের জন্য লেখকের ‘দেবলোকের যৌনজীবন’ গ্ৰন্থ দ্রষ্টব্য।)

Print Friendly, PDF & Email
%d bloggers like this: