সমসাময়িক লেখকদের নিয়ে খোলাখুলি লিখতে একটু সংকোচ হবেই। এমনকি সাহিত্যের যাঁরা অভিভাবক সেই সব সমালোচকরা মৃত লেখকদের রচনা নিয়ে কাজ করতে বেশি পছন্দ করেন। কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমেও এই ব্যবস্থা চলছে। তবে ইদানীং, কেউ কেউ জায়গা পাচ্ছেন, খুবই শীর্ণ পরিসরে। বাঙালির চরিত্র অনুযায়ী ব্যাপারটা খুব বেমানান নয়।

ছাত্রাবস্থায় অচিন্ত্যকুমারের কল্লোলযুগ পড়েছিলাম। বোধহয় সেই প্রথম আমি ওঁর ভক্ত হয়েছিলাম। অনেক পরে তিনি ম্লান হেসে আমাকে বলেছিলেন, প্রচুর শত্রু তৈরি করেছি ঐ বই লিখে। মুশকিল এখানেই। সমসাময়িকেরা সবসময় খোলা কথা ভালো মনে নিতে পারেন না। সত্তর দশকের অনুজ লেখকদের নিয়ে শ্রদ্ধেয় বিমল কর চমৎকার একটা লেখা লিখেছিলেন। কিন্তু লেখক যে স্নেহপ্রবণ তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি।

কিন্তু লেখকের লেখা নয়, শুধুই লেখককে নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে মাঝেমাঝেই হয়। যে সমস্ত লেখকের সংস্পর্শে এসেছি এবং তাদের যে রকম ভাবে দেখেছি তা নিয়ে লিখতে হাজার সমস্যা। ব্যাপারটা অনেকটাই অন্ধের হস্তিদর্শন হয়ে যেতে পারে। সমরেশ বসু বা সন্তোষ কুমার ঘোষকে আমার চেয়ে ঘনিষ্ঠ ভাবে চিনতেন এমন মানুষের অভাব নেই। তাদের চেনার সঙ্গে যে আমার চেনা মিলবেই এমন দাবি করা বোকামি। তাছাড়া এখন মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে নানান খোপ রয়েছে। অফিসে একরকম, জুয়োর টেবিলে আর এক রকম, ক্লাবে অন্য রকম, আবার রাতে বাড়িতে ফিরে একেবারেই আলাদা। এর সঙ্গে ওর। কোনও মিল নেই এমন মানুষ আমি অনেক দেখেছি। হয়তো আমি নিজেই তাই।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে আমি প্ৰথম চিনি মাস্টারমশাই হিসেবে। উনি এক সময় জলপাইগুড়িতে পড়াতে গিয়েছিলেন। তখন আমি স্কুলের ছাত্র। কিন্তু গল্পের বই পড়ি। শেষ দিকে, ওঁর লেখার ভক্ত হলাম। গোগ্রাসে ওর সব লেখা পড়লাম। ঘনিষ্ঠ হলাম কলকাতায় পড়তে এসে। ওঁকে মাস্টারমশাই হিসেবে পেয়ে।

মানুষটির চেহারায় একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। ওঁর কাছে আমরা পৃথিবীর অন্য ভাষায় লেখা ছোটগল্পগুলোর খবর জেনেছিলাম। ততদিনে বুঝে গিয়েছি চমক দিয়ে ছোটগল্প শেষ করার কায়দাটা আর উঁচু মানের সাহিত্য নয়! ও হেনরি থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যা করেছেন তা পরবর্তী লেখকদের করা ঠিক নয়। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। মাস্টারমশাই একদিন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়াচ্ছিলেন। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে পিনাকেশ সামনের সারিতে বসত, বাকিরা পেছনের দরজার গায়ে, যাতে ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে যাওয়া যায়। আমার পাশে বসে সীতানাথ জিজ্ঞাসা করেছিল, কাকে আমি প্ৰেমিকা হিসেবে চাই? অচলা না লাবণ্য। আমি সোৎসাহে দুজনকেই খারিজ করে যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল নিচু স্বরে। মাস্টারমশাই যে সেটা লক্ষ্য করে পড়ানো বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন তা টের পাইনি। শেষপর্যন্ত তিনি গলা তুলে বললেন, সমরেশবাবু, অনুগ্রহ করে কি একটু উঠে দাঁড়াবেন?

উঠলাম। সতীর্থরা খুব মজা পাচ্ছিল আমার দুরবস্থা দেখে।

মাস্টারমশাই বললেন, আমরা এখানে ছোটগল্প নিয়ে একটু কথাবার্তা বলছিলাম। বিষয়টা নিশ্চয়ই আপনার জানা তাই কৰ্ণপাত করেননি। তাই এবার আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই। আপনার প্রিয় কোনও একটি ছোটগল্পের নাম বলুন।

দ্রুত জবাব দিয়েছিলাম, টোপ।

মাস্টারমশাই এরকম উত্তর অবশ্যই আশা করেননি। ওঁর মুখ দেখে তা বোঝাও যাচ্ছিল। বললেন, বসুন।

কিন্তু ক্লাসের সমস্ত ছাত্রছাত্রী মাস্টারমশাইকে রেহাই দিল না। তারা টোপ নিয়ে আলোচনা করতে চাইল। মাস্টারমশাই কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবলেন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চশমা খুলে কাঁচ মুছতে মুছতে বললেন, টোপ গল্পটি পড়তে বোধহয় মন্দ লাগে না। কিন্তু গল্পটি শেষ করার পর বুঝতে অসুবিধে হয় না এটা পরিকল্পিত রচনা। শেষ চমকের জন্যে অঙ্ক কষে লেখা হয়েছে। এটা বুঝতে পারা যায় বলেই–। তিনি হাসলেন, আচ্ছা, আমরা যেখানে থেমেছিলাম–!

আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কয়েকটি ছোটগল্পের একটি বলে অনেকে টোপকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু মাস্টারমশাই নিজের রচনা সম্পর্কে নির্মোহ হবেন এটা ভাবতে পারিনি। এটি আয়ত্ত করা যে কী কঠিনকর্ম তা পরে বুঝেছি।

মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম লিখতে গিয়ে মনে হল ওঁর অজস্র ছাত্রছাত্রী এই কথা বলতে পারেন। ওঁর বৈঠকখানার বাড়িতে কতবার গিয়েছি। সেসময় তিনি লিখতেন প্রচুর। পুজোর সময় কোনও কাগজ বাদ যেত না। প্রতিবাদ করলে বলতেন, কাকে না বলব? এই কাউকে না বলার অক্ষমতা তাকে দুর্বল করেছে। এক বর্ষার দুপুরে আমায় বলেছিলেন, দ্যাখো আমার পুঁজি অল্প। ভঙ্গি দিয়ে চোখ ভোলাই। তাই আমার গল্পের কুষ্ঠরোগী সিনেমার পোষ্টারের নায়িকার গালে ঠোঁট রাখে। তুমি তারাশঙ্করের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, ওঁকে এ সব লিখতে হয়নি।

দেশ-এ সুনন্দর জার্নাল বেরুচ্ছিল। প্রচন্ড জনপ্রিয় রচনা। প্রকাশনায় নামব বলে তার দ্বারস্থ হতেই তিনি এক কথায় সেটি ছাপতে দিলেন। এখন বুঝেছি কি উদ্ধত আকাঙ্খা ছিল আমার। কলকাতার তাবৎ বিখ্যাত প্ৰকাশক যে বই ছাপতে উদ্যোগী, যাদের কাছে অর্থ ও নিরাপত্তা রয়েছে, তাদের বঞ্চিত করে আমার মতো নবীন বিত্তহীনকে ওই বই দিয়েছিলেন তিনি। এটা প্ৰায় গলায় কলসী বেঁধে জলে ভাসিয়ে দেওয়া। কিন্তু মাস্টারমশাই বলেছিলেন, ছাপো।

আমার প্রকাশনার আয়ু ছিল এক বছর। কিন্তু সেই কারণে মাষ্টারমশাইকে আপসোস করতে শুনিনি। উলটে বলেছিলেন, ব্যবসা করা সবার ধাতে নেই। সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, মাস্টারমশাই নারায়ণবাবুর বাইরে আর একজন নারায়ণবাবু আমাকে আকর্ষণ করতেন, তিনি এক রোমান্টিক পুরুষ। ওঁর চেহারা চালচলনের মধ্যে তার প্রকাশ স্পষ্ট ছিল। ওঁর প্রথম স্ত্রীকে আমি দেখিনি, আশাদি ছিলেন দ্বিতীয়া স্ত্রী। লিখতেন। জলপাইগুড়ির মেয়ে বলে আমি ওঁর কাছের লোক হয়েছিলাম। ছোটখাটো মানুষটিকে দেখে আমার কেবলই মনে হত মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে ঠিক মিলছে না। প্রতিভাবান মানুষেরা তৃপ্তি সহজে পান না। এ ব্যাপারটা তো সমরেশ বসুর মধ্যেও দেখেছি।

আমাদের এক সহপাঠিনী, যিনি বয়সে বেশ বড় ছিলেন, মাস্টারমশাই-এর প্রতি নিমগ্ন বলে প্রচারিত ছিল। মাস্টারমশাই যদি অমিত রায় হন তা হলে তিনি লাবণ্যের ধারে কাছে ছিলেন না। বরং অত্যন্ত শান্ত, চুপচাপ। মাস্টারমশাই-এর সব রচনা তাঁর মনস্থ, তিনি যখন পড়াতেন তখন ভদ্রমহিলা যেভাবে তাকতেন তাতে মনে হত অৰ্জ্জুনের মতো মাছের চোখ দেখছেন। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ি তখন একদিন সাহস করে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম এই ব্যাপারে। তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, কি জানি!

মাস্টারমশাই-এর মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলাম রাতে। ভোরবেলায় ছুটেছিলাম পি জি হাসপাতালে। তার ছাত্ররা তো বটেই, যাঁরা সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের কেউ বাদ যাননি। সেই ভোরে হাসপাতাল চত্বরে পৌঁছতে। যুবক ছাত্র হিসেবে যখন আমরা শেষ যাত্রার আয়োজন করছি তখন যে ঘটনা ঘটেছিল তা পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত হয়তো কখনও কখনও ঘটবে। মাস্টারমশাই-এর পায়ের কাছে পাথরের মতো বসেছিলেন আমাদের সেই সহপাঠিনী। জন্ডিসে নীরক্ত শরীর নিয়েও রাজার মতো শুয়েছিলেন মাস্টারমশাই। আর তখনই আশাদি এলেন। এসে তীব্র চিৎকার করে ভদ্রমহিলাকে ধিক্কার দিয়ে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন। তৎপর হয়ে এই আদেশ পালন করল কেউ কেউ। শেকড়সুদ্ধ গাছকে টেনে তুলতে দেখা খুব বেদনাদায়ক। পরে যখন মাস্টারমশাইকে লরিতে চাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলাম তখন ছাত্ররা স্লোগান দিচ্ছিল, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যুগ যুগ জিও। কিন্তু আমি ভাবছিলাম আত্মা বলে যদি কিছু থাকে তা হলে মাস্টারমশাই-এর আত্মা ওই মুহূৰ্ত্তে কতটা ভাল থাকতে পারেন?

টেনিদা থেকে শুরু করে সুনন্দ, যে কোনও জীবিত লেখকের থেকে বেশী জীবিত ছিলেন মাস্টারমশাই। আমরা কেউ ভাবতে পারিনি তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি পাঠক তাকে ভুলে যাবে। একমাত্র টেনিদা তাকে বেশ কিছুদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এই প্রজন্মের কিশোরদের কাছে টেনিদা তেমন কোনও আকর্ষণ নন। অনেক লেখক বেঁচে থাকার সময় টিমটিম করে বেঁচে থাকেন। মারা যাওয়ার পর তাদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ বুঝি। কিন্তু যিনি লিখে বেঁচেছিলেন প্রবলভাবে, মৃত্যুর পর তারও একই অবস্থা হবে এটা ভাবিনি। কিন্তু সত্য সবসময় নির্মম।

 

এখন আমরা যারা লেখালেখি করি তারা প্ৰায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছি। হঠাৎ দেখা হলে হাসি, দুচারটে কথা বলি, ওই পর্যন্ত। অন্যের লেখা পড়া দূরের কথা অনেকেই মনে হয় নিজের ছাপা হওয়া লেখা পড়েন না। অথচ কল্লোল, কালিকলম থেকে কৃত্তিবাস পর্যন্ত এরকম ছিল না। পারস্পরিক মত বিনিময়, আলোচনা এবং আড্ডা সেসময়ের লেখকদের কাছাকাছি এনে দিত। ব্যতিক্রম হয়তো ছিল। তারাশঙ্করকে বিমল মিত্ৰ সহ্য করতে পারতেন না। মনে আছে গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশনের হলে একটি অনুষ্ঠানে বিমল মিত্রের পাশের চেয়ারে বসার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখন তিনি জরায় আক্রান্ত। বললেন, তোমার লেখা পড়েছি। মানুষ গল্প পড়তে চায়, ওটা লিখতে পারলে থাকবে নইলে নয়, আচ্ছা, বলতো, তারাশঙ্কর কেমন লেখক?

হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম ছয়জন লেখক যদি বঙ্কিমচন্দ্ৰ, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ এবং সমরেশ বসু, হন তা হলে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনও মানে হয় না। বললেন, লজ্জা পাচ্ছ কেন? তা হলে বলি শোন। দেশ পত্রিকায় ওঁর লেখা বেরুচ্ছিল। সাগরবাবু আমার সাহেব বিবি গোলাম ছাপলেন। পাঠকরা বলল ওঁর লেখা বন্ধ করতে আর আমার লেখা চালিয়ে যেতে।

অনুষ্ঠান চলছিল। সেদিকটা উপেক্ষা করে বলে চললেন, একদিন এক প্রকাশকের গাড়িতে বাড়ি ফিরছি। তা তিনি বললেন, একবার তারাশঙ্করবাবুর বাড়ি ঘুরে যাব। আজ ওর জন্মদিন। গিয়ে দেখলাম ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। লোকজন ঢুকছে। কোনও লেখক পকেটের পয়সা খরচ করে নিজের জন্মদিন পালন করে বলে আমি ভাবতে পারি না। গাড়ি থেকে নামছি না দেখে তারাশঙ্কর এল। বললাম নামব না, লেখা আছে। সে বলল, জমিদারদের গল্প লিখতে তো ভাবতে হয় না, এত তাড়া কিসের! রাগ হল। বাড়ি এসে কলম ধরলাম। লিখলাম, কড়ি দিয়ে কিনলাম। আধুনিক জীবন কাকে বলে তা ওর মুখের ওপর ছুঁড়ে দিলাম। বুঝলে?

একজন বয়স্ক মানুষ যখন ছেলেমানুষের মতো অভিমান করেন তখন আমাদের মজা লাগে। তারাশঙ্কর থাকতেন টালা পার্কে, বিমল মিত্র চেতলায়। হঠাৎ সরকারী বাসের নতুন রুট চালু হল, তেত্ৰিশ নম্বর। বাসটি টালা পার্ক আর চেতলার মধ্যে যাতায়াত করবে। আমি অনুমান করি সুযোগসন্ধানীরা এই বাসটিকে কাজে লাগিয়েছিলেন।

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন একটি লিটিল ম্যাগাজিন করার বাসনা হয়েছিল। আমরা ঠিক করলাম সমরেশ বসুর কাছে লেখা চাইব। প্রতিষ্ঠিত লেখকরা লিটল ম্যাগাজিনে লেখেন না। লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেমেয়েরা অহংকারী হয়ে তাদের লেখা ছাপতেও চায় না। আমাদের মনে হয়েছিল সমরেশ বসুর মতো লড়াই করে উঠে আসা মানুষ নিশ্চয়ই ওইসব লেখকদের দলে পড়েন না।

তখন বিংশ শতাব্দী এবং কথামালা নামে কাগজ বের হত গ্রে স্ট্রীট থেকে। সেই বাড়িতে সমরেশ বসু দুপুরে লেখেন বলে খবর পাওয়া গেল। এক দুপুরে আমরা সেখানে হানা দিলাম। দপ্তর থেকে বলেছিল, উনি দোতলায়, লিখছেন। যখন অনুমতি পাওয়া গেল তখন সেই ঘরে পৌঁছানো মাত্র ওঁর হাসিতে আক্রান্ত হলাম, কি ব্যাপার? বিছানায় আধশোয়া সমরেশ বসুর সঙ্গে উত্তমকুমারের কোনও পার্থক্য খুঁজে পাইনি।

আমরা আমাদের বক্তব্য জানালাম। কোনও দক্ষিণা দেওয়া সম্ভব নয়।

উনি হাসলেন, দ্যাখো, এখন আমার খুব টাকার দরকার। প্রতিটি শব্দ লিখছি টাকার জন্যে। লেখা কেন, আমাকে ব্যবহার করে কেউ যদি টাকা দেয়। তাতেও আমি রাজি। তোমরা নিশ্চয়ই সমস্যাটা বুঝতে পারছ।

রণেন্দু উষ্ণ গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি টাকার জন্য লেখেন?

একজন কৃষক যদি টাকার জন্যে চাষ করতে পারে। আমি কেন টাকার জন্য লিখব না? হেসে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি।

আমরা নেমে এসেছিলাম। গ্রে স্ট্রিটের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রণেন্দু চেঁচিয়ে বলেছিল, আমি ভাবতে পারছি না এই মানুষ বি টি রোডের ধারে লিখেছিল?

পরে বুঝেছি, সমরেশদা যা বলতে পেরেছিলেন তা অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও বলতে পারেন না। মুখোশ পরে পরে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেন তাঁরা। এত স্পষ্ট কথা বলতে হিম্মতের দরকার হয়।

সমরেশদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বরেণ গঙ্গোপাধ্যায়। আমার নাম শুনে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, আমার আসল নাম কিন্তু সুরথ। তোমার নিশ্চয়ই সে রকম কোনও নাম নেই!

যে মানুষ একসময় কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন, যাঁর জীবন শুরু হয়েছিল চটকলের নীচের দিকের কর্মী হিসাবেম বয়সে বড় মহিলাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন যিনি বালক বয়সে, তাঁর জীবন কোথায় গিয়ে শেষ হত সেটা চটকল অঞ্চলে গেলে বোঝা যায়। সেই স্বাভাবিক শেষ হওয়াটাকে লাথি মেরে উলটে দিয়ে তিনি ক্রমশ সেই জায়গায় পৌঁছলেন যে জায়গাটা বঙ্কিম, শরৎ, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর এবং বিভূতিভূষণের পর খালি ছিল। আর এই উত্তরণের পথটা ছিল ঠিক তার নিজের মতো। বাঙালিয়ানার নামগন্ধ তাতে ছিল না। পাতি মধ্যবিত্ত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা একটি মানুষ যখন সমরেশ বসু হন তখন আপসোস হয় এই ভেবে যে ইউরোপের কোনও দেশে জন্মালেন না কেন!

সমরেশদা কমিউনিজমে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। জেলেও গিয়েছেন। কিন্তু দলীয় নেতাদের আচরণ তাঁর মোহভঙ্গ করতে সাহায্য করেছিল। ভাগ্যিস করেছিল। ননী ভৌমিকের কথা মনে পড়ছে। কী সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করে শেষপর্যন্ত মস্কোতে বসে অনুবাদ করে গেলেন। কিন্তু সমরেশ বসু কমিউনিস্ট পাটির সঙ্গ ত্যাগ করলেও মার্কসবাদে আস্থা হারাননি। প্রায়ই তার লেখায় এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। যতই বলুন টাকার জন্য লিখি কিন্তু কখনও সখনও অভিমানী হলেও পরিচয় পত্রিকায় লিখে গেছেন।

সমরেশ বসুর সব লেখা যখন আমি পড়ে ফেলেছি তখন ওঁর সঙ্গে পরিচয় হল। আমি লক্ষ করেছি ওঁর প্রতিটি লেখার বিষয় আলাদা, ভঙ্গী এবং ভাষা বিষয় অনুযায়ী বদলে যাচ্ছে। বয়স বিচারে আমাদের মধ্যে প্রচুর তফাৎ। কিন্তু ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর সেটা একদম বুঝতে দেননি। আমি এখনও মনে করি সমরেশদকে কেউ সম্পূর্ণ দেখে ওঠেননি। ওঁর একটা দিকের সঙ্গে আর একটা দিকের কোনও মিল নেই।

ধরা যাক, নৈহাটিতে গিয়েছি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে সমরেশদা বললেন, চল চা খাই। একটি অতি সাধারণ রেস্টটুরেন্টে বসলাম আমরা। দোকানের সবাই ওঁর চেনা। দু-পা দূরে যার বাড়ি তিনি কেন দোকানে চা খাওয়াবেন? প্রশ্নটা করতেই নিষ্পাপ মুখে তিনি বললেন, সে আসবে। সমরেশদার বয়স তখন পঞ্চাশের মুখে। সে কে? না কলেজে পড়ে। নৈহাটির পরের স্টেশনে থাকে। কলকাতা থেকে ফেরার পথে এখানে সমরেশদার সঙ্গে দেখা করে যাবে। শুনে আমি রোমাঞ্চিত। কিন্তু সে এল না। এল তার ভাই। বাচ্চা ছেলেটি একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। মুহুর্তে সমরেশদা যেন সতের বছর বয়সে চলে গেলেন। সেই বয়সের মুখ করে নিঃশ্বাস ফেললেন, চল।

এলো না?

না। জ্বর হয়েছে। কখন যে ঠান্ডা লাগাল!

তারপর বাড়িতে গিয়ে বড়বউদি, ছেলের বউ, বাচ্চার সঙ্গে হইচই করে মদ্যপান করতে বসলেন। যেন এক মুহূৰ্ত্তেই দুটি পর্ব পেরিয়ে অনেক দূরে চলে গেলেন।

ওই মেয়েটি, যার আসার কথা ছিল সে হয়তো আর কখনও আসেনি। কিন্তু সমরেশদার গল্পে সে এসেছিল। এই যে জীবন ছেকে দেখা, অমৃত পেতে বিষ গলায় নেওয়া, বারংবার সমরেশদা একই প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছেন। পৃথিবীর কোনও কিছুই তাকে তৃপ্ত করতে পারেনি।

একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবন তার লেখায় প্রকাশ পাবে, অন্তত আবছাভাবেও, এটা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু জীবনটাকে যে গিলে হজম করে ফেলে তার ক্ষেত্রে সম্ভবত এই মন্তব্যটা প্রয়োগ করা যায় না। সমরেশদার জীবন শুরু হয়েছিল অনেক নিচুতলা থেকে। সেখানকার মানুষদের তিনি দেখেছেন। চটকলের কর্মী সমরেশ বসু জীবন দেখতে দেখতে অনেক ওপরের স্তরে চলে গিয়েছিলেন। একসময় নিয়মিত ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করতেন। তারপর কলকাতায় বাসা নিলেন। শেষপর্যন্ত অভিজাত অঞ্চলে ফ্ল্যাট। এই যে উত্তরণ, টাকা এসেছে এবং নিজেকে পালটেছেন কিন্তু কখনওই নিজের স্থায়ী বিন্দু থেকে সরে যাননি।

পঁচিশ ছাব্বিশ বছর আগে দাৰ্জিলিং-এ ওঁর সঙ্গে দেখা। পরণে সুট, মাথায় টুপি। পুরোদস্তুর সাহেব। উত্তমকুমারের মতো ওঁর হাসি আকর্ষণীয় ছিল। বললেন বিকেলে তৈরি থাকতে, আমায় নিয়ে এক সাহিত্যসভায় যাবেন। বিকেলে সেখানে যাওয়ার পথে বললেন, বেশী ভেতরের দিকে বসো না। দরজার কাছাকাছি থেকে রাস্তার দিকে নজর রেখো। সাহিত্যসভায় অনেক গুণমুগ্ধ পাঠক পাঠিকা ছিলেন। তাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন সমরেশদা। আমাকে তখন কেউ চেনে না। আর আমি ভাবছিলাম সমরেশদা কেন ওই কথাগুলো বলে গেলেন। একজন অধ্যাপিকা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি গঙ্গার মতো উপন্যাস লিখেছেন, আর একটা গঙ্গা লিখছেন না কেন?

সমরেশদা গৃহকর্তাকে নিচু গলায় কিছু বলতেই তিনি সসম্ভ্রমে তাঁকে পাশের দরজায় নিয়ে গেলেন। সবাই বুঝল তিনি টয়লেটে গেছেন এবং ফিরে এসে জবাব দেবেন। হঠাৎ আমি লক্ষ করলাম বাড়ির সামনের পাহাড়ী রাস্তাটা যেদিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে সমরেশদা দাঁড়িয়ে আমাকে হাত নেড়ে চলে আসতে বলে হাঁটা শুরু করলেন। একঘর অপেক্ষায় থাকা মানুষদের এড়িয়ে আমি ছুটিলাম। বেলভিউ হোটেলের কাছে ওঁকে ধরতে পারলাম। চলে এলেন কেন? সমরেশদা মুখ বিকৃত করে বললেন, কেন গঙ্গা লিখি না! যেন আমার দায় সারা জীবন একটার পর একটা গঙ্গা লিখে যাওয়ার। সেই গঙ্গা নেই, তার মাঝিরাও নেই। তবু আমাকে গঙ্গা লিখতে হবে? এ রকম নির্বোধ কথা শোনার চেয়ে চলে আসা ভাল। তাড়াতাড়ি পা চালাও।

আমরা ততক্ষণে জলাপাহাড়ের দিকে যাচ্ছিলাম। রাত নেমে গেছে। জিজ্ঞাসা করতেই সমরেশদা সেই হাসিটি হাসলেন, আর বোলো না। খুব দেরী হয়ে গেছে। মেমসাহেব এতক্ষণে ক্ষেপে লাল হয়ে গেছেন।

মেমসাহেব সুদর্শনা, দীর্ঘঙ্গিনী, প্যান্ট জ্যাকেট পরণে, বিদেশী পারফিউম তাঁর চারপাশে বলয় তৈরি করেছে। অনুযোগের পর ট্রলিতে এক জার সাদা রাম আনালেন। এই বস্তুর জন্ম নাকি জামাইকায়। জারের নীচে কল রয়েছে যেখানে ঈষৎ চাপ দিলেই গ্লাস ভরে যায়। কিছুক্ষণ থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম একা। মধ্যরাতে আমাদের হোটেলে সমরেশদা এসে হাজির। তখন দার্জিলিং কুয়াশায় মোড়া। প্রচন্ড ঠান্ডা। বিছানা থেকে উঠে। আপাদমস্তক মুড়ে আমরা বাইরে আসতেই সমরেশদা অভিযোগ করলেন, কেউ একজন তার পেছনে পেছনে আসছে। ওই ঠান্ডায় কোনও প্রাণীকে দেখতে পেলাম না। উনি উঠেছিলেন, নীচের হোটেল স্যানোটেগরিয়ামে। অনেকটা নীচে। ওঁকে ধরে ধরে নামাতে হচ্ছিল। হঠাৎ সেই শীতার্ত রাত্রে উনি দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর জড়ানো স্বরে বললেন, কিছুই পারলাম না। তারাশঙ্করের মতো একটা লাইনও লিখতে পারলাম না। কিছুই হল না। জীবনটা এত ছোট!

তারাশঙ্করের লেখা কবির ওই গান সমরেশদার খুব প্রিয় ছিল। হোটেলের দরজা খুলিয়ে তাকে বিছানায় পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম রাত দুটোয়। আর ঘুম আসেনি। সূর্যোদয় দেখব বলে জেগেছিলাম। আমাদের ঘরের ব্যালকনি থেকে নীচের হোটেল দেখা যায়। ভোর সাড়ে পাঁচটায় আবিষ্কার করা গেল ওই হোটেলের একটি ঘরে আলো জ্বলছে, একজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে নড়াচড়া করতে। ঘরটি সমরেশদার অনুমান করে হাজির হয়েছিলাম তখনই। আবার দরজা খুলে দিয়েছিল বিরক্ত দরোয়ান। সমরেশদার ঘরের দরজায় শব্দ করতে তিনিই সেটা খুললেন। দেখলাম ওই ভোরে তার স্নান সারা। পরনে পাজামা পাঞ্জাবী শাল, হাতে কলম। লিখতে বসেছেন। আমাদের দেখে খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি কান্ড? তোমরা? মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলে নাকি?

এর অনেক অনেক বছর পরে ড়ুয়ার্সের মধু চা বাগানে ডিসেম্বরের রাত্রে আমরা জড়ো হয়েছিলাম। সমরেশদা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, বিমল দেব আর আমি। সেই রাত ছিল সমারশেদার জন্মদিন। হঠাৎই সেটা খেয়াল হতে আমরা ওকে ধরলাম গান শোনাতে। উনি গেয়েছিলেন সেই একই খেদ নিয়ে, জীবন এত ছোট কেনে?

লেখালেখিতে নিজেকে ভেঙেছেন যিনি নির্মমভাবে, জীবনটাকেও তাই করতে চেয়েছিলেন। এই করতে গিয়ে এদেশে যে বদনাম কুড়োতে হয় তা নিয়ে মাথা ঘামাননি। প্লেনে উড়ে গেলে তো কিছুই দেখা হল না, পছন্দের স্টেশনে থেমে থেমে যাওয়ার স্বাধীনতা একমাত্র ট্রেনেই মেলে। ওঁর জীবনে যারা এসেছেন, তারা ওর প্রয়োজনেই এসেছিলেন বলে আমার ধারণা। একেবারে শেষদিকে যাঁর প্রতি তাঁর অনুরাগ এল তিনি বয়সে অনেক ছোট। তবু ওঁর তাঁকে নিজের ভাবতে অসুবিধা হয়নি। যখন ধাক্কা খেলেন তখন যন্ত্রণা পেয়েছেন।

হয়তো এসবের মধ্যে অনেকে বাড়াবাড়ি দেখতে পেয়েছেন। দেশ পত্রিকায় তার অসমাপ্ত শেষ লেখা সমস্ত সমালোচনা থামিয়ে দিয়েছিল। সত্যিকারের প্রতিভাবান মানুষকে যাঁরা চাল ডাল নুন দিয়ে মাপতে চান তাদের মুখ ছাড়া আর কী বলা যায়? কিন্তু এ কথা মানতেই হবে সমরেশদা তার অনুজ লেখকদের সম্মান যেমন পেয়েছেন তেমনই অগ্রজদেরও। বুদ্ধদেব বসু বা সন্তোষকুমার ঘোষের ভূমিকার কথা ভোলা যাবে না। অথচ এই সন্তোষকুমারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনও কারণে নষ্ট হয়েছিল। সে সময় তিনি একটি পত্রিকার সম্পাদক। সন্তোষকুমারের একটি লেখা দপ্তরের কর্মীর অসাবধানতায় হারিয়ে গিয়েছিল। ওঁর নাম শুনলেই সন্তোষকুমার গালাগাল দেন। মুখ দেখতেও চান না। অথচ আমি বুঝি, মানুষটার জন্যে সন্তোষকুমারের মনে অসীম মমতা আছে। সেই কোনকালে অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্যে কিঞ্চিৎ অপ্রকৃতস্থ সমরেশদকে মধ্যরাতে বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েছেন সন্তোষকুমার। প্রথমে তাকে তারপর সমরেশদার ফেলে দেওয়া কয়েক হাজার টাকার বেয়ারার চেক তার স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলেছেন, সাবধানে রেখ। আমি ঠিক করলাম দুজনকে মেলাবো। অনেক চেষ্টার পর সমরেশদকে রাজি করলাম সন্তোষদার অফিস ঘরে আসতে। সমরেশদা এলেন। সেসময় একজন মহিলা কবি সন্তোষদার টেবিলের উলটোদিকে বসেছিলেন। সন্তোষদা হঠাৎই সেই কবির সঙ্গে গল্প করতে এমন মত্ত হয়ে উঠলেন যে সমরেশদাকে যেন লক্ষই করলেন না। বুঝলাম এই আচরণে সমরেশদা অস্বস্তিতে পড়েছেন। সন্তোষদাকে মনে করিয়ে দিতে তিনি বললেন, ও হ্যাঁ। একটা গল্প হারিয়ে গিয়েছে তো কি হয়েছে, আর একটা গল্প চাইলেই তো হত। আর হ্যাঁ, টানাপোড়েনটা আর একবার পড়লাম। বাংলা সাহিত্যে কারও হিম্মত ছিল না ওই উপন্যাস লেখার। হ্যাঁ, তোমাকে যেন কি বলছিলাম? মহিলা কবির দিকে তাকালেন তিনি। সমরেশদার মুখে হাসি ফুটল। তিনি নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম পাঁচজন ঔপন্যাসিকের একজন হওয়া সত্ত্বেও সমরেশদার জীবনের শেষদিকে অন্যরকম অস্বস্তি বেড়েছিল। কিছুই লেখা হচ্ছে না, যদি পাঠক তাকে ভুলে যায়! আর এই সময় তিনি একটু কানপাতলাও হয়ে যান। যে যা বলে তাই বিশ্বাস করে ফেলেন। আমার পুরস্কার প্রাপ্তির কারণে বইমেলার অনুষ্ঠানে যিনি দর্শকদের বলতে পারেন, আমার আগে যদি কোন লেখক সমরেশ বসু নামে লিখতেন তাহলে আমি ওই নাম কিছুতেই ব্যবহার করতাম না। সমরেশ সেটা পেরেছে। সেই সমরেশদাই কারও কথায় প্রভাবিত হয়ে বিরূপ কথা লিখলেন একদিন। পড়ে কষ্ট হল। কিন্তু ওঁর কাছে গেলাম। বললেন, কে যে কি মাথায় ঢোকাল, অত্যন্ত অন্যায় হয়ে গেছে। তুমি কিছু মনে করোনি তো?

না। আমি অবাক হয়েছি অন্য কারণে। ওঁর চলে যাওয়ার পর অনেকগুলি বইমেলা চলে গেছে। শুনতে পাই, ওঁর বই নাকি তেমন বিক্রি হচ্ছে না! কেন? এর চেয়ে লজ্জা আর আমরা কিসে পেতে পারি? স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষার সেরা লেখককে যদি বাঙালী পাঠক ভুলে যায় তার চেয়ে অন্যায়। আর কিছু নেই।

তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এখন গ্রন্থাবলীতে বেঁচে আছেন। ঠিক যেভাবে অচিন্ত্যকুমার, প্রেমেন্দ্ৰ মিত্র, মনোজ বসু, গজেন্দ্ৰকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃতিতে চলে যাচ্ছেন সমরেশদা কি এখন সেই পথে? দুজন ব্যতিক্রমী লেখকের কথা জানি। প্ৰথমজন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃত্যুর কয়েক বছর পর থেকে হঠাৎ দেখা গেল বাঙালী পাঠক ওঁর বই কিনতে শুরু করেছে। বই বিক্রির বাজারে হঠাৎ তিনি হটকেক। এই চাহিদাটা সম্ভবত এখনও রয়েছে। দ্বিতীয়জন সৈয়দ মুজতবা আলি। শরদিন্দুর মতো না হলেও তাঁর বই ভাল বিক্রি হয়েছিল মৃত্যুর পরে। বিশেষ করে গ্রন্থাবলী। বিশেষজ্ঞরা এর কী ব্যাখা দেবেন জানি না, কিন্তু শুধু পুরস্কারপ্রাপ্ত রচনা নয়, যাঁর রচনায় বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে পাঠক আবার তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবে এই বিশ্বাস মনে না রাখলে লেখালেখি করতে অস্বস্তি হয়।

ঈশ্বর কখনও কখনও কারও ক্ষেত্রে অকৃপণ হন। অথবা এমনও বলা যেতে পারে, দিয়ে দিতে পারলে ঈশ্বর হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। মুশকিল হল, এতটা যিনি পেলেন অথবা অর্জন করলেন তিনি তা ব্যবহার করবেন কিভাবে? যে ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথের ছিল তা সন্তোষকুমারের ছিল না। এই ক্ষমতা গোছানো সংসারীর। এই ক্ষমতা বুদ্ধি দিয়ে প্রয়োগ করার। রবীন্দ্রনাথ যার রক্তে, হৃদয়ে, নিঃশ্বাসে তিনি রইলেন পথভোলা বাউণ্ডুলে হয়ে। রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত লেখক সন্তোষকুমার ঘোষ একটা মোমবাতিকে দশটা টুকরো করে একসঙ্গে জুলিয়ে গিয়েছেন। সেই মোমবাতির আগুনটার নাম দেওয়া যেতে পারে, অভিমান।

জলপাইগুড়ির বাবুপাড়া পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান সুনীলদা আমাকে এক বিকেলে বলেছিলেন, এখন তুই সন্তোষকুমার ঘোষ পড়। এই নে কিনু গোয়ালার গলি।

খুব ভাল লেগেছিল। তারপর মোমের পুতুল। এর পাশাপাশি একটার পর একটা ছোট গল্প। একদিকে নারায়ণবাবু, নরেন্দ্রনাথ মিত্র অন্যদিকে সন্তোষকুমার। আমাদের দিনরাত এক হওয়ার জোগাড়।

কেন জানি না। কলকাতায় পড়তে এসে সন্তোষকুমারের লেখার সঙ্গে সম্পর্ক আলগা হয়ে গিয়েছিল। তখন তিনি সাংবাদিক। একটার পর একটা কলম লিখছেন। সেসব দুর্ধর্ষ লেখা ঝানু সাংবাদিক ছাড়া লেখা সম্ভব নয়। আনন্দবাজারে তিনি তখন বিশেষ ক্ষমতায়। যাবতীয় তরুণ লেখকদের ডেকে চাকরি দিচ্ছেন। এমনও হয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতা মিথ্যে কথা বলে বাড়িয়ে একজন প্রাবন্ধিক ওর মারফৎ চাকরি পেয়েছিলেন। পরে আনন্দবাজারের অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের চাপে স্বীকার করতে বাধ্য হন। এসব ক্ষেত্রে চাকরি থাকার কথা নয়। কিন্তু ওঁর লেখা সন্তোষকুমারের ভাল লাগায় তাকে এক বছর সময় দিয়েছিলেন শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে। সন্তোষকুমার চাননি এই কারণে সেই তরুণ লেখক কৃতজ্ঞ হোক। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর আচরণ ওঁকে ব্যথিত করেছিল।

সাংবাদিক সন্তোষকুমার সাহিত্যিক সন্তোষকুমারের ক্ষতি করেছিল। দীর্ঘকাল তিনি লেখেননি। আবার যখন লিখলেন তখন শেষ নমষ্কারের মতো উপন্যাস তার হাত থেকে বের হল। নিজের সম্পর্কে প্রচন্ড আস্থা তাকে ক্রমশ অভিমানী করেছিল। আমি ওঁকে দেখেই শিখেছিলাম, ক্ৰোধ যতটা অভিমান তার চেয়ে বেশী শক্তিশালী।

দেশ-এ উত্তরাধিকার লিখছি। হঠাৎ চিঠি। এযাবৎ যা পড়েছি তাতে মনে হয়েছিল আপনি বাংলা সাহিত্যের ঘোড়দৌড়ে অলসো র‍্যান ঘোড়া। এই লেখা পড়ে চমকে উঠলাম। দয়া করে দর্শন দেবেন? সন্তোষকুমার ঘোষ।

আনন্দবাজারের চারতলায় তিনি বসতেন। সেখান যাওয়ার প্রয়োজন হত না। আমি যেতাম দেশে বিমলদার কাছে, রবিবাসরীয়তে রমাপদদার কাছে এবং পরে সাগরদার চেম্বারে। সন্তোষকুমার একজন কড়া মানুষ, সেইসঙ্গে উন্নাসিক এরকম ধারণা প্রচারিত ছিল। তবু ভয়ে ভয়ে গেলাম। উনি তখন ডিকটেশন দিচ্ছিলেন। আমার পরিচয় শুনে হাত নেড়ে বসতে বললেন। কাজ শেষ হলে বললেন, চল।

আদেশ অমান্য করার সাহস ছিল না। ওঁর গাড়িতে রবীন্দ্রসদনে পৌঁছলাম। পথে একটাও কথা বললেন না। সেই সন্ধ্যায় ছিল সুচিত্রা মিত্র এবং কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠান। ওঁর পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। শেষ হওয়া মাত্র বললেন, চল।

রবীন্দ্রসদন থেকে সোজা রাতদিন হোটেলে। আমি খাই কিনা না জিজ্ঞাসা করেই মদের হুকুম দিলেন। তারপর বললেন কথা। ওই প্ৰবীণ মানুষটি যে আমার প্রায় সব লেখা পড়েছেন তা জেনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেসব লেখাকে কচুকাটা করে তিনি উত্তরাধিকার নিয়ে কথা শুরু করলেন। সেই রাতে বাড়ি ফিরে খুব উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম।

তারপর প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ওঁর সঙ্গে দেখা হত। ওর কথা আমি গিলতাম। একটি মানুষ। শুধু কথা বলে যাচ্ছেন আর আমি সেইসব কথায় একটার পর একটা গল্প পেয়ে যাচ্ছি। সেই সব গল্প লিখছি দেশ পত্রিকায়। আমার ভ্রমণবৃত্তান্ত গল্পটি তো আমি শুধু সাজিয়ে দিয়েছি। যে ভাষায় তিনি ভাবতেন, বলতেন, লিখতেন। সেই নতুন আঙ্গিকের বাংলাভাষা যাকে অনেকেই অনাবশ্যক জটিল বলত, আমি ভ্রমণবৃত্তান্তে অনুকরণ করেছিলাম।

একথা ঠিক সন্তোষকুমার তার লেখার ভাষায় জটিলতা এনেছিলেন। সম্ভবত সেই কারণে তিনি পাঠকদের কাছে পাননি। এটা তার জীবনের শেষ পর্যায়ের কথা। তখন কেউ যদি কিনু গোয়ালার গলির প্রশংসা করত। খুব রেগে যেতেন।

গল্প, উপন্যাস, প্ৰবন্ধ এবং সমালোচনা কোনটাতেই তাঁর জড়তা ছিল না। তিনি লিখছেন না বলে নিয়মিত আমার সঙ্গে ঝগড়া হত। সেসব ঝগড়ার পর এক রাতে অনবদ্য ছোটগল্প লিখে ফেলে শিশুর মত হাসতেন, তুমিই লেখালে। আবার আমার পুজোসংখ্যায় বেরনো উপন্যাস রাতেই শেষ করে ভোরবেলায় চলে এসেছেন বাড়িতে। আমাকে ঘুম থেকে তুলে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, কি লিখেছিস রে! তোর মতো গবেটও এমন লিখতে পারে! দাবা বের কর।

সেই ভোর থেকে টানা দাবা খেলে গেলেন দুপুর পর্যন্ত। স্নান খাওয়া নেই। খেতে বললে নামমাত্র খেলেন। তারপর আমাকে নিয়ে বের হলেন। সোজা মিনার্ভা বারে। সেখানে বসে কী কী লেখার পরিকল্পনা মাথায় ঢুকেছে সেগুলো জানালেন। তারপর বললেন, চল।

আমরা গেলাম হাজরা রোডের একজন মহিলা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর বাড়িতে। সেখানে তাস খেলা হচ্ছিল। লক্ষ করেছি সন্তোষকুমারকে পেলেই যে কোনও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী উচ্ছসিত হয়ে ওঠেন। গোটা গীতবিতান যার মুখস্থ, স্বরবিতানের কোন পাতায় কোন স্বরিলিপি আছে যিনি বলে দিতে পারেন, সুরের সামান্য বিচ্যুতি যাকে ক্ষিপ্ত করে তোলে তাকে আপনজন ভাবা স্বাভাবিক। সন্তোষদা তাসে জমে গেলেন। এই সময় এক মধ্যবয়সী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ঘরে ঢুকে বললেন, ছি ছি সন্তোষদা, আপনি এটা কি করেছেন? আপনি লিখেছেন, একটা জাহাজ যখন ভোঁ বাজিয়ে জাহাজঘাটা ছেড়ে চলে গেল ঠিক তখনই একটা মেল ট্রেন সদৰ্পে হুইস্‌ল দিয়ে পাশের স্টেশনে ঢুকল? আপনি কিছুতেই ওঁকে এভাবে অপমান করতে পারেন না।

সন্তোষদা বললেন, তুমি বয়সে অনেক ছোট, বড়দের বিষয়ে কথা বলো না।

আলবৎ বলব। চেঁচিয়ে উঠেছিলেন সেই গায়ক।

সন্তোষদা তবু উপেক্ষা করে তাস খেলতে শুরু করলেন। এই সময় সেই প্ৰবীণা শিল্পী ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে গায়ককে সমর্থন করে গালাগালি দিতে শুরু করলেন। যার কণ্ঠে রবীন্দ্ৰনাথ জেগে ওঠেন তাকে ওই ভাষায় কথা বলতে শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সন্তোষদা তাস রেখে আমায় বললেন, চল। খেলার সঙ্গীরা বাধা দিতে চাইল, তিনি শুনলেন না।

সেই রাত্রে অনেকটা সময় আমি ওঁর সঙ্গে ছিলাম। লক্ষ করেছিলাম প্ৰবীণা যখন আক্রমণ করেছিলেন তখন সন্তোষদা একটি কথাও বলেননি। অনেকটা পান করার পর তিনি বলেছিলেন, ওইসব শব্দ আমি কয়েকযুগ ধরে ওঁর মুখে শুনে আসছি। একবার পাক-পাড়ায় বাড়ির বসার ঘরে সবাই আড্ডা মারছি। পর্দার নিচ দিয়ে দেখলাম লুঙ্গি পরে কেউ যাচ্ছে। উনিও দেখেছিলেন। কিন্তু লুঙ্গিকে শাড়ী ভেবে নিয়ে আমাকে তোমার বউদির সামনেই গালাগাল করেছিলেন। ভেবেছিলেন আমি রাস্তার মহিলাকে দেখছি।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন এমন হয়?

উনি বলেছিলেন, ভালবাসা বন্যার মতো। যতক্ষণ নদীতে তীব্র স্রোত থাকে, সব ভাসায় কিন্তু নদী নিজে ভাসে না। যেই বন্যার জল নেমে যায়, নদী থাকে তারই মতো। শুধু দুপাশের চরাচর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে থাকে। পলি জমে জমে নিষ্ফলা হয়। ভালবাসলে ওই ক্ষতচিহ্নগুলো তোমাকে বইতেই হবে। আর কে বলতে পারে, হয়তো ওই ক্ষতচিহ্নগুলো আছে বলে ভালবাসা মনে থাকে।

তার মানে বন্যার স্মৃতি নদী বহন করে না?

না। সেটা খুঁজতে তোমাকে নদীর দুপাশে তাকাতে হবে। মুশকিল হল, কেউ কেউ ওই ক্ষতিগুলো নিয়ে বসে থাকতে ভালবাসেন সারাজীবন, ভুল করেও শান্ত হয়ে যাওয়া নদীর দিকে তাকান না। তাই তাদের মুখ থেকে পাক বেরিয়ে আসে। আর কে না জানে যে সুন্দর করেছে, পঙ্কিল করার অধিকার তারও আছে।

অদ্ভুত এক অন্ধকারে ছটফটিয়ে আপনবৃত্তে থাকা রাজার মতো মনে হত সন্তোষদাকে। আর তাই বারংবার হাত বাড়িয়েছেন উষ্ণতা খুঁজতে, যে উষ্ণতা একমাত্র আলোই দিতে পারে। তাই তাকে শুনতে হয়েছে, রসবিকৃতির পীড়া সইতে পারি না। রক্তকরবীর রাজার সঙ্গে শাপমোচনের রাজার যেখানে মিল সেখানেই তিনি। বারংবার তাঁকে দেখি একটি ছোট্ট ঘাসের দিকেও হাত বাড়িয়ে বলছেন, আমি বাঁচতে চাই।

রবীন্দ্ৰনাথ তার ঈশ্বর, একমাত্র ঈশ্বর। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পীরা তাই তার আত্মীয়। কেউ কেউ তাঁর আত্মায় মিশেছিলেন। পূজার গান যতটা ভালবাসতেন প্রেমের গান কম নয়। বলতেন, প্রেম ছাড়া পুজো হয় নাকি? আর প্রেমে যদি পুজো না থাকে তাহলে প্রেম কিসের?

দেশ-এ মাঝে মাঝে ছোটগল্প বের হচ্ছে। আনন্দবাজারের চার তলার বদ্ধ ঘরে বসে অভিমানের পাহাড় তৈরি করেছিলেন, আমার তাড়নায় মাঝে মাঝে সেই লেখা। বেশির ভাগই দার্শনিকের চোখে জীবন দেখা। অনবদ্য ভাষা, কিন্তু গল্প কোথায়? প্রশ্ন করতেই সেটা জানিয়ে তার আগের গল্পগুলোর কথা মনে করিয়ে দিতাম। তিনি বলতেন, লিখব, লিখব। অথচ আনন্দলোক পত্রিকার সম্পাদকের আমন্ত্রণে উপন্যাস লিখলেন মাত্র নয় পৃষ্ঠার। খুব রাগারগি হয়েছিল সেটা শোনার পর। ন’পাতার উপন্যাস! বললেন, ঠিক আছে, এবার সংসারী হব, গুছিয়ে লিখব।

কালবেলা উপন্যাসটি তাকে উৎসর্গ করেছিলাম। সেটা দেখে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন, ইস্‌। করেছ কি? যার লেখা বই একদম বিক্রি হয় না। তাকে উৎসর্গ করেছ? এই বই-এর বারোটা বেজে গেল।

কখনও কখনও রাতে লিখতাম। লিখতে গিয়ে মনে পড়ছিল না উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়ি থেকে বা দিকে যে রাস্তা চলে গিয়েছে তার প্রথম গঞ্জটার নাম কি? সেই গভীর রাতে ফোনে প্রশ্নটা করেছি, তিনি এক মুহূৰ্ত্ত সময় না নিয়ে বলেছেন, লাটাগুড়ি। বলে নামিয়ে রেখেছেন ফোন। এরকম অজস্র প্রশ্ন যা হাতের কাছে কোনও প্রমাণ না পেয়ে তার দারস্থ হয়েছি। আর সঙ্গে সঙ্গে সঠিক জবাব পেয়েছি। এখন পর্যন্ত এইরকম জ্ঞানভান্ডার আমি কোনও বাঙালির দেখিনি।

আমেরিকায় যাচ্ছিলেন। আমার বন্ধু মনোজ ভৌমিক কুইনসে থাকে। ও লেখালেখি করে শুনে বললেন, টেলিফোন নাম্বার দাও, ওর কাছে কদিন থাকব। দিলাম। চলে যাওয়ার পর মনোজকেও জানিয়ে দিলাম। মনোজ খুব উত্তেজিত। মাস খানেক পরে মনোজের ফোন এল, সমরেশ। একটু আগে সন্তোষবাবু ফোন করেছিলেন ওয়াশিংটনের এক হোটেল থেকে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, সমরেশ নামক এক অর্বাচীন কি আপনার পরিচিত? সে কি আমার কথা কিছু বলেছে? আমি হ্যাঁ বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, একটু ধরুন। প্রায় পাঁচ মিনিট বাদে তিনি ফিরে এসে বললেন, সরি। আসলে আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় দেখতে পেলাম দুৰ্গঠিাকুরের মতো দেখতে এক মেমসাহেব কিছুটা দূর দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে কাছ থেকে দেখে এলাম। মনোজ, আপনি কখনও দুর্গাঠাকুরের মতো মেমসাহেব দেখেছেন?

সমরেশ লং ডিসটেন্সে যিনি এমন কথা বলতে পারেন তার সঙ্গ পাওয়ার জন্যে আমি ছটফট করছি।

গভীর মনের মহিলারা তাঁর কাছে এগিয়ে গেলে সন্তোষদা আপ্লুত হতেন। মুখোমুখি বসে শুধু কথা বলে যেতে তিনি নিজে যত আনন্দ পেতেন তঁর শ্রোতা অনেক বেশী পেত। এতে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু তার আচরণ কখনওই শোভনসীমার বাইরে যেত না। এটা না বুঝে এক মহিলা প্রায় প্রাত্যহিক প্রেমপত্ৰ পাঠাতে আরম্ভ করলেন। ভদ্রমহিলা শেষপর্যন্ত লিখতে আরম্ভ করলেন যে তিনি বিশ্বাস করেন সন্তোষদা বিবাহিত নন, ছেলেমেয়ে হয়নি। তাঁর অফিসে ঢোকার অনুমতি বাতিল করেছিলেন সন্তোষদা। কিন্তু কলকাতার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা মানেই তো সন্তোষদার উপস্থিতি। মহিলা সেখানে উপস্থিত হতেন। বিব্রত না হওয়ার জন্যে সন্তোষদা কখনও কোনও সঙ্গী ছাড়া অনুষ্ঠানে যেতেন না। জীবন বড় রহস্যময়। এই মহিলার সম্পর্কে জানতে চেয়ে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। জেনেছি ইনি আমাদের সেই সহপাঠিনী যিনি নারায়ণবাবুতে অনুরক্ত ছিলেন। এদেশের নিয়ম অনুযায়ী কোনও নারীর একজন পুরুষের প্রেমে মগ্ন থাকা কর্তব্য। পুরুষের ক্ষেত্রে সেসব নিয়ম মানার দরকার নেই। এই মহিলা সেই নিষেধ উপেক্ষা করেছিলেন। সন্তোষদা এই প্ৰাবল্যে আতঙ্কিত হয়েছিলেন। শুধু চিঠি লিখে যাওয়া ছাড়া মহিলা অবশ্য আর কোনও সমস্যা তৈরি করেননি।

এই শহরের কে না বন্ধু ছিল তাঁর? শম্ভু মিত্রের মত মানুষও তাঁর সঙ্গ চাইতেন। আবার তৃপ্তি মিত্র তো খুবই কাছের মানুষ। একবার এই দুজনকে নিয়ে বসতে চেয়েছিলেন সন্তোষদা। শেষ মুহূৰ্ত্তে বিফল হন।

গলা নিয়ে অস্বস্তি ছিল। যখন অসুখটা ধরা পড়ল তখন একদিন তাঁকে বলতে শুনলাম, না। আমার কোনও আক্ষেপ নেই। জীবন শুরু করেছিলাম অন্যের নামে বই লিখে দিয়ে। সেই একটি মাত্র রবীন্দ্ৰ বিষয়ক বই ওই পরলোকগত সম্পাদককে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার যা লেখা উচিত ছিল তার কিছুই লিখতে পারিনি। এর জন্য দায়ী আমি। সাংবাদিক হিসেবে কিছুটা কাজ করতে পেরেছি এটুকু বলতেই হবে তোমাদের। রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছি প্রাণভরে। নারী আমার জীবনে এসেছে। তারাও তৃপ্ত হয়নি, আমিও না। জীবনে একটি নারীর কাছেই আমি এগিয়ে গিয়ে জল চেয়েছিলাম। তাকে হয়ত সারাজীবন মরুভূমির ঝড় সইতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি ক্ষমা করতে জানেন, ক’জন জানে? এই অসুখ ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের হয়েছিল। এর চেয়ে ভাল হওয়া আমার আর কিসে হত? না। আমার কোনও আক্ষেপ নেই।

এইসব বলার কিছুদিন পরে চিকিৎসার জন্যে মুম্বই এবং কলকাতার বেলভিউ নার্সিংহোমে ছোটাছুটির মধ্যে লিখে ফেললেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দুটো লেখা যাত্রাভঙ্গ এবং চলার পথে। ওঁর মৃত্যুর পর দেশ পত্রিকায় যখন প্ৰকাশিত হল। তখন লেখাগুলোর প্রতিটি লাইন বাঙালি পাঠককে বিদ্ধ করেছিল।

উনি যখন শেষ সময়ে, বেলভিউতে, তখন কণ্ঠরোধ হয়েছিল। আর তখনই জানতে পারলাম, কালবেলার জন্যে আকাদেমী পুরষ্কার দেওয়া হচ্ছে। ভোরবেলায় ছুটে গেলাম নার্সিংহোমে। ওঁর মেয়ে মিলু বলল, যাক এসে পড়েছেন। বাবা কাগজ পড়ে ছটফট করছেন।

উনি বসেছিলেন সাদা বিছানায়। ক্যান্সার শরীরটাকে ছোট করে দিয়েছে। আমায় দেখে হাসলেন। কথা বলতে চাইলেন, শব্দ বের হল না। তাড়াতাড়ি কাগজ-কলম নিয়ে লিখলেন, এক জীবনে দ্বিতীয়বার আমি আকাদেমী পেলাম।

ওঁর শেষ সময়ে আমি দিল্লিতে ছিলাম। পুরস্কত হওয়ার পরের দিন দিল্লির আনন্দবাজার অফিসে গিয়ে নীরেনদার কাছে জানতে পারলাম তিনি নেই। দিল্লি যাওয়ার আগে যখন নার্সিংহোমে দেখা করতে গিয়েছিলাম তখন লিখে জানিয়েছিলেন, ‘তোমার পুরস্কার নেওয়াটা কি টিভিতে দেখাবে? তাহলে দেখব।

সন্তোষদার সঙ্গে শক্তিদার পার্থক্য প্রচুর। কিন্তু কোথাও যেন খুব মিল মিল।

চোয়ালে থাপ্পড় যদি কম হয় মারবো পোঁদে লাথি।

ষাটের দশকের শুরুতে এরকম লাইন কানে আসমাত্র পাঠক মুখ ফিরিয়ে দেখতে চেয়েছিল কার গলা? সঙ্গে সঙ্গে তিনি জানান দিয়েছিলেন, এই যে মশাই, দেখছেনটা কি? আমি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবিতা নয়, পদ্য লিখছি, আপনাদের বদহজম হবে।

এই সংলাপ কল্পিত কিন্তু যুবকের প্রবেশ হয়েছিল এইভাবেই। নিয়মভাঙ্গার ঔদ্ধত্য নিয়ে যারা অশ্লীল শব্দের ঘোড়া ছুটিয়েছিল তাদের পরিচয় ছিল হাংরি জেনারেশনের লেখক। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তখন যুবক। সন্তোষকুমার বলেছিলেন শাস্ত্রবিরোধীদের সম্পর্কে, বিরোধিতা করতে গেলে শাস্ত্রটা জানতে হয়। হাংরিদের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা প্রযোজ্য। তাদের অনেকে যখন সাহিত্যকে লাল গামছা জাতীয় বই-এ নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন অক্ষমতার কারণে তখনই পুলিশের ধরপাকড় শুরু হয়েছিল। একথা ঠিক এই দলের কেউ কেউ ভাল লিখতে পারতেন। কিন্তু ধ্বংস করার নেশায় তারা জ্বলে পুড়ে গেছেন। শোনা যায়, শক্তিদা নাকি পুলিশকে বলেছিলেন, আর কখনও অশ্লীল লেখা লিখবেন না। ফলে দল তাঁকে অস্বীকার করেছিল। ভাগ্যিস করেছিল।

জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতায় সবচেয়ে যিনি আকর্ষণীয় তার নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এই মানুষটি কেমন? কফিহাউসে ওঁর সঙ্গে আলাপ ছাত্রাবস্থায়, কবি শংকর দে বলেছিল, শক্তিদা অনেকগুলো ছোট ছোট বালিশ আঁকড়ে ধরে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকেন। কথা বলেন জমিয়ে, হাসেন শিশুর মতো। এই মানুষ যখন চোয়ালে থাপ্পড় মারতে চান এবং সেটা কম হলে স্থান নির্বাচন করে লাথি মারার জন্য প্ৰস্তুত তখন ধন্দ লাগে। এই ধন্দ তাঁকে ঘিরে ছিল তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত।

শক্তিদার সঙ্গে সুনীল-সন্দীপনের নাম একসঙ্গে বলা হত। প্রায়ই উধাও হতেন তারা। কখনও চক্ৰধরপুর কখনও চাইবাসায়! অমুক রিক্সাওয়ালার কাছে মালের বোতল রাখা আছে। এই খবর পেয়ে কলকাতা থেকে চলল আর একজন। মহুয়া খেয়ে সুবর্ণরেখার চরে শুয়ে বুড়ি চাঁদটাকে কতবার চুমু খেয়েছি তুই জানিস না সমরেশ। খালাসিটোলা আর বারদুয়ারী, কলকাতার এই দুই ঠেকে ছিল ওঁদের সান্ধ্য আড্ডা। তারপর হয়তো সারা রাত কলকাতার দখল নেওয়া। বেলালের কাছে শুনেছি শক্তিদা পুলিশ অফিসারকে কবিতা শুনিয়েছেন।

ভুল হল। শক্তিদা বলতেন, পদ্য। তুই গদ্যকার, আমি পদ্যকার। গদ্য লিখলে টাকা পাওয়া যায়? তাহলে লেখা যাক। কদিন বাদেই আবার, দূর! সুনীল যেটা পারে আমি পারব কেন? ওঁর লেখা পড়ে আপ্লুত হয়ে গেলাম টেবো পাহাড়ে। কোথায় সেই ঝরণা, গেস্ট হাউসের আরাম! ভোরে বাস থেকে নেমে দাঁতন করেছিলাম, মুখ ধোওয়ার জল পেলাম চক্ৰধরপুরে এসে। কলকাতায় ফিরেই ওঁকে ধরলাম। শিশুর মতো হেসে বললেন, তুই আমার গদ্য পড়িস নাকি? কি নির্বোধ রে বাবা।

তখন শক্তিদা মানেই একটা কিছু গোলমাল। কখন কী হয়? অথচ ওঁর ওপর রাগ করা যায় না! অথচ শক্তিদা নিয়ম ভাঙবেনই। পাশাপাশি উনি লিখছেন সেইসব দারুণ দারুণ কবিতা যা নিয়ে একশ বছর পরেও বাঙালি গর্ব করবে। আমার পিতৃদেব ছিলেন খুব রক্ষণশীল মানুষ। দেশ পত্রিকা রাখতেন কিন্তু কবিতা পড়তেন না। থাকতেন ড়ুয়ার্সের এক চা-বাগানে। যেখানে হোটেল নেই।

এক সন্ধ্যাবেলায় অফিস থেকে ফিরে যখন চা খাচ্ছিলেন তখন এক ভদ্রলোক এলেন বাড়িতে, আমি বাস মিস করেছি। এখানে কোনও হোটেল নেই। খবর নিয়ে জানলাম আপনিই শুধু দেশ রাখেন। আমি পদ্য লিখি।

আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বেশ তো। আপনার নাম আমি দেশে দেখেছি। আসুন।

শক্তিদা ঘরে ঢুকে দেওয়ালে আমার ছবি দেখে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, আরে! এতো সমরেশ। আমার ভাই। আপনার কে হয়?

আমার ছেলে।

সম্ভবত আমাকে চেনার কারণে ওঁর খাতির বেড়ে গেল। মা জলখাবার পাঠালেন বাইরের ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে। রাতে স্পেশাল রান্না চাপল। শক্তিদা আমাদের বুড়ে মদেশিয়া কাজের লোককে নিয়ে বের হলেন বাগানটা ঘুরে দেখতে।

এর পরের ঘটনা পিতৃদেব এইভাবে লিখেছিলেন, তোমার মা জেগেছিলেন রাত একটা পর্যন্ত। তুমি জানো চা-বাগানে কেউ দশটার পর জাগে না। তিনি এলেন রাত দুটোয়। ঝাড়ি তাকে বয়ে নিয়ে এল। শুনলাম কুলি লাইনে গিয়ে হাঁড়িয়া গিলেছেন। শুধু নিজে নয়, ঝাড়িকেও খাইয়েছেন। খবরটা পরদিনই চাউর হয়ে গেল। বুঝতেই পারছ চা-বাগানে এর ফলে আমার সম্মান কতটা বাড়ল! যাহোক, তিনি চলে গেলেন পরদিন সকালে। বলে গেছেন ওর কবিতার বই পাঠিয়ে দেবেন। কবিতা লিখতে গেলে হাঁড়িয়াও খেতে হয় এই তথ্য আমি জানতাম না।

শক্তিদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, তোদের গায়েরকাটায় যা হাঁড়িয়া পাওয়া যায়, তার তুলনা নেই।

কি এক অশান্ত ওঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। সংসারে ছিলেন কখনও সন্ন্যাসীর মতো কখনও স্নেহপ্রবণ পিতার ভূমিকায়। এই দুই চরিত্র একই মানুষের। কানপাতলাও ছিলেন। কেউ একজন গপ্পো বানিয়ে বলেছিল আমার প্রসঙ্গে। বিশ্বাস করে তাই নিয়ে আক্রমণ করলেন একদিন। বিশ্লেষণ করার পর চুমু খেয়ে বললেন, রাগ করিস না বাবু।

আমার কেবলই মনে হয়েছে মানুষটি একটা ঠিকানা খুঁজতে চেয়েছেন। সেই ঠিকানায় পৌঁছবার জন্যে আপ্ৰাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন, নিয়মের ধার ধারেননি। দিনরাত মদে ড়ুবে থেকেছেন। কিন্তু কোন নারীর জন্যে লালায়িত হননি। যাকে বিবাহ করেছেন। তাঁকেই শেষ নারী হিসেবে মেনে নিয়েছেন। মেনে নেওয়া কথাটা ঠিক _____ যেন আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা পেয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রীর মধ্যে, পৃথিবীর আর কোনও নারীর কাছে চাওয়ার কিছু নেই।

এইখানেই তার সঙ্গে অন্য তিনজনের পার্থক্য। তিনি অতৃপ্ত নিজেকে ভেঙেছেন, বাড়ি খুজেছেন, অবিরত।

মাঝখানে ভিনপ্রদেশে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্যে। চিকিৎসাটা মদ ছাড়ার। ফিরে এলেন বেশ কিছুদিন বাদে বেশ তরতাজা হয়ে। কফিহাইসে দেখা। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন কাটালে? খুব দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললেন, আর বলিস না। লোকটার জন্যে খুব কষ্ট হচ্ছে।

কে?

যাঁর কাছে গিয়েছিলাম। আমি মদ ছাড়লাম। কিন্তু আমার সঙ্গে থেকে ডাক্তারটা মদ ধরল। বোঝ।

হয়তো গল্প। আর এই গল্প তিনিই বলতে পারতেন। মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর কথা লিখেছেন নানান কবিতায়। যেন নিজের শেষটা দেখে গিয়ে লিখে গেছেন সেসব।

শেষদিকে শক্তিদাকে একটু ঝিমিয়ে পড়তে দেখেছি। বলতেন, বুড়ো হয়ে গেলাম। জীবনটা এত ছোট।

চমকে উঠেছিলাম কথাটা শুনে। সমরেশদার কথা মনে পড়েছিল। আমার মুখ দেখে হেসে বলেছিলেন, হবে না কেন? এ বাবু বড় অভিমানী। বল্‌?

নিজের মতো বেঁচে চলে গেলেন শক্তিদা।

কিন্তু সন্তোষদার সঙ্গে তার মিল এক জায়গায়, সেটা অতৃপ্তি নিয়ে ছটফটানিতে। বোধহয় সমরেশদার সঙ্গেও। এই তিনজনের সঙ্গে নারায়ণবাবুর তফাৎ একটাই, তিনি মাস্টারমশাই ছিলেন, বাধ্য হয়ে শোভনসীমার মধ্যে তাঁকে থাকতে হয়েছে। এই চারজনের আর একটা মিল ছিল। চারজনেই মনে করতেন, যাঁরা অক্ষম, কিছু দেওয়ার যাঁদের ক্ষমতা নেই তাঁরাই সমালোচনা করেন। অন্তত তাঁদের চারপাশে যাঁরা সমালোচনা করেই নাম করেছেন তাদের সম্পর্কে অপূর্ব উদাসীনতা ছিল এঁদের।

এই রচনার নাম দেওয়া যেত, সুন্দরের স্বেচ্ছাচার। কিন্তু সুন্দর কী, এই নিয়েই তো এদের মতবিভেদ। আর স্বেচ্ছাচার মানেই যে খারাপ কিছু করা এটা কেউই বিশ্বাস করতেন না। এই চারজন এখন পৃথিবীতে নেই। এঁদের সাহিত্য নিয়ে যারা বলার অধিকারী তাঁরা বলবেন। কিন্তু এদের জীবন আমাকে ভাবায়। কইতে কথা বাধলেও বলা দরকার।

Print Friendly, PDF & Email
%d bloggers like this: