ব্যোমকেশ ও আমি গত ফাল্গুন মাসে বীরেনবাবুর কন্যার বিবাহ উপলক্ষে দু’দিনের জন্য কলিকাতার বাহিরে গিয়াছিলাম। শহরটি প্রাচীন এবং নোংরা। কলিকাতা হইতে মাত্র তিন ঘণ্টার পথ। ট্রেন বদল করিতে না হইলে আরও কম সময়ে যাওয়া যাইত।

ছিলেন। বহুবার বহু সূত্রে তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়াছি। অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। বছর দুই আগে অবসর লইয়া এই শহরে বাস্তুভিটায় বাস করিতেছেন। কন্যার বিবাহে আমাদের সনির্বন্ধ নিমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন। ব্যোমকেশেরও হাতে কাজ ছিল না। তাই বিবাহের দিন পূর্বন্ধুে আমরা বীরেনবাবুর গৃহে অবতীর্ণ হইলাম।

বিয়ে-বাড়িতে যথাবিহিত কর্মতৎপরতা ও হৈ হৈ চলিতেছে‌, সানাই বাজিতেছে। বীরেনবাবু ছুটিয়া আসিয়া আমাদের সম্বর্ধনা করিলেন এবং একটি ঘরে লইয়া গিয়া বসাইলেন। ঘরের মেঝোয় ফরাস পাতা; বরযাত্রীদের জন্য যথারীতি সাজানো। কিন্তু বর ও বরযাত্রীরা স্থানীয় ব্যক্তি‌, তাহারা সন্ধ্যার পর আসিবে। উপস্থিত ঘরটি খালি রহিয়াছে।

আমরা তাকিয়া ঠেস দিয়া বসিলাম। চা জলখাবার আসিল। বীরেনবাবু আমাদের সঙ্গে আলাপ করিতে করিতে একটু উসখুসি করিতে লাগিলেন। তাহা দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনি কন্যাকাতা‌, আজকের দিনে আপনি বসে আড্ডা মারলে চলবে কি করে? যান‌, কাজকর্ম করুন গিয়ে।’

বীরেনবাবু একটু অপ্রতিভভাবে এদিক ওদিক চাহিতেছেন এমন সময় ঘরের বাহিরে কণ্ঠস্বর শোনা গেল‌, ‘কই হে বীরেন‌, মেয়ের বিয়ের কি ব্যবস্থা করলে দেখতে এলাম।’

‘এই যে দাদা।’ বীরেনবাবু তাড়াতাড়ি গিয়া একটি বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ঘরের মধ্যে লইয়া আসিলেন–’ভালই হল আপনি এসে পড়েছেন। এঁরা আমার দুই বন্ধু‌, কলকাতা থেকে এসেছেন। নাম জানেন নিশ্চয়‌, আমাদেরই দলের লোক। ইনি হলেন স্বনামধন্য ব্যোমকেশ বক্সী‌, আর উনি সুলেখক অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।’

‘নাম শুনেছি বৈকি।’ বলিয়া ভদ্রলোক আমাদের প্রতি তীক্ষ্ণয়ত দৃষ্টিপাত করিলেন।

বীরেনবাবু বলিলেন‌, ‘ইনি হচ্ছেন নীলমণি মজুমদার। পুলিসের নামজাদা অফিসার ছিলেন‌, এখন রিটায়ার করেছেন।’

আমরাও ভদ্রলোককে দেখিলাম। গৌরবর্ণ লম্বা চেহারা; বয়স বোধ করি ষাটের ঊর্ধ্বে কিন্তু শরীর বেশ দৃঢ় আছে; পিঠের শিরদাঁড়া তাঁহার হাতের লাঠির মতাই শক্ত এবং ঋজু। মুখ দেখিয়া মনে হয় জবরদস্ত রাশভারী লোক। গলার স্বর গম্ভীর।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বসতে আজ্ঞা হোক।।’

নীলমণি মজুমদার লাঠিসুদ্ধ হাত তুলিয়া নমস্কার করিলেন এবং আমাদের মুখোমুখি হইয়া উপবিষ্ট হইলেন। বীরেনবাবু বলিলেন‌, ‘নীলমণিদা‌, আপনারা তাহলে গল্পসল্প করুন‌, আমি একটু—‘

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি প্রস্থান করুন। কেবল চাকরকে বলে দেবেন যেন তামাক দিয়ে যায়। গড়গড়া দুটো নিষ্কমার মত হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে।’

বীরেনবাবু প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ নীলমণিবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনারও কি আদি নিবাস। এই শহরে?’

নীলমণিবাবু মাথা নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘না। আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গে। কিন্তু সে-সব গেছে! রিটায়ার করে বুড়ো বয়সে কোথায় যােব‌, তাই এখানেই আছি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এখানে আপনার আত্মীয়-স্বজন আছেন বুঝি?’

কাজই করেছি। পুলিসের কাজে একটা মোহ আছে; আমি আমার কাজে সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিলাম। তারপর যখন রিটায়ার করলাম‌, তখন এই শহরেই রয়ে গেলাম। এই শহরটার সঙ্গে আমার একটা নাড়ির যোগ আছে; প্রথম যখন সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে পুলিসে ঢুকেছিলাম‌, তখন এই শহরেই পোস্টেড হয়েছিলাম। আবার রিটায়ার করলাম। এই শহর থেকেই।’

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল‌, ‘শহরটার ওপর মায়া পড়ে গেছে আর কি। কতদিন রিটায়ার করেছেন?’

‘সাত বছর।’ এই সময় ভূত্য আসিয়া দুই ছিলিম তামাক দু’টি গড়গড়ার মাথার উপর বসাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

নীলমণিবাবু একটি গড়গড়ার নল হাতে লইলেন‌, অন্যটি লইল ব্যোমকেশ। কিছুক্ষণ নীরবে: ধূমপান চলিল। উৎকৃষ্ট তামাক; ধূম-গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়া উঠিল।

ব্যোমকেশকে প্রথমে দেখিয়া এবং তাহার পরিচয় পাইয়া অনেকেই তাহাকে পরম কৌতুহলের সহিত নিরীক্ষণ করিয়া থাকে। নীলমণিবাবুও তামাক টানিতে টানিতে তাহাকে নিরীক্ষণ করিতেছিলেন‌, কিন্তু তাঁহার নিরীক্ষণের মধ্যে একটু বিশেষত্র ছিল। ভক্ত-সুলভ পুলক-বিহ্বলতা একেবারেই ছিল না; বরং তিনি যেন চক্ষু দিয়া ব্যোমকেশকে তৌল করিতেছিলেন‌, ব্যোমকেশের খ্যাতি ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য আছে তাহাঁই ওজন করিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। নীলমণিবাবু বুদ্ধিজীবী পুলিস কর্মচারী ছিলেন, স্বচক্ষে দেখিয়া মানুষের চরিত্র নির্ণয় করা তাঁহার কাজ ছিল; পরের মুখে ঝাল খাইবার লোক তিনি নন। তাই ব্যোমকেশকে তিনি নিজের বুদ্ধির নিকষে যাচাই করিয়া লইতে চান।

অবশেষে গড়গড়ার নলটি মুখ হইতে সরাইয়া তিনি যখন কথা বলিলেন‌, তখন তাঁহার কথার মধ্যেও এই প্রচ্ছন্ন অনুসন্ধিৎসা বক্রভাবে প্রকাশ পাইল। তিনি বলিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনাকে নিয়ে লেখা রহস্য কাহিনীগুলি সবই আমি পড়েছি। লক্ষ্য করেছি‌, সব সমস্যাই আপনি সমাধান করেছেন। তাই জানতে ইচ্ছে হয়‌, আপনি কি কখনো কোনো রহস্যের মমোদঘাটনে অকৃতকার্য হননি? কখনো কি ভুল করেননি?’

ব্যোমকেশ গড়গড়ার নল আমার হাতে দিয়া সবিনয়ে হাসিল। বলিল‌, ‘কখনো ভুল করিনি এত বড় কথা বলার স্পধর্ম আমার নেই। নীলমণিবাবু্‌, আমি সত্যান্বেষী। ভুল-ভ্ৰান্তি অনেক করেছি; এমনও অনেকবার হয়েছে যে অপরাধীকে ধরতে পারিনি। কিন্তু সত্যের সন্ধান পাইনি এমন বোধ হয়। কখনো হয়নি। অবশ্য বলতে পারেন। আমি কটা রহস্যই বা পেয়েছি। আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি রহস্য ঘটনা নিয়ে কাজ করেছেন। আপনি। আপনি যতদিন চাকরিতে ছিলেন প্রত্যহ দুচারটে ছোট-বড় কেস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। আমাকে যদি তাই করতে হত‌, আমারও অসংখ্য কেস অমীমাংসিত থেকে যেত সন্দেহ নেই।’

ব্যোমকেশের উত্তর শুনিয়া নীলমণিবাবু মনে মনে সন্তুষ্ট হইয়াছেন মনে হইল। তিনি যখন আবার কথা বললেন তখন তাঁহার কণ্ঠস্বরে একটু ঘনিষ্ঠতার সুর ধ্বনিত হইল। তিনি বলিলেন‌, ‘দেখুন ব্যোমকেশবাবু্‌, পুলিসের কাজে অনেক ঝামেলা। চুনোপুটির কারবারই বেশি‌, রুই-কাৎলা কদাচিৎ মেলে। আবার মজা জানেন‌, ওই চুনোপুটিগুলোকেই ধরতে প্ৰাণ বেরিয়ে যায়‌, রুই-কাৎলা ধরা খুব শক্ত নয়।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তা বটে। ডাক্তারেরা বলেন শক্ত রোগের ওষুধ আছে‌, সর্দি-কাশি সারানোই কঠিন। তা-আপনার চারে যে-কাটি রুই-কাৎলা এসেছে তাদের সকলকেই আপনি খেলিয়ে ডাঙায় তুলেছেন নিশ্চয়।’

নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ উত্তর দিলেন না। ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া হাতের নলটি লইয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিলেন। তারপর ব্যোমকেশের দিকে একটি সুতীক্ষ্ণ কটাক্ষ হানিয়া বলিলেন‌, ‘সব মাছই ডাঙায় তুলেছি ব্যোমকেশবাবু্‌, কেবল একটি বাদে। আমার পুলিস-জীবনের শেষ বড় কেস। এই শহরেই ব্যাপারটা ঘটেছিল। কিন্তু কিনারা করতে পারলাম না।’

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘আসামী কে তা জানতে পেরেছিলেন‌, কিন্তু প্রমাণ পেলেন না?’

নীলমণিবাবু ঈষৎ দ্বিধাভরে বলিলেন‌, ‘একটা লোককে পাকা রকম সন্দেহ করেছিলাম‌, কিন্তু কিছুঁতেই তার অ্যালিবাই ভাঙতে পারলাম না। তারপর এমন একটা ঘটনা ঘটল যে সব ওলট-পালট হয়ে গেল। সত্যিকার আসামী যে কে সে সম্বন্ধে ধোঁকা আর কাটল না।’

‘ই’ বলিয়া ব্যোমকেশ আমার হাত হইতে নল লইল এবং তাকিয়ায় ঠেস দিয়া টানিতে লাগিল। নীলমণিবাবু ব্যোমকেশের উপর চক্ষু স্থির রাখিয়া গড়গড়ায় একটি লম্বা টান দিলেন‌, তারপর নল রাখিয়া দিয়া বলিলেন‌, ‘আপনি গল্পটা শুনবেন?’

ব্যোমকেশ উঠিয়া বসিল‌, বলিল‌, ‘বেশ তো‌, বলুন না। ভারি চমকপ্রদ গল্প হবে মনে হচ্ছে।’

‘চমকপ্রদ কিনা আপনি বিচার করবেন। আমি যা-যা জানি সব আপনাকে বলছি। হয়তো আপনি আসামীকে সনাক্ত করতে পারবেন।’ বলিয়া নীলমণিবাবু একটু হাসিলেন।

ইহা শুধু গল্প শুনাইবার প্রস্তাব নয়‌, ইহার অন্তরালে একটি চ্যালেঞ্জ রহিয়াছে। নীলমণিবাবু যেন ব্যোমকেশকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন-এস দেখি‌, তোমার কত বুদ্ধি প্রমাণ কর।

ব্যোমকেশ কিন্তু রণাহ্বান গায়ে মাখিল না‌, হাসিয়া বলিল‌, ‘আরো না না‌, আপনার মত অভিজ্ঞ পুলিস কর্মচারী যার কিনারা করতে পারেনি‌, আমার দ্বারা কি তা হবে? তবে গল্প শোনার কৌতুহল আছে। আপনি বলুন।’

আমরা নীলমণিবাবুর কাছে সরিয়া আসিয়া বসিলাম। তিনি পকেট হইতে একটা কোটা বাহির করিয়া এক চিমটি জন্দা মুখে দিলেন। পান নয়‌, শুধু জর্দাঁ। ইহাই বোধ হয় তাঁহার আসল Graft

তিনি গলা ঝাড়া দিয়া গল্প আরম্ভ করিবার উপক্রম করিতেছেন‌, বীরেনবাবু ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিলেন‌, ‘আর এক দফা চা হবে নাকি? মধ্যাহ্ন ভোজনের এখনো বিস্তর দেরি। বিয়ে-বাড়ির ব্যাপার–

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আসুক চা। এবং সেই সঙ্গে আর এক প্রস্থ তামাক।’

সম্মুখে চায়ের পেয়ালা এবং বাঁ হাতে গড়গড়ার নল লইয়া আমরা বসিলাম। নীলমণি মজুমদার তাঁহার স্বাভাবিক গম্ভীর গলায় গল্প বলিতে আরম্ভ করিলেন। —

 

Print Friendly
%d bloggers like this: