হ্যারল্ড পিন্টার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে নোবেল বিজয়ী নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের এই সাক্ষাৎকারটি নেন অ্যান্ডি বুল। ক্রিকেট ছিল পিন্টারের খুব ভালোবাসার ব্যাপার। এখানে তিনি তাঁর অতিপ্রিয় ক্রিকেট নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন।

‘আমার মনে হয় খোদা তাআলা এই পৃথিবীতে যা কিছু তৈরি করেছেন, ক্রিকেট তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ,’ এ রকমটাই একবার বলেছিলেন হ্যারল্ড পিন্টার, ‘আমার এক তিল সন্দেহ নেই, ক্রিকেট সেক্সেরও ঊর্ধ্বে। অবশ্য সেক্সও কিছু মন্দ নয় নিশ্চয়ই।’ তাই এটাই বোধ হয় সংগত যে তাঁর জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারের বিষয় হবে ক্রিকেট। এই সাক্ষাৎকারটি তিনি দিয়েছিলেন লন্ডনে নিজের বাড়িতে বসে। তখন ২০০৮ সালের অক্টোবরের প্রায় শেষ। তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল। তিনি তাঁর শৈশব নিয়ে খুব নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলেন। পূর্ব লন্ডনের হ্যাকনিতে অনেক দিন আগে ফেলে আসা শৈশব। তখন ঘোর যুদ্ধ চলছে। হঠাৎ হঠাৎ বিধ্বংসী বিমান-হামলা হচ্ছে। তাঁর দিন কাটছিল পলাতকের মতো। ‘যুদ্ধের মধ্যেই আমি প্রথম ক্রিকেট খেলা দেখলাম। একদিক থেকে দেখলে তখন আমরা সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বিমান-হামলা শুরু হলেই বাড়ি ছেড়ে পালাতে হতো। হাট করে খোলা দরজা। বড় বড় লাইলাক ফুলগাছের বাগান। পেছনের দেয়ালটা ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকত। এই সবকিছু ফেলে আমাদের আচানক ছুট দিতে হতো। অবশ্য তার আগ পর্যন্ত আমি কখনোই ক্রিকেট-ব্যাট ছুঁইনি।
‘ভোর পাঁচটার মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে যেতাম। তারপর ক্রিকেট খেলতে শুরু করতাম। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল মিক গোল্ডস্টেইন। এখনো ওকে আমরা মিক বলেই ডাকি। সে এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। হ্যাকনিতে সে আমার কাছেপিঠেই থাকত। আমাদের খুব কাছেই ছিল লি নদী। নদীর ধারে বেশ কিছু মাঠ ছিল। আমরা রোজ ভোরবেলা হেঁটে হেঁটে নদীর ধারে খেলতে যেতাম। জনহীন সুনসান মাঠ। অত ভোরে কাউকেই দেখা যেত না। মাঠের মধ্যে একটা গাছ ছিল। এই গাছটাকেই আমরা উইকেট হিসেবে ব্যবহার করতাম। ব্যাটিং আর বোলিংয়ের জন্য এই গাছটাকেই পালা করে কাজে লাগাতাম আমরা। নিজেদের তখন মনে হতো লিন্ডওয়াল, মিলার, হাটন আর কম্পটন। এই ছিল আমাদের জীবন।’
পিন্টারের পড়ার ঘর একজন ক্রিকেট ফ্যানের উচ্ছ্বাসে ভরা। দেয়ালের একদিকে তেলরঙে আঁকা তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সাদা জার্সি গায়ে চাপিয়ে তিনি লেগ-সাইডের দিকে ব্যাট চালাচ্ছেন। তাঁর শেলফটি ক্রিকেটবিষয়ক সংগ্রহের ভারে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। উইসডেন-এর সালতামামির ১৪৫টি সংস্করণই তাঁর বাড়িতে আছে। ম্যান্টেলপিসের (দেয়ালঘেঁষা একধরনের শেলফ, সাধারণত ফায়ারপ্লেসের ওপর থাকে—অনুবাদক) ওপর তিনি রেখেছিলেন গেইটিজের বেশ কিছু ফটোগ্রাফ আর স্মারক। গেইটিজ ক্লাবের এককালের অধিনায়ক ছিলেন পিন্টার। খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি এই ক্লাবের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। নিচে নামার সিঁড়ির দেয়ালে ডব্লিউ জি গ্রেসের অটোগ্রাফ ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা। তাঁর প্রিয় খেলোয়াড় অবশ্য ছিলেন ইংল্যান্ডের মহান লেন হাটন। পিন্টার তাঁর প্রিয় হাটনকে প্রথমবারের মতো দেখলেন ইয়র্কশায়ারে। তিনি তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ‘অল্প কিছুদিনের জন্য আমাকে লিডসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনো একটা খেলা দেখার সুযোগ মিলবে এ রকম ভেবে হেডিংলিতে গিয়েছিলাম। সেখানেই লেন হাটনকে পাকড়াও করে ফেললাম। উনি তখন সেনাবাহিনী থেকে ছুটিতে আছেন। প্রথম দর্শনেই আমি তাঁর জন্য ফিদা হয়ে গেলাম। সেই ঘোর আর কোনো দিনই কাটেনি। ইয়র্কশায়ারের ওপর আমার মায়া পড়ে গেল, সত্যি বলতে, শুধু হাটনের জন্য। এখন খুব অনুশোচনা হয়, আমি চাইলে তাঁর সঙ্গে আরও দেখা করতে পারতাম। কিন্তু আমি ছিলাম খুবই লাজুক ধরনের।’
পিন্টারের পরিবারে অবশ্য ক্রিকেট খেলার প্রচলন ছিল না। তাঁর বাবা খেলাধুলা থেকে দূরে থাকতেন। ‘খেলাটা সম্পর্কে আমি জেনেছি হ্যাকনি ডাউনস গ্রামারে (মূল নাম হ্যাকনি ডাউন স্কুল। গ্রামার স্কুল হিসেবে এই মাধ্যমিক স্কুলটি বিখ্যাত)। আমরা তখন সাধ মিটিয়ে খেলতাম। আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই ছিল ক্রিকেটের পাঁড় ভক্ত। এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছিল। একদিনের কথা মনে আছে। পড়ন্ত বিকেলবেলা। আমি রিজেন্টস পার্কের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে লর্ডসে যাচ্ছি। পথে একজন স্কুলছাত্রের সঙ্গে দেখা হলো আমার। সে লর্ডস থেকে ফিরছে, তার পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম। আমাকে দেখে সে চেঁচিয়ে বলল, “হাটন আউট!” আমার ওকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। সত্যিই। আমি হাটনকে দেখতে যাচ্ছিলাম—এটা ছিল আমার জন্য বিরাট এক উত্তেজনার ব্যাপার। বুঝতেই পারছেন, অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে আমার।’
শৈশবের পর তাঁর খেলাধুলার দিন তামাদি হয়ে গেল। তিনি আবার যখন খেলার মধ্যে ফিরলেন তত দিনে তিনি বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। ‘ষাটের দশক পর্যন্ত আমি আর খেলার ফুরসত পাইনি। এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। তখন আমি রোজ ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসতাম ওর নেট প্র্যাকটিসের জন্য। ওর বয়স তখন বড়জোর নয়। কোচিং দেখতে ভালো লাগত। হঠাৎ একদিন মনে হলো আমার, আরে! আমি নিজেই তো একটা নেটের বন্দোবস্ত করে ফেলতে পারি। সেই স্কুলের দিনগুলোর পর আমি আর খেলাধুলা করিনি, সেটা তো জানেন। পরের সপ্তাহেই সাদা জার্সি পরা কয়েকজনকে পেয়ে গেলাম। আমার সহকর্মীদের একজন ছিলেন ফ্রেড পেলোজি। তাঁর কাছ থেকে তালিম নিতে শুরু করলাম। উনি ছিলেন ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত, তবে মূলত তাঁকে ককনি (লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে বসবাসকারী ব্যক্তি) বলতে হবে। তিনি ছিলেন খুবই তুখোড় একজন ক্রিকেটার।
‘এর কয়েক সপ্তাহ পর পেলোজি একদিন আমাকে বললেন, “আমি যে ক্লাবের হয়ে খেলি, তুমিও সেখানে খেলছ না কেন?” রাজি হয়ে গেলাম। গেইটিজ ক্লাবে প্রথম ম্যাচে আমি খেললাম ব্যাটসম্যান হিসেবে, আমার মনে আছে। ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলাম। সতীর্থদের মধ্যে শুধু পেলোজিই আমার পরিচিত ছিলেন। বাদবাকি সবাই নতুন। ব্যাট করতে নেমেছি। একজন সতীর্থ বল নিয়ে ধেয়ে আসছেন। প্রথম বল। আমিও ঠিকঠাক ব্যাট চালিয়েছি। ব্যাটের ঠিক মাঝখানে বলটাকে স্ট্রোক করলাম। খুবই সুন্দর হলো শটটা। সোজা বলটা ছুটে গেল বোলারের দিকে। বোলার ক্যাচ ধরে ফেললেন। আমি প্রথম বলেই আউট। গেইটিজে আমার সূচনাটা এভাবেই হলো। কিন্তু আমি পিছপা না হয়ে ওদের সঙ্গে খেলা চালিয়ে গেলাম। শেষতক আমি ওদের ক্যাপ্টেন হয়েছিলাম।’
ক্রিকেট খেলার যে দিকটা তাঁকে খুব টানত, সেটা হলো এর নাটকীয়তার অসীম সম্ভাবনা। খেলার ভেতরে আরও কত রকম খেলা! ‘বড় বড় ম্যাচের মধ্যে নাটকীয়তা তো থাকেই। ছোট ম্যাচগুলোতেও নানা রকম নাটকীয় ঘটনা ঘটে,’ পিন্টার বলছেন, ‘আমি যখন আমার ক্লাবের হয়ে খেলতাম তখন প্রতিটা ঘটনাই ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর: স্লিপে কেউ একজন ক্যাচ মিস করেছে—এটা নিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যেত, বা এলবিডব্লিউর খুব ন্যায্য একটা আপিল আম্পায়ার খারিজ করে দিয়েছেন—সেটা নিয়ে হতাশা। যেখানেই আপনি খেলতে যান না কেন, সব জায়গাতেই ঘটনাটা একই রকম।’
পিন্টার অপেক্ষা করছিলেন আগামী গ্রীষ্মে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলবে, তিনি সেই খেলাটা দেখবেন। ‘আগে পেশাদারি ক্রিকেট প্রচুর দেখতাম। এখন আর তত পারি না। শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছে না। নড়াচড়া করতে অসুবিধা। কিন্তু একসময় এসব নিয়ে প্রচুর সময় ব্যয় করেছি। আর সত্যিই, এর থেকে ভালো কিছু হতেই পারে না। তিন বছর আগে আমার জন্য খুবই সৌভাগ্যের একটি ঘটনা ঘটেছিল। লর্ডসে খেলা দেখার জন্য আমি একটা বক্স পেয়েছিলাম। গত বছর আমি সেখানে গিয়েছিলাম আফ্রিকার খেলা দেখতে। আগামী বছর যখন অ্যাশেজ সিরিজ হবে, আমি তখন নিশ্চয়ই সেখানে থাকব।
‘আমি ঠিক জানি না খেলাটা আজকাল আগের মতোই আছে কি না। কিন্তু আমার কয়েকজন নাতি আছে। তারা ক্রিকেট ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। যখন তুষারপাত হয় তখনো তারা খেলে। তাই সত্যি বলতে খেলাটা এখনো খুবই জীবন্ত আমার কাছে। আমি বুঝতে পারছি সুযোগ-সুবিধাগুলো কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। খেলার মধ্যে অনেক রকম ছলচাতুরিও ঢুকে পড়েছে। তা ছাড়া পরাক্রমশালী ফুটবল দিয়েও অনেকে আচ্ছন্ন। কিন্তু আমার নাতিদের সেসব নিয়ে মোটেই ভ্রুক্ষেপ নেই। এখনো ওরা ভোর পাঁচটাতেই ঘুম থেকে ওঠে। তারপর ক্রিকেট খেলা শুরু করে দেয়। আমি যেমনটা করতাম একসময়, আমার শৈশবে।
‘ক্রিকেটের সবকিছু নিয়েই—ক্রিকেট খেলা, ক্রিকেট দেখা, গেইটিজের সঙ্গে থাকা—আমার জীবনের খুব কেন্দ্রীয় ব্যাপার, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’

গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর করেছেন পবন চক্রবর্তী
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১১

Share This