১৯৬৪ সালের পঁচিশে ডিসেম্বর এই অঞ্চলের প্রথম টেলিভিশন যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা ডিআইটি ভবনের প্রথম তলায় কয়েকটি রুম নিয়ে। ছোট্ট একটি টেবিলে বসে আছেন প্রথম ডিরেক্টর কলিম শরাফী, আরেকটি টেবিলে প্রধান ব্যক্তি জামিল চৌধুরী। কলিম শরাফী বললেন, ‘আব্বাসী এসেছ, ভালো হয়েছে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে তোমার সহযোগিতা চাই।’ বললাম, ‘আগে চা খাওয়ান।’ বললেন, ‘এখনো চায়ের বন্দোবস্ত হয়নি।’ ডাবের অর্ডার দেওয়া হলো। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে প্রথম গান গেয়েছিল ফেরদৌসী রহমান, সে ছবি রামপুরার আর্কাইভে শোভা পাচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রথম দিনের কলাকুশলী খালেদ সালাহউদ্দিন, পরিচালক মুস্তাফা মনোয়ার ও শতজনের ছবি টেলিভিশনের সুন্দর অভিযাত্রার ্নৃতি বহন করে চলেছে।
ঢাকা টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত একজন নগণ্য শিল্পী, পরিকল্পক ও উপস্থাপক হিসেবে অনেক ্নৃতি জমা পড়েছে। অনেক শিল্পী, প্রডিউসার, তাঁদের সহকারী ও কলাকুশলীকে আমরা বি্নৃত হয়েছি। দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ্নৃতি হাতড়াতে গিয়ে দেখি, অধিকাংশের নামই মনে করতে পারছি না, কত জীবন্তই না ছিলেন তাঁরা সেদিন, যাঁরা না হলে এই ভূখণ্ডে টেলিভিশনের অগ্রযাত্রা সম্ভব হতো না!
প্রথমেই বলি, সেই পুরুষটির কথা, যার চোখে ছিল বাংলা ও বাঙালির আঙ্গিকে টেলিভিশনের রূপায়ণ। তাঁকে দেখেছি কাছ থেকে। ঢাকা টেলিভিশনের প্রতিটি কাজ, দলিল, চেক, চিঠিপত্র প্রথম দিন থেকে বাংলায়, অন্য কোনো ভাষায় নয়, আজ পর্যন্ত। পরিকল্পনাটি যাঁর তিনি মৃদুভাষী, কঠিন বাস্তবায়নকারী কর্মী-পুরুষ জামিল চৌধুরী। যা তাঁর কর্মপরিধির মধ্যে নয়, সেখানে মাথা গলাননি, সেসব দিয়েছেন কলিম শরাফীর কাঁধে। কলিম শরাফী অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করতেন, বাস্তবায়নে তাঁর মেধা পরিশ্রম ও পরিকল্পনা দিয়েছেন আরেকজন, যাঁর নাম টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে, থাকবে চিরদিন-মুস্তাফা মনোয়ার। নাটকে প্রথম দিন থেকেই যিনি বাংলাদেশে ও বাংলাভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন, তিনি আতিকুল হক চৌধুরী। টেলিভিশনের অগ্রযাত্রায় যাঁরা শ্রেষ্ঠ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন মুস্তাফা কামাল সৈয়দ, মুস্তাফিজুর রহমান, বরকতউল্লাহ, ফরিদুর রেজা সাগর, ম· হামিদ, আলী ইমাম, খ· ম· হারুন, আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম, মুসা আহমেদ, কামরুননেসা হাসান, শহীদা আরবী, বদরুননেসা আবদুল্লাহ, কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী, কেরামত মওলা, রিয়াজউদ্দিন বাদশা। অনেকের নাম মনে পড়ছে না। ক্যামেরাম্যানদের মধ্যে ছিলেন গোলাম মুস্তাফা, সহযোগী ছিলেন ২০ জন, তাঁরা এখন অবসরে। লাইনম্যান ৫০ জন, স্টুডিও সহকারী ৫০ জনের কথা মনে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরও অনেক ইঞ্জিনিয়ার। কী গভীর আগ্রহের সঙ্গে সুদীর্ঘকাল তাঁরা টেলিভিশন চালিয়েছেন, ভাবলে অবাক হতে হয়! কী বা এমন বেতন, নির্বিঘ্নে দুপুর আর রাতের আহারের জন্য একটি ভালো রেস্টুরেন্টও ছিল না, এখনো নেই। কাজের পরিবেশ যদিও উন্নত, রুমে সুশীতল বাতাস, মাথার ওপর ফ্যান, বেল টিপলে আরদালি, চা, শিঙাড়া; নতুন প্রযোজকেরা এসে যোগদান করছেন নাটকে, সংগীতে, নৃত্যে, আলোচনা ও নানা অনুষ্ঠানে। সব মিলিয়ে এ এমন এক সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ যার পুরোপুরি ইতিহাস রচনা করার মতো যোগ্য ব্যক্তি কমে যাচ্ছে এবং ক্রমেই কাজটিকে দুরূহ হয়ে উঠছে।
এর মধ্যে স্কেচের মতো দু-একটি ছবি এঁকে যাই।
গজলের পরাক্রান্ত গায়ক মেহেদী হাসান সারা সকাল রিহার্সাল দিয়েছেন তবলা, সারেঙ্গী, বেহালা, তানপুরার সঙ্গে। দুপুরে খাওয়া হয়নি, সালাত হয়নি। আমাকে দেখে বলে উঠলেন, ‘ওহে আব্বাসী, কিছু খাবার পাঠাও জিএমের রুমে। ওখানেই জোহর, আসর ও মাগরিব সারছি।’ মেহেদী হাসান আমার পুরোনো বন্ধু, সেই করাচি থেকে, সেখানে একসঙ্গে আমরা গান গাওয়া শুরু করি। জানি, কী তার পছন্দ। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই কাবাব, পরোটা ও গরম চা প্রস্তুত। পরের অনুষ্ঠানটি চলল রাত দুটো পর্যন্ত। তার গান, পিকচারাইজেশন ও মাঝপথে চুটকি হাসির কথাবার্তা কী যে ভালো লেগেছিল, বলে বোঝানো যাবে না। একবার বললেন, আমার গলাটা প্রায় মেহেদী হাসানের মতোই। দেখো না কী মিষ্টি খেলছে, হারমোনিয়াম সংগতকারী আবদুল করিমকে বললেন, ‘ওর মতো কাজ দিতে পারছ না তো হে?’ জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি তো নিজেই মেহেদী হাসান, তাহলে কণ্ঠটি তো তোমার মতোই হবে।’ বললেন, ‘না হে আব্বাসী, তা নয়। গত পরশু আমার কণ্ঠটি ছিল সত্যিকার মেহেদী হাসানের, আজ তার ভগ্নাবশেষ।’ কী অমল স্বীকারোক্তি! এমনটি প্রায়ই হয়ে থাকে কণ্ঠশিল্পীদের বেলায়। রেকর্ডিংয়ের দিন হয়তো কণ্ঠটি তেমন খুলল না। মান্না দের জীবনের জলসাঘর যাঁরা পড়েছেন, কথাটি কতটা সত্য আরও বেশি বুঝতে পারবেন।
আবদুল আলীমের কথা বলি। শত অনুষ্ঠানে তাঁর উদার কণ্ঠের বি্নৃতি। আমি সহশিল্পী, কখনো উপস্থাপক, কখনো প্রশ্নকারী। একদিন ‘ছাড়িলাম হাসনের নাও রে’ গাইতে গিয়ে তাঁর সুর আরও অপরূপের দিকে ছুটে চলেছে। গানটির সুরকার আমি, বললাম, ‘চাচা, এমনটি হবে না।’ মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠে খেলে গেল আমার শেখানো সুরটি। আবদুল আলীম শত শত গান গেয়েছিলেন এই বিটিভির পর্দায়, অথচ সংরক্ষণ করা আছে মাত্র একটি।
আবদুল আলীমের শেষ অনুষ্ঠানটির কথা বলি। বললেন, ‘গলাটি ভালো নেই, সারা রাত গান গেয়ে এসেছি, সকালে নাশতাও ভালোমতো করতে পারিনি।’ এর পরও তিনি যে গান গাইলেন তা এককথায় দিগ্বিজয়ী। যাঁর প্রতিভা আছে, সব আছে তাঁর; জীবনে, মৃত্যুর পরও।
বলি ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খানের কথা। ডিআইটি স্টুুডিওতে এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। আমি তাঁর ছাত্র। অথচ আজ অনুষ্ঠানে আমি উপস্থাপক। প্রোগ্রামের নাম আপন ভুবন। ওস্তাদজির গলা শাসন মানছে না। বারবার গলাটাকে পরিষ্কার করার পর যখন কিছুতেই কিছু হবার নয়, তখন পকেট থেকে বার করলাম আদাকুচি। বললাম, ‘ওস্তাদজি, এস্তেমাল কিজিয়ে।’ মুহূর্তে গলা পরিষ্কার। ওস্তাদজি গেয়ে উঠলেনঃ ‘গরজে গরজে বরসা নেকো/বুঁদরিয়া বরসানা লাগি’।
‘মিয়াকি মালহারে’ আমির খসরুর বন্দেশে অপূর্ব চালটি টেলিভিশন ভবনে নিয়ে এল আষাঢ়ের দুরন্ত হাওয়া। ভুলব না আধো বাংলা আধো উদুêতে বলা ওস্তাদজির ফেলে আসা জীবনের নানা কাহিনী। সঙ্গে পুত্র ইয়াসিন আলী খানের দরদি পরিবেশনা। ইয়াসিন পিতার কণ্ঠের যোগ্য উত্তরাধিকার, আমার সমবয়সী, বলল, ‘তুমিও গলাটা খেলাও না কেন?’ বন্দেশটি শিখেছিলাম ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর কাছে। তানপুরা ছেড়ে আকাশে কালো মেঘের সঙ্গে মিতালি করে গাইতে বসি ‘ন্‌ধন্‌সা, রপামাপাগা, রগারসা’। ভেসে আসে ডিআইটির মাতাল হাওয়ার সঙ্গে ওস্তাদজি, ইয়াসিন খান ও ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর ্নৃতি।
সেসব কি রেকর্ডে আছে? ৩০ বছরে বিটিভির প্রায় ৫০০ লোকসংগীতের অনুষ্ঠান আমি উপস্থাপনা করেছি-আপন ভুবন, আমার ঠিকানা, ভরানদীর বাঁকে, লৌকিক বাংলা ইত্যাদি। দু-চারটি হয়তো কোথাও পড়ে থাকবে। আমরা নিষ্ত্র্নান্ত হওয়ার পর খোঁজ হতেও পারে। ছিলাম তো বহুদিন, সহস্র গান ও শিল্পীদের উপস্থাপন করেছি। নদীর স্রোতের মতো ভেসে গেছে সেই সুর, কোনো দিন তা শুনতে পাবে না দেশের মানুষ।
যদি এমনটি হতো, টেপগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে, তাহলে তরুণ বাবরি চুলের আব্বাসীর সঙ্গে দেখা যেত দোতারার জাদুকর কানাইলাল শীলকে। তাঁর এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান করেছিলাম এই স্টুডিওতেই। সঙ্গে ছিল তাঁর মেজো ছেলে অবিনাশচন্দ্র শীল। কানাই শীল বললেন, ‘বাবা, আমি তো গাইতে পারি না, টোকাগুলো দিই, আপনি গেয়ে শোনান।’ গাইলাম কত গান, যার একটি, ‘ঐ না মাধবী বনেতে বন্ধু ছিল, সই লো, বন্ধু আমার কোন বনে লুকাইল’। পিতার শ্রেষ্ঠ গানগুলো তো কানাইলাল শীলের সংগ্রহ ও সুরারোপিত। এই বিচ্ছেদি গানগুলো আমি আমার জীবনের চেয়েও ভালোবাসি। কারও মতে, গানগুলো আমি ভালো গাই। হবেও বা। কানাই শীল অন্তর্হিত হলেন ‘আপন ভুবনে’র পর্দা থেকে, অথচ কত সহজেই তাঁকে শতাব্দীর পর শতাব্দী বন্দী করে রাখতে পারতাম, সামান্য টাকা দিয়ে আর্কাইভে যদি ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সংগ্রহ করে রাখতাম। বিগত পাঁচ বছর কুয়ালালামপুরে ‘এশিয়ান মিডিয়ান সামিটে’ আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধি। পরিকল্পনার অভাব আর অর্থাভাবে টেলিভিশনের শত অনুষ্ঠান ডিজিটাইজ করতে পারিনি। আগামী প্রজন্ম দেখতে চাইবে পালা গানের গায়ক আব্দুল মজিদ তালুকদারকে, জারি গানের পরাক্রান্ত গায়ক ঝালকাঠির আবদুল গনিকে। নানা অনুষ্ঠানে দেখতে চাইবে শামসুর রাহমানকে; আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সৈয়দ আহমদ হোসেন, সেলিনা বাহার জামান, গোলাম মুস্তাফা, ফজল শাহাবুদ্দিনকে। নাটকে শত শিল্পী, যাঁদের মধ্যে মানুষের মনের মনে আশ্রয় করে নিয়েছেন আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকের, লাকী ইনাম-কত নাম বলব?
ফজলে লোহানী একটি সুন্দর অনুষ্ঠান করতেন। সবাই অপেক্ষা করতেন, উপভোগ করতেন তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। সমাজের নানা স্তর থেকে তুলে আনতেন উপস্থাপিত ব্যক্তিদের। ফজলে লোহানীর পরে হানিফ সংকেত অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন। এখনো তাঁর অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয়। তেমনি উপভোগ্য আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উপস্থাপিত অনুষ্ঠানগুলো। তাঁর সুন্দর শব্দচয়ন, মনোহর বাচনভঙ্গি ও সুহাসিত বাক্যাবলি ছিল টেলিভিশন দর্শকদের বিশেষ আকর্ষণের বস্তু। তিনি একেকটি অনুষ্ঠানের জন্যে যথেষ্ট সময় ব্যয় করতেন। সজনে বিজনে অনুষ্ঠানে শতশিল্পীকে পরিচয় করিয়ে দেন সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোরশেদ। আপনার ডাক্তার অনুষ্ঠানটি চমৎকার উপস্থাপনা করতেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
সাহিত্যের অনুষ্ঠানগুলো জমজমাট হতো মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দিন, মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ প্রমুখের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে। মওলানা আমিনুল ইসলাম, মওলানা মোজাম্মেল হক ইসলামের নানা সুন্দর উপস্থাপনায় পরিবেশন করতেন ধর্মকে। নতুন কুঁড়ি একটি নতুন চিন্তার ফসল, শত নতুন শিল্পী কুঁড়ি মেলেছে এই অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ আজ সেসব শিল্পীর পদচারণে মুখর। বিতর্ক অনুষ্ঠানগুলো অনেক নতুন তার্কিকের জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞানের অনুষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে কম্পিউটার প্রযুক্তির নানা অনুষ্ঠান যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
মুস্তাফা মনোয়ার যখন কেউ কিসস্যু বলতে পারে না নাটকটি রিহার্সাল করতেন অথবা রক্তকরবী নাটকের স্টেজ যখন তৈরি হচ্ছে রামপুরার স্টুুডিওতে, দেখেছি কী গভীর অনুরাগের সঙ্গে নাটকের সংলাপ বুঝিয়ে দিচ্ছেন দিলশাদ বেগমকে। টিভির সিরিয়ালগুলো যখন চালু হলো, সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। গভীর আগ্রহের সঙ্গে শ্রোতা-দর্শক দেখতেন হুমায়ূন আহমেদ ও মমতাজ হাসানের লেখা নাট্যানুষ্ঠানগুলো। তখন খুব জনপ্রিয় হন আসাদুজ্জামান নূর। কলকাতায় গিয়ে দেখি শত ভক্ত ‘খালামণি’ ফেরদৌসীর সান্নিধ্যপ্রত্যাশী। বাংলাদেশের অনুষ্ঠান তখন কলকাতায় দেখা যেত। এখন দেখা যায় না। নৃত্যের তালে তালে অনুষ্ঠানটি পাকিস্তানে অপর অংশে ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ সেখানে তো নাচ বলে কিছুই ছিল না। ক্রমে গওহর জামিল, জি এ মান্নান, রাহিজা চৌধুরী, জিনাত বরকতউল্লাহ নৃত্যের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বিটিভি ছিল একমাত্র প্রতিষ্ঠান যাকে ঘিরে নৃত্য আজকের এই নতুন পর্যায়ে এসেছে।
রবীন্দ্রসংগীতের মূল্যায়নে টেলিভিশনের ভূমিকার পেছনে ছিল জামিল চৌধুরী, কলিম শরাফীর পরিকল্পনা। ছিলেন প্রথম ক্ষণের শিল্পীরা, যাঁদের কথা কেউ মনে রাখেনি। কাজী শাহজাহান হাফিজ, জাহেদুর রহিম, ফজলে নিজামী, মালেকা আজিম খান, আফসারী রহমান, বিলকিস নাসিরউদ্দিন, চৌধুরী আবদুর রহিম স্টেজ আলো করে থাকতেন তখন। প্রথম দিনের লোকসংগীত শিল্পীরা ছিলেন বেদারউদ্দিন আহমেদ, আবদুল লতিফ, রঙ্গলাল দেব চৌধুরী, গণি মিয়া, নুরুদ্দিন আহমেদ, শেখ গোলাম মোস্তফা, আব্দুল মজিদ তালুকদার। আরও কত বি্নৃত নাম। মনে পড়ছে কাফি খান, গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ হাসান ইমামের গাঢ় কণ্ঠস্বরের আবৃত্তির কথা।
একদিন কাজী নজরুল ইসলামের সুপুত্র কাজী সব্যসাচী রামপুরার টিভি স্টেশনের ওয়েটিং রুমে প্রতীক্ষা করছেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘দেখ তো তুলু, দুঘণ্টা ধরে বসে।’ তাড়াতাড়ি ভেতরে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ালাম। তাঁর আবৃত্তি অনুষ্ঠান চলল দুই ঘণ্টা। টেলিভিশনের পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানে গিয়েছি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়সহ নামকরা শিল্পীরা এসেছিলেন পাকিস্তান ও ভারত থেকে। গভীর রাত পর্যন্ত হাজার শ্রোতা সেই অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন। ভাগ্য ভালো, তার কয়েকটি টেপ এখনো সংগ্রহে আছে।
বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে অনুষ্ঠান করতে যাই, শতজন দেখা করতে আসেন। ‘ক্রাউড’ সামলানো ঝক্কি। এমনও হয়েছে, আমাদের পুরো দলকেই ভূরিভোজনে আপ্যায়িত করেছে গ্রামের মানুষ; কখনো তুলে দিয়েছে ক্ষেতের বেগুন, লাউ, উচ্ছে, ঢ্যাঁড়স, কত কী সবজি। একবার এক গ্রামে এক ডাক্তারের দেখা পাই, ধন্বন্তরি যেন, এক দিনেই আমার পায়ের ব্যথা সারিয়ে দিয়েছেন। ভরা নদীর বাঁকে ও লৌকিক বাংলার কল্যাণে অন্তত ২০ হাজার চিঠি পেয়েছি। সুলিখিত, সুচিন্তিত ও সুমার্জিত চিঠি। কেন? শুধু লোকসংগীতের কল্যাণে। এই তো আমার পারিশ্রমিক। রংপুরের গিয়ে লাফা শাক ও বৈরালী মাছ খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। বিশাল বাহিনীকে কখনো ফিস্‌ট খাইয়েছি, কখনো নাশতা।
প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট টেলিভিশন ভবনে আসার কথা হলে দু-তিন দিন আগে থেকে ধোয়া-মোছা চলত। সবাই তটস্থ। বারবার অনুমতিপত্র চেক করা হচ্ছে। গেটম্যান চিনত বলে আমাদের অসুবিধা হতো না।
টেলিভিশনের প্রডিউসারদের কাছ থেকে পেয়েছি ভালোবাসা ও সন্তর্পণ সহযোগিতা। সন্তর্পণ কেন? কারণ এটি সরকারি মাধ্যম। সরকার বদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রডিউসাররাও শঙ্কিত হন, তাঁদের কাজের স্বাধীনতা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ওঁরা তো কর্মচারী, নিয়ামকেরা যা বলবেন মেনে নিতে হয়। এ বিষয়ে জনাব আসফউদ্দৌলা একটি বড় কমিশনের নেতৃত্ব দেন, সমস্যাগুলো সমাধানের ইঙ্গিত ছিল সেখানে। অন্তত কোথাও শুরু করা গেলে আজ একটি ভালো জায়গায় পৌঁছনো যেত।

–মুস্তাফা জামান আব্বাসী
সূত্রঃ প্রথম আলো, জুন ১২, ২০০৯