স্বপ্নদল প্রযোজিত নাটক ‘হরগজ’ টর্নেডোবিধ্বস্ত একটি জনপদের গল্প সেলিম আল দীনের হরগজ। নাটকটি প্রথম মঞ্চে এনেছিল ঢাকা থিয়েটার। সেলিম আল দীন নিজেও এ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সম্প্রতি স্বপ্নদলের প্রযোজনায় এটি আবার মঞ্চে এসেছে। সেলিম আল দীনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে হরগজ-এর পটভূমি ও স্বপ্নদলের প্রযোজনা নিয়ে লিখেছেন তাঁর স্ত্রী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা সেলিম

সেলিম আল দীনের বর্ণনাত্মক নাট্যধারার মধ্যে একটি ব্যতিক্রমধর্মী নাটক হরগজ। ১৯৮৯ সালে টর্নেডো মানিকগঞ্জের হরগজ নামক জনপদটিকে বিরানভূমিতে পরিণত করে। ঝড়ের প্রচণ্ডতা ও ভয়ংকর সব ঘটনা নাট্যকারকে বিচলিত ও স্তম্ভিত করে। ঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞ আকৃতির জগৎকে কীভাবে নিরাকৃতির ভুবনে পরিণত করে, তার-ই কাহিনি নিয়ে নাটকটি রচিত।
হরগজ নাটকে দেখা যায়, একদল ত্রাণকর্মী নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টর্নেডোবিধ্বস্ত গন্তব্যে পৌঁছে নানা অপ্রত্যাশিত ও অস্বাভাবিক ঘটনা দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে। সেখানে যেন এক মহাপ্রলয় ঘটে গেছে। একসময় ত্রাণকর্মীদের প্রধান আবিদ ওই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে খণ্ডিত মানবদেহের অঙ্গ-উপাঙ্গ দেখে মর্মাহত ও হতবিহ্বল হয়ে ওঠে। হরগজ জনপদে মানুষের জীবনের এমন অপচয় প্রত্যক্ষ করে প্রাচ্যবোধে তাড়িত আবিদ ব্যক্তির শোককে সমষ্টির শোকরূপে অনুধাবন করে কিংবা সব মানবকে আপন আত্মীয়জ্ঞানে উন্মাদপ্রায় হয়ে পড়ে।
হরগজ নাটকে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনা অতিপ্রাকৃত কিংবা অলৌকিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা বাস্তব ও তথ্যনির্ভর। হরগজে টর্নেডোর পর প্রতিদিনই আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন সংগঠন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে হরগজে যেত। ফিরে এসে তারা অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ও অভিজ্ঞতার কথা সেলিম আল দীনকে বলত। সংবাদপত্রেও তিনি বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ পড়েন। পুরো বিষয়টি নিয়ে তিনি আশ্চর্যান্বিত ও আলোড়িত হন।
আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক। সেলিম আল দীন বিষয়টি নিয়ে নাটক লেখার মনোবাসনা ব্যক্ত করলে আমার এক ছাত্রের মাধ্যমে হরগজে মৃত ব্যক্তিদের তালিকা এবং কীভাবে তারা মৃত্যুকোলে পতিত হয়েছিল, তার একটি বিবরণ সংগ্রহ করে দিই।
ভূমিকাটি করা গেল স্বপ্নদল প্রযোজিত হরগজ নাটকটির প্রযোজনা প্রসঙ্গে দু-একটি কথা বলতে গিয়ে।
হরগজ নাটকটি প্রথমে ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় সুইডিস ইয়াম বার্গসস্ট্যান্ড ও হুমায়ূন কবির হিমুর যৌথ নির্দেশনায় মঞ্চে আসে। সম্ভবত তখন দুটি প্রদর্শনী হয়েছিল। দুর্ভাগ্য ওই প্রযোজনা আমার দেখা হয়নি। নাট্যকারের মৃত্যুর পর ঊনষাটতম জন্মজয়ন্তীতে ঢাকা থিয়েটার আয়োজিত উৎসবে কলকাতার স্বপ্নসন্ধানী এ নাটক শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মঞ্চে উপস্থাপন করে। ওরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে, কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্বরভঙ্গি ও উচ্চারণে পূর্ববঙ্গের ভাষার স্বাদ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের ধারায় বাংলা বর্ণনাত্মক উপস্থাপনরীতিও এ নাট্যদলের অনিষ্ট ছিল না। তবু তারা হরগজের মতো একটি নাটক প্রযোজনা করায় অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
স্বপ্নসন্ধানীর মঞ্চায়ন দেখার পর জাহিদ রিপনের নির্দেশনায় স্বপ্নদল নাটকটি মঞ্চে আনে। সেলিম আল দীনের ৬০তম জন্মবার্ষিকীতে ঢাকা থিয়েটার ও শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত উৎসবের উদ্বোধনী দিনে হরগজের উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয় শিল্পকলা একাডেমীতে। পরে স্বপ্নদল একটি দলের আমন্ত্রণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে নাটকটি পরিবেশন করলে প্রযোজনাটি প্রথম আমি দেখি। তবে হরগজের বিষয়বস্তুর সাপেক্ষে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে মঞ্চায়নের কারণে সে প্রদর্শনীতে নাটকটির পূর্ণ মঞ্চাবয়ব খানিকটা ব্যাহত হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। এরপর নাট্যকারের ৬১তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে স্বপ্নদল ও শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ‘সেলিম আল দীন জন্মোৎসব ২০১০’-এ শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটি দ্বিতীয়বার দেখি। এ প্রদর্শনীতে কিছু জায়গার ভুলত্রুটি বাদ দিলে দেখতে পূর্বাপেক্ষা অনেকখানি ভালো লাগে। তবে স্বপ্নদল ঘোষিত বছরব্যাপী ‘স্মরণে নাট্যভাষে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন’ শিরোনামে দেশজুড়ে অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে ‘ফরিদপুর সেলিম আল দীন স্মরণোৎসব উদ্যাপন পরিষদ’-এর সহযোগিতায় ৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে স্বপ্নদল ফরিদপুরের জসীমউদ্দীন হলে হরগজের পরপর দুটি প্রদর্শনী করে। আমার সে প্রদর্শনী দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। দুটি প্রদর্শনীতে হলভর্তি দর্শক পিনপতন নীরবতায় নাটকটি উপভোগ করেন এবং নাট্য উপস্থাপনা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রদর্শনী শেষে বাইরে রাখা মন্তব্য খাতায় তাঁদের তাৎক্ষণিক এ প্রতিক্রিয়া তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যক্ত করেন। আমি সে সময় সেলিম আল দীনের নাটক বিষয়ে দর্শকদের আগ্রহ দেখে সত্যিই মুগ্ধ হই!

২.
স্বপ্নদলের হরগজ প্রযোজনায় অভিনয়ে সবাই মোটামুটি সাবলীল। নাটকের অভিনয়শিল্পীরা সবাই বয়সে নবীন হলেও তাঁদের চেষ্টার ভেতর তেমন কোনো ত্রুটি চোখে পড়ে না। অনেকের ভেতরে বিপুল সম্ভাবনার বীজ বিকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, তা সহজেই প্রকাশিত হয়। অভিনয়ে যতটুকু দুর্বলতা রয়ে গেছে তা অচিরেই তাঁরা কাটিয়ে উঠবেন বলে আমার বিশ্বাস। প্রযোজনায় কিছু কিছু ঘটনার মঞ্চায়ন চমৎকার। যেমন—কবন্ধ দেহের হাতের মুঠোর ভেতর থেকে বীজ ধান ছড়িয়ে পড়া, স্কুলে ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের কলগুঞ্জন-খেলা-ছড়া আবৃত্তি, কাফনের বিবৃতি-স্বগতোক্তি, মসজিদে জিনের উপস্থিতি, কণ্টকবিদ্ধ রুমুনির বিলাপ, আর্তনাদ ইত্যাদি। মঞ্চসজ্জা সাধারণ কিন্তু টুকরো ডালপালা, কাপড়ের টুকরো, চট প্রভৃতি ব্যবহার করে বিধ্বস্ত জনপদের যে চিত্র আঁকা হয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। সাদা মশারির কাপড় ব্যবহার করে উত্তাল নদী ভাঙনের দৃশ্যটিও মন্দ নয়। আলোকসম্পাত যথার্থই পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। পোশাক পরিকল্পনা যথাযথ বলা যায়। আবহসংগীত সুললিত, কোরিওগ্রাফি দৃষ্টিনন্দন। আর টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রে সত্যিই যত্নশীলতার পরিচয় বিদ্যমান। সব মিলিয়ে নির্দেশকের পরিশ্রম সার্থক বলতে হবে।
অনেকের ধারণা, সেলিম আল দীনের নাটক দুর্বোধ্য, কঠিন। কথাটা ঠিক নয়। মূলত নাট্যদল ও দর্শক তাঁর নাটকের দর্শন, শিল্পচেতনা, নন্দনতত্ত্ব, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, বক্তব্য ইত্যাদি বিষয় বোঝার ও এর গভীরে পৌঁছার কতখানি চেষ্টা করল, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনুধাবনের চেষ্টা থাকলে তাঁর নাটকের রসাস্বাদন মোটেও কঠিন ব্যাপার নয় বরং তা হয়ে ওঠে অনির্বচনীয় আনন্দের বিষয়। সমুন্নত, ওজস্বী ও গুরুগম্ভীর কোনো নাট্যের বিষয়কে যদি একেবারেই সহজবোধ্য করে পরিবেশন করা হয়, তবে সে শিল্পের শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয় বৈকি! হরগজ মঞ্চায়নের মাধ্যমে স্বপ্নদল দেখিয়েছে যে সেলিম আল দীনের নাটক নবীনেরাও অনুধাবন করতে পারে, প্রযোজনা করতে পারে!
প্রযোজনা প্রসঙ্গে এ কথা বলা যায়, স্বপ্নদল এখন হরগজ মঞ্চায়নে অনেকটাই পরিশীলিত। শ্রম-একাগ্রতা-নিষ্ঠা-অনুশীলনের সমন্বয় ঘটলে এবং উপযুক্ত পরিচর্যায় একটি কঠিনতম নাটকও যে ক্রমান্বয়ে কতটুকু ঋদ্ধ হয়ে ওঠে এবং সফলতার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে দর্শকদের হূদয় অতিক্রমে সক্ষম হয়, তারই উজ্জ্বল প্রমাণ স্বপ্নদলের হরগজ।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ১৪, ২০১০

Share This