প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীর ৪ আষাঢ়, ১৪১৭ সংখ্যায় নাজমীন মর্তুজার ‘বাংলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার প্রেরণা’ শীর্ষক প্রতিক্রিয়া বিষয়ে লিখতে হচ্ছে। কেননা ইতিহাস রচনার এই প্রেরণাটি ঠিক কী লেখাটি পড়ে তা বোঝা গেল না। তদুপরি, লেখাটিতে এমন কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে যা থেকে ভুল ধারণা সৃষ্টির অবকাশ আছে।
নাজমীন মর্তুজা আমার আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া থেকে গ্রন্থনামের ‘অলিখিত’ শব্দটিকে আমার প্রধান আপত্তির জায়গা হিসেবে বুঝেছেন। আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ায় বাংলা সাহিত্যের অলিখিত ইতিহাস গ্রন্থের লেখকদের বিভিন্ন প্রস্তাবনা, দাবি, তথ্য এবং গ্রন্থ-পরিকল্পনার পেছনে থাকা তত্ত্বীয় প্রেক্ষিত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের খাতিরে এবং উদ্দেশ্য স্পষ্টতই ডিসকোর্সটিকে যৌক্তিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানো। সেখানে নাজমীন মর্তুজা প্রধান বা গৌণ আপত্তি খুঁজে পান কী করে? যেসব প্রসঙ্গে এবং যে ধরনে প্রতিক্রিয়াকার ‘আপত্তি’ কথাটিকে ব্যবহার করেছেন তাতে কথাটি নৈর্ব্যক্তিকতা নয় বরং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের অর্থ বহন করেছে। এমন শব্দ প্রয়োগ যুক্তি-জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রকে অবশ্যই আড়াল করে।
বলেছিলাম, সাহিত্যের ইতিহাস অলিখিত থাকবার প্রসঙ্গটি আসে পেছনে থাকা একটি প্রস্তাবনার সাপেক্ষে, যে প্রস্তবনা নিজেই বিতর্কের অধীন। সেই বিতর্কের দিকে নাজমীন মর্তুজা যাননি। প্রশ্নটি তোলা হয়েছিল গ্রন্থের প্রথমবারের আলোচনার গোড়াতেই যে সাহিত্য নিয়ে পরিবেশনাশিল্প কেন সাহিত্যের ইতিহাসের অন্তর্গত হবে? অর্থাৎ পরিবেশনা-শিল্পের আলাদা ইতিহাসের সঙ্গে তাকে যুক্ত না করে কেন সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সংজ্ঞার দিক থেকে তো পরিবেশনাশিল্প ও সাহিত্য এক বস্তু নয়। ওই যৌক্তিক বিতর্কের দিকে নাজমীন মর্তুজা অগ্রসর হননি। বরং অলিখিত ইতিহাস লিখতে বসার কারণ হিসেবে দেখালেন প্রচলিত ইতিহাস পাঠে তাদের তৃপ্ত হতে না পারাকে। এই তৃপ্তিদায়কতা খুবই ব্যক্তিগত জিনিস। এ রকম বিষয়ীনির্ভরতা দিয়ে তাঁরা যেমন নিজেদের দায় এড়ালেন তেমনি বিষয়ীব্যঞ্জক শব্দ ‘আপত্তি’ চাপিয়ে দিলেন আমার উপরেও। তাহলে যুক্তি-জিজ্ঞাসার জায়গাটি থাকল কোথায়?
নাজমীন মর্তুজার অভিযোগ, আমার আলোচনায় পথিকৃৎ ইতিহাসকারদের রচিত ইতিহাস গ্রন্থের পরিপ্রেক্ষিতকে বিবেচনায় আনা হয়নি। বোঝা যায়, এমন একটা উপলব্ধি তাঁর হয়েছে আমার উত্থাপিত প্রশ্নগুলোকে একদম ধরতে না পারা কিংবা খুবই উপরিতল থেকে দেখার কারণে। প্রশ্নটি ছিল, কোন তত্ত্বীয় প্রেক্ষিতে পরিপূরকতার কারণটি সৃষ্টি হয়েছে? এই প্রশ্নে পরিপূরকতার বিষয়টি ভুলে যাওয়া হলো কী করে? আসলে আগাগোড়াই আমার বিবেচনায় ছিল বিষয়টি। গোল বেধেছে যখন নাজমীন মর্তুজা দাবি করলেন, ‘প্রতিটি পরিবেশনার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস গ্রন্থমধ্যে নিশ্চিতভাবেই আছে।’ এমন একটা দাবির পর দেখা গেল অন্তত গীতিকা, কিচ্ছা, কিচ্ছাপালা কিংবা কিচ্ছাগানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস গ্রন্থটিতে নেই। নাজমীন মর্তুজা এবার ওই সামগ্রিকতার দাবি থেকে সরে এলেন। নিজেদের গ্রন্থকেই একবার সামগ্রিক বলে পুনর্বার পরিপূরক বলাটা স্ববিরোধী। অথচ সহলেখক হিসেবে নাম আছে এমন একটা গ্রন্থ সম্পর্কে নাজমীন মর্তুজার স্বচ্ছ ধারণা থাকাটা ছিল বাঞ্ছনীয়। যদিও তিনি দাবি করেছেন পথিকৃৎ ইতিহাসকারদের রচিত প্রচলিত অন্য প্রায় সকল গ্রন্থ তাঁর পড়া আছে।
লিখিত ও মৌখিক যেকোনো রকম সাহিত্য ব্যতিরেকে নিছক পরিবেশনার অস্তিত্ব যে আছে প্রতিক্রিয়াকার তা খুব গুরুত্বের সঙ্গে ও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এই জ্ঞানবিস্তার করতে গিয়ে তাঁকে মূল প্রসঙ্গ থেকে আমার বক্তব্যটিকে সরিয়ে নিতে হয়েছে কয়েক প্রস্থ দূরে। কথাটির প্রসঙ্গ ছিল, সাহিত্যনির্ভর পরিবেশনা নাকি পরিবেশনানির্ভর সাহিত্য? অর্থাৎ এই দুইয়ের ভেতর যোগসূত্রের জায়গাটি ঠিক কী রকম? তারা কি একাঙ্গ নাকি আগে সাহিত্য পরে পরিবেশনা, নাকি উদ্দেশ্যটাই পরিবেশনা—সাহিত্য অনুষঙ্গমাত্র? এই কনটেক্সট থেকে সরিয়ে নিয়ে একটি বাক্যের অব্যবহিত অর্থ করেছেন প্রতিক্রিয়াকার। বলেছেন, বাঁশি বা মূকাভিনয় তো নিছক পরিবেশনা, সেখানে সাহিত্য নেই। সেটা কে না জানে!
আমার প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নচিহ্নিত শিরোনামের ভেতরে থাকা একটি প্রশ্নকে নাজমীন মর্তুজা একদমই ধরতে পারেননি। প্রশ্নটি ছিল, সমকাল কি ইতিহাস? সমকাল ইতিহাস হলে যেকোনো ঘটমানতা সম্পর্কিত বর্ণনাই কোনো একটি ধারণাশ্রেণীর অধীনে ইতিহাস বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু আসলে কি তাই? গ্রন্থকারেরা সমকালীন পরিবেশনাশিল্প সম্পর্কিত জরিপকে কোন যুক্তিতে ইতিহাস শিরোনামে গ্রন্থবদ্ধ করছেন? কোনো মীমাংসা নেই।
‘বাংলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার প্রেরণা’র জায়গাটিকে স্পষ্ট না করে, কোনো যুক্তি-জিজ্ঞাসার ধারেকাছে না গিয়ে নাজমীন মর্তুজা তাঁর আলোচনা শেষ করেছেন গ্রন্থটি সম্পর্কে একটি এপিটাফ লিখে—‘বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের পরিবেশনাকেন্দ্রিক ঐতিহাসিক সত্যতাকে প্রচলিত ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছি, যাতে করে বাংলা সাহিত্যের…’ ইত্যাদি। গ্রন্থটি সম্পর্কে তবে এই লিপিগুলোই উৎকীর্ণ হোক, যা লেখকদের একজন লিখেছেন।
আলোচনা ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার এই পর্যায় পর্যন্ত এসে মনে হচ্ছে, অমীমাংসার দেয়ালগুলো অনেক উঁচু। বেরুবার পথ আপাতত নেই। নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া বা আলোচনার ইচ্চ্ছাও দুরস্থ। আর দেয়াল মাপার কাজটা পাঠকই করুক। ইতি।

রায়হান রাইন
দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ০২, ২০১০

%d bloggers like this: