তোমার হাতটা আমার মাথার ওপর রাখো তো মা, যখন ছোট ছিলাম তখন যেভাবে তুমি রাখতে। এই পৃথিবীতে এখন আমার আপনজন বলতে আছ একা তুমি। দীর্ঘ কুড়ি বছরেও তোমায় দেখতে যাইনি—এ জন্য তো আমায় কখনো দোষ দাওনি। অবশ্য তুমিই তো আর একলা মানুষ নও, যার থেকে দূরে সরে গেছিলাম আমি। আসলে এত দূর ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, চারপাশের জগতের দিকে চাইতে পারিনি, নিজের দিকে তাকানোরই ফুরসত ছিল না। আমার স্ত্রী বা ছেলেবেলার পুরোনো বন্ধুরা, তারাও এর থেকে ভালো কিছু পায়নি। নিজের মেয়েকে দেখতে যাওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত ছিল না। একবার নিজের মুখের দিকে চাইব, তেমন সুযোগও তো খুব একটা পাইনি। বাইরে বেরোনোর আগে ঝটিতি একবার আয়নার দিকে চাইতাম, সেটা কেবল টাই ঠিক করে নিতে, শার্টের সঙ্গে স্যুটের রঙে কোথাও গড়বড় থেকে গেল কি না সেটা পরখ করতে।
মা, এই দুনিয়াতে যে আমি বেঁচে আছি, সেটাও ঠিকঠাক টের পেতাম না। মরে না গিয়েও অন্য একটা জগতে বেঁচে থাকা কি আদৌ সম্ভব হতো আমার? কাগজে একটা শোক সংবাদ ছাপা হলো না, আর আমি দুম করে মরে গেলাম, সেটাও কি সম্ভব? আমার মতো বিশিষ্ট একজন মন্ত্রী যখন চিরতরে চলে যাবে, তখন তো নির্ঘাত সারা দেশে ফলাও করে শোক সংবাদ ছাপা হবে। ভাবগম্ভীর পরিবেশে একটা শোভাযাত্রাও হবে নিশ্চয়ই—শোকসন্তপ্ত মানুষ সেখানে কাতার বেঁধে দাঁড়াবে। প্রথম কাতারের ঠিক মাঝখানেই হয়তো থাকবেন মহাত্মা স্বয়ং। তিনি আসবেন কালো রঙের টাই পরে, আর নিজের শোকাশ্রু তিনি লুকিয়ে রাখবেন কালো সানগ্লাসের আবডালে। এ রকম একটা কল্পনা প্রায়ই এমন আবিষ্ট করে ফেলে আমাকে; তখন ভারি ইচ্ছে করে একটা কফিনের মধ্যে শুয়ে থাকি, মানুষ কাঁধে করে সেটা বয়ে নিয়ে যাক।
মা, তোমার জগৎ থেকে আমি তো পুরোপুরি জুদা হয়ে গেছিলাম। আর সেটা আমার শরীর-মনের জন্য এমন ভার হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে কিছুতেই বওয়া যেত না। দেহ অচল হয়ে পড়ত ভয়ানক পরিশ্রান্তির দাপে; মন কিন্তু ঠিকই কাজ করে যেত তখনো। আবার, মনটা প্রায়ই এমন ক্ষয়ে যেত যে কাজকর্ম বন্ধ করে দিত পুরোপুরি; আমার দেহ কিন্তু তখন ছুটে বেড়াচ্ছে, এখান থেকে সেখানে যাচ্ছে, নিয়ম করে অফিস করছে, সভা- সেমিনারে পৌরোহিত্য করছে, বিমানবন্দরে গিয়ে প্রতিনিধিদলকে বরণ করছে, পার্টিতে হাজিরা দিচ্ছে, নয়তো উচ্চপর্যায়ের মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিদেশে।
প্রায়ই তাজ্জব বনে গিয়ে হুঁশ হতো, শরীরটা দস্তুরমতো আপন খেয়ালে নড়াচড়া করছে, সেখানে আমার সচেতন কোনো চেষ্টা থাকছে না। ভারি দুশ্চিন্তা হতো, যখন এমনটা ঘটত খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মাঝখানে। এ রকম বৈঠকে দারুণ মনোযোগ আর খেয়াল থাকা লাগে। আসলে গুরুতর বৈঠক বলতে ছিল শুধু সেগুলোই, যেগুলোর মাথায় থাকতেন মহাত্মা স্বয়ং। সরকারের জন্য যেদিন থেকে কাজ করতে শুরু করেছি, সেদিন থেকেই কারও অধীনে থেকে কাজ করতে ঘেন্না হতো। আর কর্তাব্যক্তিদের ওপর আমার ঘেন্না খুব সতর্ক পাহারা দিয়ে গোপন রাখাটা অভ্যাস হয়ে গেছিল। আমার আক্রোশ ফুটে বেরোত শুধু অধীনদের ওপর অফিসে, আর বাড়িতে স্ত্রীর ওপর; যেমন আমার বাবা প্রায়ই তোমার সঙ্গে করতেন।
কাজের জায়গাতে কর্তাব্যক্তিদের সামনে নিজের রোষ কোনো দিন প্রকাশ হতে দেইনি, সে একজন সামান্য আমলা হোক—তবুও নয়; আর রাষ্ট্রপ্রধানের কথা তো বাদই দিলাম। সব সময় চেয়ারে সোজা হয়ে বসে থাকতাম, দেহ-মন হুঁশিয়ার হয়ে থাকত, বৃত্তিগুলো ব্যগ্রভাবে ধরে রাখত মনোযোগ। এই একটা দুশ্চিন্তায় হয়রান হয়ে থাকতাম সারাক্ষণ—তিনি হয়তো এমন একটা সওয়াল করে বসবেন যার জবাব আমার জানা নেই। জবাবটা যখন আমি ঠিকঠাক জানি, তখনো কিন্তু হয়রানি আমায় ছাড়ত না। আমার ভারি ভয় হতো, সঠিক জবাবটা হয়তো ঠিক মনপসন্দ জবাব হবে না।

আমাদের রাজনীতির একেবারে আদর্শলিপির পাঠ হলো, সঠিক জবাব মানেই অনিবার্যভাবে মনপসন্দ জবাব নয়। বরং মনপসন্দ উত্তরটাই সব সময় সঠিক উত্তর হয়ে দাঁড়ায়। আমার মতো একজন মন্ত্রীকে দেহ-মন দুইভাবেই খুব হুঁশিয়ার থেকে বাজে তথ্যের ডাঁই থেকে আসল ঘটনাটা বের করে আনতে হতো। খুবই খতরনাক কাজ। সভায় আমি ঠায় বসে থাকতাম, কোলের ওপর নিশ্চলভাবে রাখা থাকত বাঁ হাত, আর কাগজের ওপর ডান হাতে ধরা থাকত কলম। খুচরো কোনো ইশারা, অলক্ষে ঘটে যাওয়া মাথা হেলানো, হাতের কোনো গোপন বিচলন, আঙুল কী নিচের ঠোঁট সামান্য বাঁকলো বা প্রসারিত হলো মুখ, নাক বা চোখের মাংসপেশিতে মৃদু টান—এসব ঠিকঠাক আমল করতে আমার তৈরি থাকাটা জরুরি ছিল। এ-জাতীয় বিলোড়ন আসলে ঘটে যাওয়ার আগেই প্রায় ধরে ফেলতাম আমি। আমার মন বেশ দ্রুততার সঙ্গে এসব ইঙ্গিতের অর্থোদ্ধার করতে পারত, কিন্তু তকদির যেদিন খুব ভালো থাকত আমার, সেদিন দৃষ্টি আরও বেশি ক্ষিপ্র হয়ে যেত, আর সবকিছুর মধ্যে ক্ষিপ্রতম থাকত কান, কোনো একটা শব্দ উচ্চারণ করার আগেই তাঁর কণ্ঠস্বর ধরা পড়ে যেত কানে।
যখন চেয়ারে বসে থাকতাম, আমার গোটা দেহ-মন-আত্মা হয়ে দাঁড়াত স্নায়ুর এক সংবেদী ভর: নাঙ্গা রাডারের তারগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে থাকত। মাথাটা, হাত দুটো, বুক, আর পেট এমন থরথরিয়ে কাঁপত, যেন লাগাতার ইলেকট্রিক শক লাগছে। তাঁর কাছাকাছি যখনই ঘেঁষার সুযোগ পেয়েছি, অমনি আমার ডান হাতে শুরু হতো কাঁপুনি, বাঁ হাতে শক্ত করে ধরেও সেটা নিরস্ত করা যেত না। বাধ্য হয়ে হাতগুলো আড়াআড়ি বুকের ওপর নয়তো পেটের ওপর চেপে রাখতাম। দাঁড়িয়ে থাকি আর বসেই থাকি, সব সময় পা দুটো এমন জোরে চেপে রাখতাম, যেন আমি একটা থরথর কুমারী।
আমার একটা ছবি আছে তাঁর সঙ্গে দাঁড়ানো। যখন স্পটলাইটের আলো এসে পড়ল আমাদের ওপর, তখন নিজের জড়তা কিছুটা ভাঙতে কোশেশ করছিলাম। বাঁ হাতের কবল থেকে ডান হাতটাকে ছাড়িয়ে নিতে, আর একটা পা থেকে অন্য পা সরিয়ে রাখতে আমার চেষ্টা—জবরদস্তি বলতে হবে। কিন্তু আমার হাত-পাগুলো যেন পক্ষাঘাতে পুরোপুরি অচল। এই ছবিটা যখন ছাপা হলো, তখন এত লজ্জায় পড়ে গেলাম যে বাসার সবার চোখের আড়ালে পত্রিকাটা লুকিয়ে ফেললাম। বিশেষ করে লুকোছাপা করলাম আমার কন্যার কাছে। সে আর সব উচ্চ পদের সরকারি আমলাদের মধ্যে আমার মুখের ওপর আঙুল তুলে ওর মাকে জানালো, ‘মা, এটা তো আমার বাবা না!’
একজন মাননীয় ব্যক্তির স্ত্রী হওয়ার গৌরবে সে জবাব দিল, ‘সোনামণি, এই তো তোমার বাবা। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়। দেখ, একেবারে সামনের কাতারে, প্রেসিডেন্টের পাশেই উনি দাঁড়ানো।’
জীবনে এত বেশি শরমিন্দা কোনো দিন হইনি আমি, আমার কন্যার সুমুখে সেদিন যেমন হয়েছিলাম। তার শিশুতোষ চোখ দুটো দিগন্তের দিকে ফেরানো ছিল। আমি ঠিক যেমন, সেভাবেই আমাকে উন্মোচিত করে দিয়েছিল ও। আমার বাতুনিকে সে মেলে ধরেছিল। তুমি তো বলতে প্রায়ই, শিশুরা অপার্থিব জগতের খুব নিকটেই থাকে। আমার কন্যার চাহনি আমি ভয় পেতাম। অটল, দ্বিধাহীন সেই চাহনি, আর দশটা শিশু যেভাবে তাদের বাবার দিকে তাকায়, তার থেকে একদমই আলাদা। স্বভাব যতই অসৎ হোক, কলুষিত হোক, একজন বাবা তো শেষ পর্যন্ত একজন বাবা-ই, তাই না।

আমার বাবা ছিলেন মেয়ে-পটানো, মাতাল আর জুয়াখোর স্বভাবের একটা লোক। অবশ্য তোমার চোখে উনি ছিলেন দেবতা, তাই না? আর নিজের সন্তানকে তুমি দেখেছ একটা শাবক হিসেবে, যে শেষতক তার বাবার মতোই একটা সিংহ হয়ে দাঁড়াবে। মাগো, একটা সিংহ-ই হয়ে গেছিলাম আমি। কাজের জায়গা আর বসতবাড়ি—দুই জায়গাতেই আমি ছিলাম একটা জালিম। অধীনদের মধ্যে যত বেশি আনুগত্য পেতাম, ওরা যত বশংবদ হতো, ততই নিজেকে ভালো লাগত, নিজেকে তমিজ করতাম। আমার সারা জীবনে অধীন কোনো নারী-পুরুষ কখনো আমার মুখের ওপর কথা কয়নি; শুধু একজন যুবতী আওরত ছাড়া। বিপ্লব শুরু হওয়ার এক মাস কি দুই মাস আগে সে এসেছিল আমার অফিসে।
আমাকে পুরোদস্তুর বেসামাল করে দিয়েছিল সে। তার কারণ অবশ্য এমন ছিল না যে সে আমাকে স্পর্ধা করত বা কুড়ি বছরের একটা নিষ্কর্মা ছুঁড়ি হয়েও মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে সে মর্জিমতো কথা বলত। আসলে কারণ হিসেবে এটাও থোরবড়ি ছিল যে আমার আইনসঙ্গত পাওনা পদবি ব্যবহারে সে গররাজি ছিল। এসব কিছু নয়। আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেছিলাম, কারণ সে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাত, একেবারে ভয়-ডরহীন, স্পষ্ট চোখে। একজন ভদ্রলোকও কিছুতেই তোমার দিকে অত কঠিন দৃষ্টিতে তাকানোর স্পর্ধা পেত না, মেয়েলোকের কথা ছেড়ে দাও।
সত্যিই আমি বিহ্বল হয়ে গেছিলাম, ক্ষেপে অগ্নিশর্মা আমার দশা; না ততটা ওর ওপর নয়, যতটা আমার নিজের ওপর। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পরের দিনই ওকে তলব করলাম। নিজের ডেস্কে বসে ওকে ঠায় দাঁড় করিয়ে রাখলাম, পেছনে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে ফোনের মধ্যে মুখ টিপে টিপে হাসলাম।
আমি চাইছিলাম, ওর যেন চেতন হয় যে ফুটো পয়সার দাম নেই ওর। খুব রং-তামাশা করছিলাম ফোনে, হো হো করে হাসছিলাম, কিন্তু এই যুবতী আওরাত এক রত্তিও দমল না। সে এমন সহজভাবে অফিস ঘরে হেঁটে বেড়াতে লাগল, যেন আমার কোনো অস্তিত্বই নেই। এত স্বাচ্ছন্দ্য লাগছিল ওকে, যেন এটা ওর নিজের বাড়ি। দেয়ালে ঝোলানো চিত্রকর্ম ঘুরে ঘুরে দেখছিল। একটা ছবির সামনে থমকে দাঁড়াল, আর ব্যঙ্গভরে বলল, ‘পপি ফুল, না?’
আমার দিকে সে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ওকে ভালো করে জরিপ করার চেষ্টা করছি, ওর অন্তর্ভেদী চাহনি আমার খুলি ভেঙে ঢুকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, ওখানে পুরোপুরি উলঙ্গভাবে বসে আছি আমি। সেই ছবিটা নিয়ে আমার কন্যার প্রতিক্রিয়া মনে পড়ে গেল, আর ওর মুখের ভঙ্গি—রাগটা হু হু করে বাড়ছিল। নিজেদের ভদ্দরনোকি কেতা বিস্মৃত হয়ে গেলাম। হাত নেড়ে চেঁচিয়ে ওকে বললাম, ‘কী ভাবো তুমি নিজেকে? যে-ই তুমি হও না কেন, একটা মেয়েছেলের থেকে তো আর বেশি কিছু নয়। তোমার স্থান হলো বিছানায়, কোনো মর্দ্দালোকের তলে।’
সাদামাটা আওরত হলে এই কথা কয়টি শুনে শরমে মরে যেত। কিন্তু ওর মুখে লজ্জার রক্তিম ভাব ফুটল না মোটেই। একবার চোখের পলক পর্যন্ত ফেলল না।

সরকারে নিজের কুরসি টলে গিয়েছিল, সেটা আমার আসল ট্র্যাজেডি ছিল না। যেভাবে আমার কুরসি টলে গেল, সেটাই আমার মূল ট্র্যাজেডি।
সেই বদনসিব ভোরবেলাতে পত্রিকায় আঁতিপাতি করে খুঁজেও নতুন নিযুক্ত মন্ত্রিসভায় নিজের নামটা খুঁজে পেলাম না। ধাঁ করে বাতিলের খাতায় চলে গেলাম আমি, যেন রেজিস্ট্রার থেকে ঘষে ঘষে আমায় তুলে ফেলা হলো, যেন আমার আর কোনো নাম নেই। অহোরাত্র যে টেলিফোনটা লাগাতার বাজত বেমক্কা, সেটা বোবা হয়ে গেল। সবাই আমাকে ছেড়ে গেল।
বুঝতে পারলাম, একটানা ফোন বাজতে থাকা তা সে যতই ভয়ানক উৎপাত হোক না কেন, আসলে একদমই বিরক্ত করেনি আমায়। আমি এমন আসক্ত হয়ে গেছিলাম, যেমন আমার আসক্তি আছে অ্যালকোহলে, মেয়েলোক, ক্ষমতা আর দৌলতের ওপর। এসব আমোদ কি আমাদের মতো পুরুষ লোকের জন্য খোদার নেয়ামত নয়? খোদার ষোলোআনা নেয়ামত চণ্ডালের মতো খুঁজে ফিরেছি আমি, কিন্তু কিছুতেই তৃপ্তি আসেনি—এমনকি যখন আমার চল্লিশটা প্রাসাদ আর চল্লিশজন আওরত ছিল—তখনো।
হ্যাঁ গো মা, একটা তুচ্ছ কারণে আমি খোদার সওগাত হারিয়েছি। সেই শোচনীয়, দৈব-নির্ধারিত দিনটিতে আমি মন্ত্রিসভার একটা বৈঠকে বসেছিলাম, যার পৌরোহিত্য করছিলেন মহাত্মা স্বয়ং। আমার সন্দেহ ছিল না যে আমিই চেয়ারটায় বসে আছি, আবার পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ছিলাম যে চেয়ারে উপবিষ্ট লোকটা ঠিক আমি নই। কিছুতেই নিজের মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিলাম না। যখন সবকিছু একটু অন্য রকম ঠেকে, তখন কী করে ঠায় বসে থাকার কাজটা সব সময় করে এসেছি সেটা বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। মনে মনে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, যে বসে আছে, সে কি আমিই না আর কেউ? এই দুজন লোকের মধ্যে কোনটা আসলে আমি? তার পরেই ঠাহর হলো, আমার এই ধন্দ লাগার নেপথ্যে আছেন সেই শ্রীমতী বিপ্লবী আওরাত। সেদিনের পর থেকে যখনই ওর দিকে চোখ পড়েছে, তারপর থেকে ওর কথা না ভেবে কিছুতেই থাকতে পারিনি আমি।
এমনকি সে সুন্দরীও ছিল না, কিন্তু তার পরও সে ছিল অসামান্য। আমরা সারা জীবন ধরে যেসব বিশ্বাসের ধ্বজা তুলে ধরে রেখেছিলাম, সে তার সবই ক্ষয় করে দিচ্ছিল।
আমার ডান হাত নিষ্ঠার সঙ্গে কলম ধরে রেখেছিল কাগজের ওপর, মহাত্মার কোনো টুকরো ইশারা বা ধ্বনিপুঞ্জ টুকে নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার বাঁ হাতের নড়াচড়া মহাত্মার চোখে পড়ে গেল। তিনি আমার দিকে নজর ঘোরালেন। একটা সওয়াল করলেন আমাকে। আমি ঠিক জবাবটা জানতাম, মনপসন্দ জবাবটাও জানতাম। কিন্তু এমন ঘাবড়ে গেছিলাম যে দুটোর কোনোটাই দিতে পারছিলাম না।
আমার কোনো ধারণাই নেই যে দুজনের মধ্যে কে আসলে সওয়ালটার জবাব করেছিল। যখন সেই মহাত্মার চোখ আমার দিকে ঘুরল, আমার একেবারে কলজের মধ্যে থরহরি কম্পন শুরু হয়ে গেল। স্নায়বিক উত্তেজনার কারণেই হোক বা সেই বিপ্লবী যুবতীকে নিয়ে আমার ঘোরের ফলই হোক, আমার মন পুরোপুরি বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছিল। প্রায় একটা খোদাই ভাস্কর্যের মতো আমি বসেছিলাম—সম্পূর্ণ নিশ্চল। তার চাহনি মৃত্যুর মতো ভয়ালভাবে আমার ওপর আছড়ে পড়ল। যখন তিনি আর একটা কথা পুছ করলেন আমায়, তার উত্তর ছিল একেবারে সোজা, আর দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

মাগো, সঠিক জবাবটা আসলে মনপসন্দ জবাব ছিল না। কেমন করে সেটা ভুলে গেলাম আমি? কী করে আমার মরণ ঘনিয়ে এল? না মা, বিলাপ করছি না আমি। এ আসলে অনাদি ও অনন্ত শান্তি আর পরিত্রাণের উদ্যাপন। আমার বুকের ওপর চেপে থাকা সুবিরাট ভার নেমে যাওয়ার স্বস্তি পেয়েছি। এই জগৎ ছেড়ে চিরতরে চলে যেতে বিদায় বলতে গিয়ে আমি আনন্দিত। কিন্তু কুগ্রহের ফের এটাই, যে শান্তির খোঁজ পেয়েছি আমি, এই জগৎ ছেড়ে যেতে এখন পুরোপুরি তৈরি; কিন্তু এখনো ফোনটা সব সময় বুকের কাছে এনে রাখি, কখন বেজে উঠবে ফোন তার এন্তেজারি করি। মৃত্যুর আগে আমি এখনো প্রতীক্ষা করি শুধু একজন লোকের জন্য, যে আমায় ডাক দেবে এবং বলে উঠবে, ‘মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়’।
নওয়াল এল সাদাওয়ি: মিশরীয় লেখক, নারী ও ইসলাম নিয়ে অসংখ্য বই লিখেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মিশরের মোবারক সরকারের পতনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

অনুবাদ: তৈমুর রেজা
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১১