প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’র ৩১ বৈশাখ ১৪১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘সাহিত্যনির্ভর পরিবেশনাশিল্পের লিখিত ইতিহাস’ শীর্ষক আলোচনা বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলোচিত গ্রন্থটির লেখকদের একজন নাজমীন মর্তুজা। প্রতিক্রিয়ায় তিনি আলোচনার শিরোনাম এবং বক্তব্য বিষয়ে তাঁদের মতদ্বৈধতা জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমাদের গ্রন্থের মর্মমূলে কিন্তু পরিবেশনানির্ভর সাহিত্যের ইতিহাসই বেশি আলোচিত হয়েছে, সাহিত্যনির্ভর পরিবেশনাশিল্পের ইতিহাস সংগত কারণেই কম রয়েছে।’ অথচ এই লেখকেরাই গ্রন্থের ভূমিকায় জানাচ্ছেন, ‘এখানে আমরা মূলত বাংলা ভাষার লিখিত সাহিত্যের একটি জনসাংস্কৃতিক জরিপ উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছি।’ আর গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে লেখকেরা সাহিত্যের লিখিত রূপের আবিষ্কার, উদ্ভব বা কালপঞ্জির পরিচয় দিয়েই কিন্তু পরিবেশনারীতি, আঙ্গিক ইত্যাদির দিকে মনোযোগী হয়েছেন। নির্ভরতা না থাকলে ওই সব প্রত্নবস্তুর সূত্র উল্লেখের দরকার ছিল কি? সাহিত্যের ইতিহাসকারদের সাহিত্যবস্তুর উল্লেখের কথা বাদ দিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়—লিখিত বা মৌখিক যেকোনো রূপের সাহিত্য ব্যতিরেকে নিছক পরিবেশনার অস্তিত্ব কি সম্ভব?
সাহিত্য যেমন রচিত হয় পরিবেশনার উদ্দেশ্যে, তেমনি পাঠের উদ্দেশ্যেও। সাহিত্যবস্তু রচিত হয়ে যাওয়ার পর তা কেবলই শব্দ বা চিহ্নের সিরিজ। অবশ্যই তা শুষ্ক আর নির্জীব বাক্যরাশিমাত্র। পাঠক যখন তা পাঠ করেন, তখনই তা জীবিত হয়ে ওঠে। একইভাবে তা প্রাণময় হয়ে ওঠে পরিবেশনার ভেতর দিয়েও। নাজমীন মর্তুজা লিখেছেন, ‘আর আমরা তার (প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যকীর্তি) উল্লেখ করেছি এভাবে যে তার প্রাণবন্ত রূপ সুনির্দিষ্টকালের গণ্ডি পেরিয়ে সমকালকেও স্পর্শ করেছে।’ এই বক্তব্যে সাহিত্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটি পাঠকেন্দ্রিক সাহিত্যের প্রাণময়তাকে পাশ কাটিয়ে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি তাঁরা গ্রহণ করেছেন হয়তো পরিবেশনার বিষয়টির ওপর জোর দিতে গিয়ে। আমরা জানি, পাঠের ক্ষেত্রে কেবল সুনির্দিষ্টকাল বা সমকাল নয়, যেকোনো সময়ের পাঠকই একটি টেক্সটকে বাঁচিয়ে তোলেন। সেখানে কালের গণ্ডি পেরোনোর কোনো ব্যাপার নেই। ফলে ‘আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রাণময় সত্তাকে পাঠক-শিক্ষার্থী-শিক্ষক-গবেষকের সামনে উপস্থাপন করতেই গ্রন্থটি রচনা করেছি’—এই দাবিকে বোঝার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
নাজমীন মর্তুজা লিখেছেন, ‘আরেকটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের উপাদানের সাম্প্রতিককালের প্রতিটি পরিবেশনার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস গ্রন্থমধ্যে নিশ্চিতভাবেই আছে।’ লেখক বলছেন, নিশ্চিতভাবেই আছে। আমার বক্তব্য হলো, নিশ্চিতভাবেই নেই। তাঁরা কিন্তু প্রতিটি পরিবেশনার কথা বলছেন। আমি কেবল একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি, যা তাঁদের গ্রন্থে নিশ্চিতভাবেই নেই। ব্যালাড বা গীতিকা, যা মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার কয়েকটি খণ্ডে শ্রদ্ধেয় দীনেশচন্দ্র সেন ও ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিকের প্রচেষ্টায় সংগৃহীত ও সংকলিত, সেসব অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আর সমকালে এর অনেকগুলোর পরিবেশনাও বিদ্যমান। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অলিখিত ইতিহাস গ্রন্থে কোনো একটি গীতিকার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ দূরে থাকুক, ‘গীতিকা’ আঙ্গিকটি সম্পর্কেই কোনো কথা নেই।
লেখকেরা তাঁদের গ্রন্থের নাম দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অলিখিত ইতিহাস। নামটি দেখলে বা শুনলে মনে যে ধারণাটি জন্মে তা হলো, অনেকে যাঁরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখেছেন, তাঁরা বুঝি অনেক কিছু বাদ দিয়ে গেছেন। আর এই গ্রন্থের লেখকেরা সেই সব বাদ রেখে যাওয়া ইতিহাস লিখেছেন। কিন্তু ঘটনা অন্য। তাঁরা আসলে সাহিত্যের পরিবেশনাকে সামনে এনে তার সূত্রে জনসংস্কৃতির ভেতর সাহিত্যকে দেখতে চান—এমন একটা প্রস্তাব আছে গ্রন্থের পশ্চাতে। তাঁদের এই প্রস্তাবের সাপেক্ষে এবং বিতর্কের অবকাশ রেখেই কেবল ইতিহাস অলিখিত থাকার প্রসঙ্গ তৈরি হয়। কাজেই গ্রন্থনামটি প্রথম দফাতেই পাঠককে প্রতারিত করে। কিন্তু লেখকেরা যে প্রস্তাবনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন, আমি লিখেছিলাম, ‘তার পেছনের চিন্তাটি কৌতূহলোদ্দীপক’। কেননা ‘তাঁরা পরিবেশনারীতি থেকে সাহিত্যের সত্তাকে খুঁজছেন, ভঙ্গি থেকে যেমন অন্বেষণ করা হয়ে থাকে আত্মাকে।’ কিন্তু নাজমীন মর্তুজা লিখেছেন, আমি নাকি তাঁদের অনুসন্ধানযজ্ঞকে কৌতূহলোদ্দীপক বলে শনাক্ত করেছি! একটি অনুচ্ছেদের এরূপ অর্থান্তর ঘটাতে তিনি দুটি কথাকে আলাদা করে নিয়ে তাতে উদ্ধৃতি চিহ্ন বসিয়ে ব্যবহার করেছেন এবং কথা দুটিকে নতুন করে জোড়া লাগিয়েছেন। কাজটি সচেতনভাবে করা হয়ে থাকলে এটি এক ধরনের অসাধুতা। কথোপকথন বা তদ্রূপ ডিসকোর্সে এ ধরনের ফ্যালাসি অসাবধানতাবশতও সৃষ্টি হতে পারে। যেভাবেই সৃষ্টি হোক, উভয় ক্ষেত্রেই একই রকম একটি চমৎকার নাম প্রস্তাব করেছিলেন অ্যারিস্টটল—অ্যাকসেন্টাস।
নাজমীন মর্তুজা বলেছেন, কত কী তাঁদের গ্রন্থে আছে, কত কিছুই না তাঁরা করেছেন, ‘কিন্তু আলোচক এসব বিষয় অবলীলায় এড়িয়ে গেছেন।’ আমার কথা হলো, অবলীলায় বা অন্য যে লীলাতেই আমি এড়িয়ে গিয়ে থাকি না কেন, আশা রাখছি, অন্য কেউ নিশ্চয়ই সেসব বিষয়ে আলোচনা করবেন। নাজমীন মর্তুজার প্রতি শুভ কামনা।

রায়হান রাইন
দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ০৪, ২০১০

Share This