সাঈদ আহমেদ ভাই ছিলেন একজন শুদ্ধ নাট্যজন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি ৭৯ বছর বেঁচেছিলেন। নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী স্ত্রী পারভিন ভাবি হয়ে পড়লেন একান্ত নিঃসঙ্গ। তাঁদের খুব নিকট প্রতিবেশী হিসেবে দেড় বছর কাছে থেকে দেখার ভিত্তিতে বর্তমান শ্রদ্ধাঞ্জলিটি রচিত।
সাঈদ ভাইয়ের সঙ্গে জীবনে আমার দুটো কাকতালীয় যোগাযোগ হয়। এর মধ্যে একটি আসলে যোগাযোগ নয়, পেশাগত কারণে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে আমার অবগত হওয়ামাত্র। দ্বিতীয়টি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।
বছর পঁচিশেক আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের জার্নালে ছাপানোর জন্য একটি লেখা জমা দিই। সেটি ছিল শেক্সপিয়ারের মঞ্চকৌশলের ওপর বাংলায় একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে যেকোনো লেখা নিয়মমাফিক দুজন রিভিউয়ারের কাছে পাঠানো হতো, এখনো হয়। আমার লেখাটা ফেরত এল, একজন রিভিউয়ারের বিনা বাক্য ব্যয়ে অনুমোদনসহকারে আর আরেকজন রিভিউয়ারের প্রায় পঁচিশটি সংশোধনীসহ। তথ্যগত সঠিক টীকাসহ জায়গায় জায়গায় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা চেয়ে। এত সংশোধনী দেখে প্রথমে খানিকটা দমে গেলেও পুরো পরিশ্রম করে লেখাটি পুনর্বিন্যাস করে ওই রিভিউয়ারের কাছে পাঠানোর পর তিনি সন্তুষ্ট হন। আমার লেখাটি ছাপা হয়। যদিও রিভিউয়ারের নাম কখনো লেখকদের কাছে জানানোর নিয়ম নয়, কিন্তু আমার প্রচণ্ড কৌতূহল দেখে সম্পাদক সাহেব, তখনকার কলা অনুষদের ডিন, আমাকে নামটা জানালেন। জানলাম, তিনি সাঈদ আহমেদ সাহেব, বিশিষ্ট নাট্যজন। তখন তিনি বিটিভিতে বিশ্বনাটকের ওপর একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান করে সাড়া জাগিয়েছিলেন।
তাঁর রিভিউর একটা ব্যাপার আমি মনে রাখলাম। তিনি আমার তথ্যগত অনেক ভুল দেখিয়ে দিয়েছিলেন ঠিক, বা অনেক পয়েন্ট বিস্তৃত করতে বলেছিলেন ঠিক, কিন্তু লেখাটি তিনি বাতিল করে দেননি। অর্থাত্ তিনি একজন নবীন গবেষককে নিরাশ করতে চাননি। পরবর্তীকালে আমি যখন পেশাগত কারণে রিভিউয়ার হই, আমিও সাঈদ ভাইয়ের এ পদ্ধতিটি অনুসরণ করি।
এরপর কাকতালীয় ব্যাপারটি হলো, ২০০৭ সালে ঢাকায় চাকরি নিয়ে এসে আমি প্রথম যে বাসায় ভাড়া থাকি, সে ভবনের ঠিক নিচের তলায় দেখলাম ভাড়া থাকেন সাঈদ ভাই এবং পারভিন ভাবি। আমরা দোতলায় ছিলাম। ধানমন্ডি এলাকার একটি বাসা। তো সাঈদ ভাইকে আবিষ্কারটা হলো এভাবে। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরলাম দুপরে। স্ত্রী বললেন, নিচের তলায় থাকেন সে ফ্ল্যাটের ভাবি এসেছিলেন। তাঁর স্বামীও নাকি লেখালেখি করেন। সাঈদ আহমেদ নাম।
নামটা শুনে আমার একটু আঁচ হলো কি বিখ্যাত নাট্যকার সাঈদ আহমেদ নন তো! তখন আমার ১৯৮৫ সালের রিভিউর ঘটনাটি মনে পড়ল।
বিকেলেই আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ফ্ল্যাটের দরজায় বেল দিলাম। দরজা খুললেন এক অতিসুশ্রী প্রৌঢ় মহিলা। বুঝলাম, তিনিই পারভিন ভাবি, যিনি বয়সকালে নিশ্চয় অসামান্যা সুন্দরী ছিলেন। আমি পরিচয় দেওয়ার পর তিনি খুশি হয়ে বাসায় ঢোকালেন। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে সাঈদ আহমেদ সাহেব (যাঁকে আমি সেদিন থেকে সাঈদ ভাই ডাকি) এলেন। দেখলাম, অসম্ভব সুন্দর এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। লম্বাচওড়া এবং ফরসা। চোখ আয়ত এবং চওড়া কপাল। প্রথম দেখায় মনে হলো, তিনি খানিকটা অসুস্থ। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। খানিকটা জড়িয়ে যাচ্ছিল। আমি তাঁকে রিভিউয়ের কথাটা মনে করিয়ে দিলাম। তিনি আবছাভাবে মনে করতে পারলেন। এরপর আমাদের আলাপ জমে উঠল। বুঝলাম যে পারভিন (কোরাইশী) ভাবি অবাঙালি মহিলা। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে এমএ পাস। সুন্দর ইংরেজি বলেন। আমি বেশিক্ষণ গুরুতর আলোচনা করতে পারি না। আর মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার চিরদিনের কৌতূহল। পরিবেশ লঘু করার জন্য বললাম, ‘তো আপনাদের মধ্যে দেখা হয়েছিল কোথায়?’ জানলাম, সাঈদ ভাই সিএসপি অফিসার হওয়ার পর করাচিতে ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে পোস্টিং পড়ে, আর পারভিন ভাবির পরিবার লখনৌ থেকে করাচিতে বসবাস করছিলেন। তখন ১৯৬২ সাল। পারভিন ভাবি সিনটিলা নামের একটি ক্রোড়পত্র সম্পাদনা করতেন। সেটিতে সাঈদ আহমেদ ফরাসি নাট্যকার জাঁ জেনের ওপর একটি লেখা পাঠান। এবং বলেন যে তিনি নিজেই প্রুফ দেখবেন। সে সূত্রে দুজনের মধ্যে পরিচয়। তারপর পরিণয়। তখন জানলাম সাঈদ ভাইয়ের বড় ভাই স্থপতি হামিদুর রহমান, যিনি একুশে মিনারের ডিজাইন করেছিলেন, তিনি ইতালিতে থাকতেন। ফ্রেইসকো পেইন্টিং নিয়ে লেখাপড়া করছিলেন। সে সূত্রে সাঈদ ভাইয়ের ইতালি গমন। তারপর ফ্রান্সে ছিলেন কিছু দিন। তখন সাঈদ ভাইয়ের জাঁ জেনে, ইয়ুজিন আইনেস্কো ও স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঘটে। আর্থার মিলার ও হ্যারল্ড পিন্টারের সঙ্গেও তাঁর গভীর যোগাযোগ ছিল।
অচিরেই আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে খুব আসা-যাওয়া হতে লাগল। পারভিন ভাবির চমত্কার সৌজন্যবোধ ও সামাজিক সহজতার কারণে আমার স্ত্রী তাঁর একান্ত ভক্ত হয়ে গেলেন। আমার মায়ের অসুস্থতা ও মৃত্যুর সময় সাঈদ ভাই ও পারভিন ভাবি আমাদের পরিপূর্ণ সহযোগিতা ও সান্ত্বনা দেন। পরে মায়ের মৃত্যুর প্রথম বছর পালন উপলক্ষে একটি পারিবারিক আলোচনা সভায় সাঈদ ভাইকে প্রধান অতিথি রাখি। খুব সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছিলেন।
মাঝে মাঝে গেলে তাঁর পড়ার ঘরেও বসতে দিতেন। নিজের প্রকাশিত বইটই দেখাতেন। আমার লেখালেখির খোঁজখবর নিতেন। আমাদের বিভাগ থেকে প্রকাশিত জার্নাল ক্রসিংস-এর একটা কপি দিলাম। আমার সদ্য প্রকাশিত অনুবাদ, শেক্সপিয়ার: গ্রেট ট্রাজেডি এক কপি দিলাম। কোনো জিনিসের প্রশংসা করলে সাঈদ ভাই ‘হুম’ করে শব্দ করে মাথা নাড়তেন। একবার বললাম, বহুদিন আগে আয়েনোস্কোর দ্য লেসন নাটকটি ‘পাঠদান’ নামে অনুবাদ করে বাংলা একাডেমীর পত্রিকা উত্তরাধিকার-এ ছাপিয়েছিলাম। তিনি তখন আয়েনেস্কোর সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কথা বললেন। তাঁকে বললাম, একনাগাড়ে যে নয় বছর তিনি টিভিতে বিশ্বনাটক অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করে গেছেন, তার মধ্য দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার নতুন ঘরানার নাট্যকারদের, বিশেষ করে, অ্যাবসার্ড নাটকের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচিতি করান। এ ব্যাপারে তিনি পথিকৃত্। এ অনুষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, নাট্যকার ও নাটকের পরিচিতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো টিভিতে মঞ্চায়িত করে দেখানোর ব্যবস্থা করা। সাঈদ ভাই সায় দিয়ে বললেন, ‘হুম!’ ভাবি জানালেন, প্রায় অনুবাদ সাঈদ ভাই নিজেই করতেন।
সন্ধ্যার দিকে ফিরলেই দেখতাম, সাঈদ ভাই ভবনের ল্যান্ডিং স্পেসে পায়চারি করছেন। একটা রঙিন ফুলশার্ট ও একটা সাদা পায়জামা পরা থাকতেন। তিনি ঘর থেকে আর বিশেষ বের হতে পারতেন না। তার পরও একবার সাযেদ উল আলমের একটা সেতার বাদনের অনুষ্ঠানে নিয়ে এসেছিলাম আমাদের ইউল্যাব ইউনিভার্সিটিতে।
সাঈদ ভাইকে পারভিন ভাবি খুব যত্ন করতেন। ডাক্তারের পরামর্শমোতাবেক ওষুধ খাওয়ানো, হাঁটতে বলা, খেতে বলা—সব তিনি স্বামীকে পালনের ব্যাপারে ছিলেন যত্নশীলা। ভাবি কোথাও বের হলে সাঈদ ভাইকে দেখতাম ভবনের গেটের কাছে এসে ভাবির ফেরার সময় হলে অপেক্ষা করতে।
সাঈদ ভাইকে আগে সালাম দেওয়া যেত না। দেখা হলেই তিনি আগে হাত তুলে ফেলতেন।
ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন সাঈদ ভাই। বারবার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছিল। শেষেরবার ল্যাব এইডে ২১ দিন ছিলেন। শেষ দিন রাতে ভাবি স্পেশাল পারমিশন নিয়ে আইসি ইউনিটে সাঈদ ভাইকে পরিচর্যা করছিলেন। কিন্তু ভোর পাঁচটার দিকে সাঈদ ভাই পৃথিবীর সব মায়া ছেড়ে চলে গেলেন।
গতকাল (২৪ জানুয়ারি) সাঈদ ভাইয়ের কুলখানির অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় মনে হলো, খুব স্নেহপ্রবণ একজন মানুষকে হারালাম।

মোহীত উল আলম
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ২৯, ২০১০