রশীদ করীমের স্মরণে কিছু কথা
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

ছিয়াশি বছর বয়সে রশীদ করীমের (১৪ আগস্ট ১৯২৫—২৬ নভেম্বর ২০১১) মৃত্যুকে অকালমৃত্যু বলা যায় না। তবে একদিক দিয়ে তিনি জীবনের শেষ প্রায় ২০ বছর যেভাবে বেঁচে ছিলেন, সেটা কেবল বেঁচে থাকা। ১৯৯২ সালে স্ট্রোকের পর তিনি চল ৎ শক্তি হারিয়েছিলেন। প্রথম দিকে তাঁর বাকশক্তিও রীতিমতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সুখের বিষয়, তিনি পরবর্তী সময়ে ওই হারিয়ে যেতে বসা বাকশক্তি অনেকটাই ফিরে পেয়েছিলেন। তাঁর স্মরণশক্তিও অক্ষুণ্ন ছিল বলব না, তবে মোটের ওপর নির্ভরযোগ্য ছিল। তাঁর শেষ অসুস্থতার অল্প কয়েক দিন আগে আমি তাঁকে যেভাবে দেখেছি, তার ওপর ভিত্তি করেই কথাগুলো বললাম। সেদিন আমার মনে একবারও এমন চিন্তা আসেনি যে তাঁর মৃত্যু আসন্ন।
তাঁর সঙ্গে আমার এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এর শুরু কবে থেকে সঠিক বলতে পারব না। তবে শুরুটা হয়েছিল আমাদের দুজনের বন্ধু, সৈয়দ আলী কবিরের প্রণোদনায়, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আলী কবির ছিলেন রশীদ করীমের কলকাতার বাল্যজীবনের বন্ধু। দেশ বিভাগের পর দুজনেই, কিছু আগে-পিছে, ঢাকায় চলে আসেন। আলী কবির পরে যাঁকে বিয়ে করেন নূরুন্নাহার, ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাস চামেলি হাউসের বাসিন্দা। একই হোস্টেলে ঠাঁই পেয়েছিলেন, যিনি পরবর্তীকালে আমার স্ত্রী। দুজনের মধ্যে ছিল সখ্য আর সেই সূত্রে কীভাবে যেন আলী কবির আমার বন্ধু হয়ে গেলেন। আলী কবিরই আমাকে রশীদ করীমের কাছে নিয়ে যান। সেই তরুণ বয়সের রশীদ করীমের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করছি। রশীদ করীম তখনো তাঁর লেখক পরিচয়ে দেখা দেননি।
উত্তম পুরুষ প্রকাশের পর রশীদ করীম ও আমার মধ্যে বন্ধুত্বের এক নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। দুই বছরের মধ্যেই তিনি তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস প্রসন্ন পাষাণ উপহার দিলেন। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পূর্বমেঘ পত্রিকার সম্পাদক। আমি আবু হেনা মোস্তফা কামালকে দিয়ে প্রসন্ন পাষাণ-এর একটা রিভিউ লিখিয়ে নিলাম।
বেশ দীর্ঘ এক বিরতির পর রশীদ করীম লিখলেন তাঁর তৃতীয় উপন্যাস আমার যতো গ্লানি। এরপর তিনি পেছনে ফিরে তাকাননি—একটির পর একটি উপন্যাস তাঁর বেরিয়েছে ও তাঁকে বাংলাদেশের একজন অগ্রণী উপন্যাসিকের সম্মান ও স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
প্রথম দুটি উপন্যাসে রশীদ করীম তাঁর কলকাতার জীবনকে উপজীব্য করেছেন। আমার যতো গ্লানির পর থেকে তাঁর উপন্যাসের পটভূমি ঢাকা। আমার মতে, এই তৃতীয় উপন্যাস—আমার যতো গ্লানি তাঁকে তাঁর বিশিষ্টতায় চিহ্নিত করল। তাঁর যে গদ্য-ভাষার জন্য আজ তিনি সব মহলে পরিচিত, সেই গদ্য-ভাষাও এই উপন্যাসে প্রথম চমক দেখাল।
১৯৭৩-এর মাঝামাঝি আমি আমার রাজশাহী পর্ব শেষ করে ঢাকায় চলে আসি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতার শুরু তখন থেকে। থাকি শহর ঢাকায়। সাভারে যাই শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনে, সারা দিন থাকার প্রয়োজন নেই। তাই দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসি ঢাকায়। এ সময় আমার পুরোনো বন্ধু শামসুর রাহমানকে নিয়ে প্রায়ই রশীদ করীম চলে আসেন আমার বাসায়। বা আমি ও রশীদ করীম দুজন হানা দিই শামসুর রাহমানের পুরান ঢাকার বাসায়। প্রায়ই সেখানে দুপুরের খাওয়ার আয়োজন থাকে। জোহরা ভাবির হাতের রান্না খেয়ে, গল্পগুজব করে ফিরে আসি যে যার ডেরায়। মাত্র কদিন আগে জোহরা ভাবিও এ জীবনের পাট গুটিয়ে চলে গেলেন। রশীদ করীম ও জোহরা ভাবি দুজনের মৃত্যু একই দিনে, কয়েক ঘণ্টা আগে-পিছে।
বন্ধুত্ব দাবি করে এক বিশেষ ধরনের প্রতিভা। সেই প্রতিভা নিয়েই জন্মেছিলেন রশীদ করীম। আমি যখনই পেছন ফিরে তাকাই ও আমাদের তিন বন্ধুর আড্ডার কথা ভাবি, পরিষ্কার দেখতে পাই, সেই আড্ডার মধ্যমণি হচ্ছেন রশীদ করীম। শামসুর রাহমান বরাবরই একটু লাজুক প্রকৃতির। আমি? ঠিক লাজুক না হলেও, আড্ডা জমানোর মতো কেউ নই। সে কাজটা করতেন রশীদ করীম। আড্ডায় তাঁর প্রিয় প্রসঙ্গগুলো ছিল সাহিত্য, রবীন্দ্রসংগীত, ক্রিকেট। রশীদ করীম কবি ছিলেন না, তবে কবিতার পাঠক ছিলেন—রসজ্ঞ পাঠক। এ না হলে শামসুর রাহমানের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অত গাঢ় হতো না। আমাকে প্রায়ই একটা প্রশ্ন করে বিপদে ফেলতেন—আমি শামসুর রাহমানকে কবি হিসেবে শ্রেষ্ঠার বিচারে কোথায় জায়গা দেব। আমি আমার মতো করে একটা জবাব দিতাম। মনে হতো, তিনি আরও নির্দিষ্ট করে জানতে চান—কত উচ্চ শামসুর রাহমানের স্থান, কবি হিসেবে, যেন আমার সিদ্ধান্তের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। তাঁর নিজের খ্যাতি ও কীর্তি সম্বন্ধেও তাঁর একটা অবুঝ কৌতূহল ছিল। প্রশংসার ব্যাপারে তাঁর যে দুর্বলতা—মানুষী দুর্বলতা, সেটা আমি তাঁর চরিত্রের একটা দিক বলেই ভেবেছি। যেকোনো প্রশংসাই তাঁর কাছে মূল্যবান ছিল এবং তাঁর মনে স্থায়ী জায়গা করে নিত। অবশ্য অন্যের প্রশংসায়ও তিনি যে অকৃপণ ছিলেন। এর অনেক প্রমাণ আমি পেয়েছি। আমার গদ্যের তিনি যে প্রশংসা করতেন, সে জন্য আমার শব্দের সীমানা বইটি তাঁকে উ ৎ সর্গ করি। আমার কবিতা সম্বন্ধে তিনি অতটা উ ৎ সাহী ছিলেন না, তবে বিশেষ কবিতার প্রশংসা করতে সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন।
জ্যেষ্ঠ লেখক হিসেবে তিনি তরুণ লেখকদের প্রতি তাঁর সজাগ দৃষ্টি মেলে রাখতেন—এটা তাঁর চরিত্রের এক মহ ৎ দিক। তাদের লেখা বই পড়া ও প্রশংসনীয় কিছু পেলে তার প্রশংসা করা, কখনো লেখায়, কখনো বলায়—তাঁর একটি চম ৎ কার অভ্যাস ছিল। তাঁর নিজের প্রশংসা-কাতরতার শেষে প্রায় পুরোটাই কেটে যায়, যখন তাঁর এই গুণটির কথা ভাবি।
রশীদ করীমের উপন্যাসে ব্যক্তিই প্রধান—সমাজ নয়। তবু সমাজের উপস্থিতি আমরা ঠিকই টের পাই। স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে যে জটিলতা, যে রহস্য, যে সূক্ষ্মতা—সেদিকই তাঁর মনোযোগ ছিল বেশি। এবং এটাকেই তিনি তাঁর সব উপন্যাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় করেছেন। এটা তাঁর বিশেষ এলাকা। এ বিষয়ে তাঁর এক বিশেষ অন্তর্দৃষ্টি ছিল। আর এরই কারণে তাঁর উপন্যাসগুলো পাঠকের জন্য আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে। রশীদ করীমের উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলো তাঁর সৃষ্টির অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—শুধু এই চরিত্রগুলোকে নিয়ে কেউ একজন একটা বই লিখতে পারেন, যদি সেই যোগ্যতা তাঁর থাকে।
রশীদ করীম বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে—একজন লেখকের এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০২, ২০১১

%d bloggers like this: