জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করিতে যাই। দেখিলাম, কবি একখানি কুশনের উপরে উপবিষ্ট রহিয়াছেন, আরো দুই একজন সাহিত্যিক চেয়ারে এবং কতগুলি ছোকরাপানা সাহিত্যিক গালিচার উপরে কবির এদিক ওদিক অত্যন্ত বিনীত ভাবে বসিয়া রহিয়াছেন। আমাকে দেখিয়াই কবি বলিলেন—“এই যে তুমি এসেছ! বেশ ভালই।”—তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া তাঁহার পার্শ্বে আসন গ্রহণ করিলাম। তিনি বলিলেন “তোমার গানগুলো পেয়ে প্রথম যে রকম আশা করেছিলাম তা পাই নাই। ক্ষিতি বাবুর গান বেশ সুন্দর ও চমত্কার সংগ্রহ। ক্ষিতি বাবুর সঙ্গে তোমার আলাপ আছে? তাঁর সাথে তোমার আলাপ হওয়া দরকার।—তবে তুমি যে গানগুলো সংগ্রহ করেছো, এ গুলোর Historical Value আছে এবং সেদিকে এর দাম খুবই বেশী।”
আমি বলিলাম—“ক্ষিতি বাবুর সঙ্গে আলাপ করবো।—আমি গানগুলো সংগ্রহ করেছি, এর কারণ এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
কবি বলিলেন,“হ্যাঁ, আমিও জানি গোঁড়া মুসলমানেরা এগুলো মারতে চাচ্ছেন কিন্তু এটা কি ঠিক? এগুলো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত্তি সৃষ্টি। ভগবানের সৃষ্টি নষ্ট করাও যা এগুলো নষ্ট করাও তা। এগুলো নষ্ট করলে ভয়ানক ক্ষতি করা হবে। কেন যে এরা এগুলো নষ্ট করতে চান তা আমি বুঝি না। মুসলমানেরা যেমন এগুলো পছন্দ করেন না। হিন্দূরাও তেমনি অপছন্দ করতে পারেন। কেন না কোরানের অনেক কথা এর মধ্যে হুবহু আছে, অনেক Technicalities আছে যা মোটেই হিন্দূদের নয়।”
আমি বলিলাম, “ভারতের Cultural History লিখতে গেলে এ গান গুলোর খুবই দরকার আছে।” কবি বলিলেন “হিন্দূ মুসলমানের সমন্বয়ের সময়কার মানুষ ছিলেন দাদু কবীর প্রভৃতি, তাঁরা ছিলেন, উচ্চস্তরের মানুষ, তারা (গান রচয়িতারা) সেই ধরনের মানুষ, তবে নিম্নস্তরের। আর নিম্নস্তর দিয়েই এই স্রোতটা বয়ে চলছিল। তুমি যখন বলছ তখন তোমার বইয়ের একটা ভূমিকা লিখে দেবো, চলো না—তুমি আমাদের বিশ্বভারতী দেখে আসবে।”
আমি আপত্তি জানাইয়া বলিলাম, “আমার পরীক্ষা সন্নিকট, কাজেই যাওয়া সম্ভবপর নয়, যদি সময় করিয়া উঠিতে পারি তবে একবার চেষ্টা করিয়া দেখিব”—কবিকে অভিবাদন করিয়া সেদিনকার মতো উঠিয়া পড়িলাম।
ইহা কয়েক দিন পরের কথা। জনৈক সাহিত্যিক বন্ধুর মুখে শুনিলাম—পৌষ সংক্রান্তিতে শান্তি-নিকেতনে নাকি উত্সব হয়, তারপরে গরম গরম কাজ না করিলে ভূমিকা পাওয়া দুঃসাধ্য হইবে কাজেই শান্তিনিকেতনে যাওয়া মনস্থ করিলাম।
১৩ই জানুয়ারী রওয়ানা হইয়া বোলপুর আসিলাম, শান্তিনিকেতন হইতে মটরবাস আসিয়াছিল। …শান্তি নিকেতন বেশ সুন্দর যায়গা, চারিদিক গাছ। সত্যই এটা একটা আশ্রম, মন এই সবুজের সহজ সুরে অতি অনায়াসে আকৃষ্ট হয়। চারিদিকে একটা শ্রী ও সৌন্দর্য্য এলাইত হইয়া রহিয়াছে। গাছের সারির মধ্য দিয়া পথ, এখানে সেখানে বাড়ী, ভারি চমত্কার।…
লাইব্রেরীতে শ্রীবিধুশেখর শাস্ত্র মহাশয়ের সাথে দেখা করিলাম। তিনি বেশ সুন্দর লোক, সেকেলে পণ্ডিতের মত, কিন্তু ব্যবহার অতি অমায়িক, বেশ ভূষায় অত্যন্ত সরল, আমাকে খুব স্নেহের সহিত আদর করিলেন।—সুধী অধ্যাপক শ্রীক্ষিতি মোহন সেন মহাশয়ের কাছে গেলাম। সুগৌরবর্ণ, বলিষ্ঠ চেহারা, পল্লীগান সংগ্রহ সম্বন্ধে তাহার সহিত কথাবার্ত্তা হইল।
শাস্ত্রী মহাশয়কে সাথে করিয়া কবির বাসায় পৌঁছিলাম, তখন কবি গান করিতে ছিলেন;—“আমার মাঝে তোমার মায়া জাগালে হে নাথ।” খানিকক্ষণ আমরা অপেক্ষা করিলাম, প্রায় ১৫ মিনিট। তখনও কবির গান থামে নাই, কাজেই শাস্ত্রী মহাশয় বলিলেন “এখন ওর গান রচনার সময় এসেছে কাজেই সেটা নষ্ট করা উচিত নয়। আমি ওঁকে সুনীতি বাবুর চিঠিটা রেখে আসি”—তিনি তাহার কাছে গেলেন, খানিক পরে ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন—কাল সকালে আসিতে বলিলেন।
তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে, ছেলেরা উপাসনায় রত, আমিও সমবেত উপাসনায় যোগদান করিলাম। খানিক পরে ছেলেরা খাইতে গেল। ছেলেদের বেশ সুন্দর Cooperation দেখিলাম। তাহাদের নিজেদের খাবার নিজেরাই বন্দোবস্ত করে।
পরদিন সকাল বেলা উঠিয়া অমিয় চক্রবর্ত্তীকে সাথে করিয়া কবির বাসায় গেলাম। তখন তিনি শ্রীদীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়কে সাথে করিয়া ‘অচলায়তনের’ জন্য মেয়েদিগকে গান শিখাইতে ছিলেন। অমিয় বাবু কবিকে গিয়া আমার কথা বলিলে তিনি গান শেষ হইলে আমাকে যাইতে বলিলেন।
প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে গান শেষ হইলে কবির কাছে উপরে গেলাম, কবি আমাকে বলিলেন—“দেখ আমার নিজের বাউল নিয়েই পাগল, এর পরে আবার তোমাদের বাউল, দেখ, আমার অবসর আছে? সকাল ৫টাতে উঠেছি, এই এতক্ষণ গান শিখাইলেম। কাল রাতে ৩\০ টায় শুয়েছি। আমি বেশি কিছু লিখতে পারব না, মাত্র দুই চার ছত্র লিখে দিবো।”
আমি বলিলাম—“যা পারেন দিন, আপনি Persian teacher এর কথা বলেছিলেন তা আমার friendকে লিখেছি, তবে মাইনে কিছু বেশি দিতে হবে”—
“হ্যাঁ, দাও আমাকে এনে, তিনি এখন কি করেন?”
“তিনি এখন শোয়াশ’ টাকা মাইনের একটী চাকরী করেন। আপনি গোটা আশি টাকা দিলে তিনি আসবেন বোধ হয়। আমার কিন্তু এখানে থাকতে ভারী ইচ্ছে হচ্ছে, জায়গাটী আমার ভারী সুন্দর লেগেছে। আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনার এখানে নিশ্চয়ই আসব, আপনি ডাকলেই আসব।”
“তোমরা এস, তোমরা এলেই বেঁচে যাই। জানো, মুসলমানেরা মনে করে আমরা তাদের থেকে দূরে, হিন্দূরাও তাই করে। আমরা পড়ে গেছি ফাঁকে। তোমরা এস, তাহলেই খুবই খুসী হ’ব। জানো হিন্দূমুসলমানের মিলন নিয়ে কথা হচ্ছে, এটা এই মনের মিল না হ’লে হবে না। আমরা এখানে এই মনের মিলের আয়োজন করছি। মানুষের এই মিলনই সত্যিকারের মিল। আত্মার আহার্য্যই হচ্ছে সর্ব্বপ্রধান, তারপরে হচ্ছে পেটের আহার্য্য, এই দুখানে মিল হলেই সত্যিকারের মিল হবে। সুরুলে আমরা Ecnomic basis এ কার্য্য আরম্ভ করেছি। সেখানে যে কাজ করছি, তাতে হিন্দূমুসলমানের উভয়েরই উপকার হচ্ছে। রাজনীতির প্রয়োজনের খাতিরে যাঁরা মিলল চান, সে মিলন ঘটলে ত স্থায়ী হবে না, কেননা প্রয়োজনের দরদামে কসা।”
আমি বলিলাম যে—“ঢাকার দলকে বোধহয় একটু জানেন, তারা Cultural হিসাবে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে।”
“হ্যাঁ, জানি, আবদুল ওদুদ অতি চমত্কার সমালোচনা লিখেছে। —তোমরা এলেই আমাদের কাজ কারবার সুবিধে হ’বে। এখানে এসে কারুরই গোড়ামী থাকে না, এ জায়গার এমনি গুণ অতি গোড়া ব্রাহ্মণ ফকিরের ছেলে এসেও এক সাথে বসে খায়।”
ইহার পর উঠিয়া তাহার উপরে কামরায় গেলাম। তিনি ভূমিকা লিখিতে আরম্ভ করিলেন, আমি বসিয়া রহিলাম। …কবি লিখিতে লাগিলেন প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরিয়া লিখিলেন pad এর তিন সিট কাগজ লিখিলেন। লেখা শেষ করিয়া বলিলেন আজকার সকাল বেলাটা তোমরাই কেড়ে নিলে। তখন প্রায় পোনে বারোটা, আমার কবিকে সালাম করিয়া চলিয়া আসিলাম। (সংক্ষেপিত)
[দুই]
‘প্রবাসী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত লালন ফকিরের কয়েকটি গান প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গানগুলি পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম। তারপর রবীন্দ্রনাথের মতো মহান ব্যক্তিত্ব এই ধরনের সংগ্রহ-কাজ করছেন ব’লে উত্সাহিত হ’য়ে উঠলাম। আমাদের গ্রামের এক বৈরাগীর গান শুনলাম। আমার লোক-সংগীতের প্রথম উত্সাহদাতা রবীন্দ্রনাথ আর নামহীন ঐ বৈরাগী।
আমরা ছিলাম খুব গরিব। শিলাইদহে বিরাহিমপুর পরগনার মাদার তলায় আমাদের এবং আমাদের গ্রামের অনেকের জমিজমা ছিলো। …ঠাকুর-পরিবারের জমিদারির অন্তর্গত ছিলো সে-সব। আমি যখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আইএসসি পড়তে যাই—১৯২২-২৩ সালের দিকে—শুনলাম রবীন্দ্রনাথ এসেছেন। এক ভদ্রলোক আমাকে রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে যান; সেই আমি প্রথম দেখি রবীন্দ্রনাথকে। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেখানে ছিলেন। …সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। রবীন্দ্রনাথের কাছে।
আমার সংগৃহীত লোকগীতি পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিলো। এগুলো একত্র করে ছাপতে দিই। …আমার সাধ হয়, রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে এই বই-এর ভূমিকা লিখিয়ে নেবো। এই উদ্দেশ্যে সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি নিয়ে শান্তিনিকেতনে যাই। শান্তিনিকেতন গেস্ট হাউজে উঠি। রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারি ছিলেন তখন [১৯২৬-৩৩] কবি অমিয় চক্রবর্তী। গিয়ে দেখি তাঁর বিদেশিনী স্ত্রী বাংলা শিখছেন। …যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় এবং আরজি পেশ করি। রবীন্দ্রনাথ তখন পৌষ সংক্রান্তির দিনে কি-একটা নাটক হবে, তাই নিয়ে ব্যস্ত। বললেন, আমার বাউল নিয়েই আমি পারছিনে, তুমি আর এক বাউল নিয়ে এলে হে? ঠিক আছে এসেছো যখন, দু লাইন লিখে দেবো। আমি তাই নিয়েই খুশি। আমার সংগ্রহের তাড়াটি রবীন্দ্রনাথের কাছে দিয়ে আমি অ্যান্টি-রুমে গিয়ে বসলাম। অ্যান্টিরুমে বসে আছি, বুক দুরু দুরু করছে, দোয়া-দরুদ পড়ছি—না জানি কি লিখে দ্যান। কিছুক্ষণ পরে আমাকে ডেকে আমার নামটি লিখে দিতে বললেন একটি কাগজে। আবার এসে অ্যান্টিরুমে ব’সে বুক-দুরুদুরু করা অপেক্ষা। এক্ষুণি হয়তো ডাকবেন—ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুক্ষণ পরে ডাকলেন। গিয়ে দেখি লম্বা লেখা—তিন স্লিপ। রবীন্দ্রনাথ বললেন, তুমি আমার দিনটাই নিয়ে গেলে। আমি তো মহাখুশি। অন্য সবাইকে দেখালাম, তাঁরাও বললেন, গুরুদেব প্রচুর প্রশস্তি লিখে দিয়েছেন আপনার। এই ভূমিকাটিই শিরোধার্য ক’রে “হারামণি” প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। এটি ‘প্রবাসী’তেও প্রকাশিত হয়েছিল। সেবার শান্তিনিকেতনে ওঁদের অনুরোধে ওমর খৈয়াম বিষয়ে একটি বক্তৃতাও দিয়েছিলাম।
পরে “হারামণি”র অন্য একটি খণ্ডের জন্য আবার রবীন্দ্রনাথের সম্মুখীন হয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তখন এতো ব্যস্ত যে ভূমিকা লিখে দিতে পারেননি। তবু একেবারে বঞ্চিত করেননি। একটি আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন। ২৩ জুলাই ১৯৩৭ সালে লেখা এই আশীর্বাণীটি এই:
তোমার গ্রাম্য গীতি সংগ্রহের অধ্যবসায় সফলতা লাভ করুক এই আমি কামনা করি।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শেষ দেখা হয় আমার ১৯৪০-এর দিকে, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর সময়। রবীন্দ্রনাথ আমাকে চিনতে পারেন। বলেন, ‘তুমি লালন ফকিরের গান সংগ্রহ করছো না?’ তাঁর শরীর তখন ভেঙে গেছে একেবারে।

গবেষণা
রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ
ভূঁইয়া ইকবাল
প্রকাশ করছে:
প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ২৯, ২০১০