নওয়াজেশ আহেমদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৯ সালে, যখন বাঙালির স্বাধিকারের চেতনা সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে। আমরা জানি যে বাঙালির স্বাধীনতার পেছনে যেসব অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল তার মধ্যে বাঙালির রবীন্দ্র চেতনা অন্যতম প্রধান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর সময় রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রবিদ্বেষী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়, সেখানে ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, কলিম শরাফী তাঁদের সঙ্গে নওয়াজেশ আহ্মদের নামটিও স্মরণ করতে হয় বৈকি। আমরা প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করি রমনা পার্কের বটমূলে (বৃক্ষটি আসলে অশ্বত্থ বৃক্ষ, তবে লোকমুখে চলতে চলতে বটবৃক্ষ হয়ে গেছে—ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। কেননা বট, অশ্বত্থ, পাকুড় এসবই একই বংশের—ফাইকাস)। এই বৃক্ষের সন্ধানও নওয়াজেশ ভাই ছায়ানটকে দিয়েছিলেন। নওয়াজেশ ভাইয়ের যেমন মানবপ্রেম ছিল প্রগাঢ়, ঠিক একইভাবে তিনি ভালোবাসতেন প্রকৃতিকেও। নওয়াজেশ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় যদিও ’৬৯ সালে, তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আমার আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে। সেই সময় থেকে তাঁর প্রয়াণ পর্যন্ত আমি লক্ষ করেছি, নিসর্গের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। একবার আমরা ঈদের সময় গোটা পরিবার কক্সবাজার গিয়েছিলাম। সেখানে একটি ক্যামেরা ছিল আমার হাতে। সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ করলাম, লতা-গুল্মজাতীয় বেশ কিছু গাছ আমার পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এই গুল্মের ডগায় ডগায় ছিল বেগুনি রঙের ফুল। ভীষণ সুন্দর। আমি দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। ঢাকায় ফিরে এসে নওয়াজেশ ভাইকে ছবিগুলো দেখিয়ে বললাম, ‘বুনোফুলের কিছু ছবি তুললে কেমন হয়?’ নওয়াজেশ ভাই আনন্দে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘আরে, আমিও তো অনেক দিন ধরেই এ বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। চলো, আমরা একসঙ্গে কাজটি শুরু করি।’ তারপর দীর্ঘ দুই বছর ধরে আমরা দুজন বাংলাদেশের বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার এ সময়কার অভিজ্ঞতা আমি আমৃত্যু মনে রাখব। অযত্নে, নির্জনে বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, বনে-বাদাড়ে ফুটে থাকে কত শত বুনোফুল, যা আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু একটু খোঁজ করলেই নজরে পড়ে সেগুলোর উপস্থিতি। আমি আর নওয়াজেশ ভাই যখন বুনোফুল নিয়ে কাজ করছি, তখন গ্রামের মানুষের মুখে প্রায়ই শোনা যেত, ‘এই দুইটা পাগল, খালি জংলি ফুলের ছবি তোলে।’ এ নিয়ে আমি আর নওয়াজেশ ভাই পরে অনেক হাসাহাসি করেছি। তবে ক্রমে ক্রমে এসব ছবির একটি ভাণ্ডার গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশিত বুনোফুলের অ্যালবাম প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। তার নাম ছিল ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ারস অব বাংলাদেশ। নওয়াজেশ ভাইয়ের এই গ্রন্থটিতে আমার তোলা কিছু ছবিও ঠাঁই পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নওয়াজেশ ভাই তাঁর নিজের তোলা ছবিগুলো নিয়ে সাহিত্য প্রকাশ থেকে বাংলায় ওই একই বিষয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বুনোফুলের ছবি তোলা ছাড়াও আমরা বিভিন্ন সময়ে নিসর্গ সন্দর্শনে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মহাস্থানগড়, দিনাজপুর, পাহাড়পুর, সিলেটের চা-বাগান, ঢাকার অদূরে শিবালয়ে ছিল যে অশ্বত্থগুচ্ছ, সেখানে একাধিক অশ্বত্থ গাছ হেলেদুলে বড় হয়েছে। একসঙ্গে দেখলে মনে হয় যেন কোনো ভাস্করের কাজ। এখানেও একাধিকবার গিয়েছি আমরা। এ ছাড়া আমার গ্রামের বাড়ি রতনপুরেও নওয়াজেশ ভাই আর আমি একাধিকবার একসঙ্গে ভ্রমণ করেছি। তাঁর সাহচর্যে এই ভ্রমণ ছিল নিতান্ত আনন্দদায়ক। অতি তুচ্ছ বিষয়েও তিনি এমন সব মজার মজার গল্প করতে পারতেন, যা তুলনারও অধিক। বেশির ভাগ গল্পই তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত। এসব ঘটনার অনেক কিছুই তিনি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তাঁর একটি গ্রন্থের একটি প্যারাগ্রাফ এখানে তুলে দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
‘বনবনানী ধ্বংস হয়ে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায় বিহঙ্গের কলকাকলি—সেই সঙ্গে নিসর্গের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্য ও অনুভূতিও বিলীন হয়ে যায়। কালক্রমে রয়ে যায় শুধু এক অস্পষ্ট স্মৃতি। আর অতি দূরভবিষ্যতে তার পুনরাবির্ভাবের এক ক্ষীণ আশা—এই সহজাত প্রত্যাশাই জিইয়ে রাখে মানবমনের গহনে প্রগাঢ় নিসর্গের অতীন্দ্রিয় অস্তিত্বেও এক আশ্বাস—
পরিবেশ আজ দূষিত বিত্রস্ত। নিসর্গ তবুও তার আপন ভুবনে ক্রিয়াশীল—কখনো সাবলীল আবার কখনো আতঙ্কিত। সব মিলে এই প্রকৃতি, জীব ও জড় উপাদানে সম্পৃক্ত, সদা স্পন্দিত।’
প্রতিবছর রাশ উত্সবে পূর্ণচন্দ্রে এখানে রাশ মেলা হয়, সিলেটের মাধবপুরে। সারা রাত ধরে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে রাশের উত্সব চলে। একবার নওয়াজেশ ভাইয়ের উদ্যোগে ঢাকা থেকে আমরা একটা বিরাট দলে রাশ উত্সব দেখতে মাধবপুর গিয়েছিলাম। সেই উত্সবে ঢাকার অনেক সংগীতশিল্পী এবং নৃত্যশিল্পীও ছিলেন। নাট্যশিল্পীর মধ্যে ছিলাম আমি আর সারা। ওয়াহিদ ভাই (ওয়াহিদুল হক) এবং সন্জীদা আপাও (সন্জীদা খাতুন) ছিলেন। আমরা সারা রাত জেগে হইহই করে উত্সবে মেতেছিলাম। সে রাতে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। নওয়াজেশ ভাই সমমনা দু-চারজনকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গিয়েছিলেন। আমার মনে পড়ে, জোত্স্নাভেজা সেই রাতে চা-বাগানের দৃশ্য হূদয়ে গেঁথে গিয়েছিল।
গত ঈদে আমরা গিয়েছিলাম থাইল্যান্ডের চিয়াংমাইয়ে। সেখান থেকে চিয়াং রাই হয়ে গোল্ডেন ট্রায়াংগেলে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেখানে এসে মিশেছিল রুয়াক ও মেকং নদী। এই মেকং নদী সম্বন্ধে কত গল্পই না শুনেছি আমি নওয়াজেশ ভাইয়ের কাছে। তাঁরই পরামর্শে ওই ঈদের ছুটিতে আমরা ছুটে গিয়েছিলাম গোল্ডেন ট্রায়াংগেলে। ফিরে এসে নওয়াজেশ ভাইকে সে কথা বলায় কত খুশিই না হয়েছিলেন! অতি সমপ্রতি আমরা বন্ধুবর আসাদুজ্জামান নূরের বাসায় নৈশভোজের ফাঁকে ফাঁকে পরিকল্পনা করছিলাম একসঙ্গে মিয়ানমারে বেড়াতে যাব। নওয়াজেশ ভাই আমাকে সেই দুর্লভ সুযোগটুকু আর দিলেন না।
এ হেন নওয়াজেশ ভাই এমন হঠাত্ করে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন কখনো ভাবিনি আমরা। আমাদের মধ্য থেকে আমাদের সবচেয়ে আধুনিক মানুষটি চলে গেলেন। এই অভাব পূরণ হবে না সহজে।

আলী যাকের
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৫, ২০০৯