অধুনা বাংলার অনবদ্য ইতিহাস

বাংলার মাটি বাংলার জল—রফিক কায়সার \ নভেম্বর ২০০৯ \ প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা \ প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী \ ৮৭ পৃষ্ঠা \ ১২০ টাকা

কোনো গ্রন্থের সমালোচনা লিখতে গেলেই আমার আন্তন চেখভের কথা মনে পড়ে। চেখভ একবার ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘সমালোচকেরা হলেন ঘোড়ামাছির মতো। ঘোড়ামাছির কাজ সারা দিন ভনভন করা। সে কেবলই ভনভন করে আর বলে, “দ্যাখো, আমি কী চমত্কার ভনভন করতে পারি”!’ যাই হোক।
প্রথমা প্রকাশন থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত রফিক কায়সারের বাংলার মাটি বাংলার জল গ্রন্থটি নানা কারণে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার দাবি রাখে। এর লেখক রফিক কায়সার কমলপুরাণ-এর লেখক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। কমলকুমার মজুমদারের ওপর লেখা বইটি দুই বাংলায় সাহিত্যের বোদ্ধা পাঠকমহলে ব্যাপক পঠিত। এককালে তিনি কবিতা লিখতেন। সেখান থেকে সরে আসেন গদ্যের জগতে, এটাই তাঁর উপযুক্ত ক্ষেত্র বুঝতে পেরে। তাঁর গদ্য অত্যন্ত পোয়েটিক, যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চুম্বকের মতো টানতে থাকে। কমলপুরাণ-এ তিনি সাহিত্যের প্রসঙ্গ নিয়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি সাহিত্যের বিষয়আশয়ে আর আগ্রহবোধ করেননি। তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ও বাঙালি মুসলমান। তিনপুরুষের রাজনীতি এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ। তিন পুরুষের রাজনীতির ধারাবাহিকতা বাংলার মাটি বাংলার জল-এ সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ ও বাঙালি মুসলমান এখানে মুখ্য বিষয় হলেও শেষ পর্যন্ত এটি প্রচলিত ইতিহাসগ্রন্থ হয়ে থাকেনি, এখানেই আমাদের স্বস্তি।
বাঙালির ইতিহাস নানা কারণে বাঙালির কাছে কখনো সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
ইতিহাস রচয়িতার সাম্প্রদায়িক মানস সব সময় উত্তরের ইতিহাসকে দক্ষিণে, দক্ষিণের ইতিহাসকে উত্তরে এনে ফেলে দিয়েছে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একবার যদুনাথ সরকারের আওরঙ্গজেবের ইতিহাস প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন, যদুনাথ সরকার আওরঙ্গজেবের ওপর চমত্কার ইতিহাস লিখেছেন বটে, তবে তিনি যখন লেখাটির উপসংহার টানেন এই বলে যে, ‘আওরঙ্গজেবের মাত্রাতিরিক্ত ইসলামপ্রিয়তা তাঁর সমস্ত গুণাবলিকে বিনষ্ট করিয়া দিল’, তখন আবদুর রাজ্জাকের ভাষায়—‘তাঁর শেষ এই পঙিক্ত পড়িয়া আমার জিহ্বা তিতা আফিম হইয়া গেল।’ ঐতিহাসিক যদি নির্মোহ, উদার ও নিরপেক্ষ না হন, তাহলে তাঁর রচিত ইতিহাস স্থানচ্যুত হতে বাধ্য। আনন্দের কথা এই যে, রফিক কায়সার বাংলার প্রকৃত ইতিহাসকে যথাযথ অবস্থায় আলোতে আনার চেষ্টা করেছেন একজন তৃতীয় পক্ষ হয়ে, যাঁর কোনো পক্ষের প্রতিই বিশেষ কোনো মোহ নেই।
সাকল্যে ছয়টি প্রবন্ধ ঠাঁই পেয়েছে গ্রন্থটিতে। পরিশিষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি গ্রন্থালোচনা ও গ্রন্থপঞ্জি। প্রতিটি প্রবন্ধই এর আগে কালি ও কলমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সচেতন পাঠকমাত্রই প্রায় লেখাগুলো সম্বন্ধে কম-বেশি অবহিত। প্রবন্ধগুলোর মধ্যে আমার মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তরিকায়ে বাঙাল। রফিক কায়সার বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস, বাঙালি মুসলমানের পশ্চাত্পদতার কাহিনি, ইংরেজদের সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির সূক্ষ্ম কূটজাল, কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের বাঙালি মুসলমানদের পুনরুত্থানে মাথাব্যথা প্রভৃতি প্রসঙ্গ অত্যন্ত চমত্কারভাবে রসালো ভাষায় তুলে ধরেছেন এখানে।
আরেকটি সুখের কথা এই যে, পুস্তকপীড়িত পণ্ডিতদের মতো রফিক কায়সারের কোনো লেখাই অহেতুক নির্ঘণ্টে ভারী হয়ে ওঠেনি। ফলে পাঠকের হাঁপিয়ে ওঠার কোনো আশঙ্কা নেই। গ্রন্থটি কলেবরে ছোট হলেও অত্যন্ত মূল্যবান তথ্যে এটি সমৃদ্ধ, যা ছাত্র-লেখক-গবেষক সবার জন্য খুবই গুরুত্ববাহী। প্রথমা প্রকাশন মূল্যবান এমন একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে সময়ের দাবিই পূরণ করেছে।

সায়ীদ আবুবকর
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ২১, ২০১০