kamrul hasan

বইপত্র
পটুয়ার নান্দনিক জীবনকথা
আখতার হুসেন

বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা: কামরুল হাসান \ সংগ্রহ ও সম্পাদনা: সৈয়দ আজিজুল হক \ প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন \ প্রকাশকাল: জুন ২০১০ \ প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী \ মূল্য: দুই শ আশি টাকা

১৯৪৭ সালের পর থেকে সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তানের মাটিতে শিল্পের কোনো মাধ্যমেরই চর্চার পথ সুগম ছিল না। সংগীত, নৃত্য ও নাট্যচর্চার পথে দুস্তর বাধা তো ছিলই, তার চাইতেও বেশি বাধা ছিল চিত্রশিল্পচর্চার ক্ষেত্রে। তারই দিব্য সাক্ষ্য মিলছে কামরুল হাসানের এ রকমের ভাষ্য থেকে, যেখানে তিনি বলছেন, ‘আমি তখনো কলকাতায়। মাঝে ঢাকায় এসে ঘুরে গেছি। আমি ১৯৪৭ সালে কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে মাত্র পাস করে বের হয়েছি। আমার শরীরে তখনো ছাত্রের গন্ধ রয়েছে। আমি তখন বেকার। ঢাকায় পাকাপাকিভাবে চলে আসব, এমন সময় শিল্পী জয়নুল আবেদিনের জরুরি খবর পেলাম। শিগগিরই ঢাকায় চলে আসবে, আর্ট স্কুল গড়ে তোলার জন্য কাজ করতে হবে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকাপাকিভাবে ঢাকায় চলে এলাম। শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা নিয়ে এ সময়ে ফাইলপত্র যাওয়া-আসা করছে। একটা প্রাসঙ্গিক ঘটনা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। অবিশ্বাস্য হলেও তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল। তখনকার কোনো একজন এডিপিআই ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সোজা লিখে দিয়েছিলেন “পাকিস্তান যেহেতু ইসলামি রাষ্ট্র, সে জন্য এ দেশে ছবি আঁঁকার শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো স্কুল হতে পারে না।” পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাস আগে যেখানে আমরা কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে মুসলিম আর্ট এক্সিবিশন করলাম, মাত্র কয়েক মাস পর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরমুহূর্তে আমাদের ওপর এমনই আঘাত আসবে নবপ্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা-সংস্কৃতি দপ্তর থেকে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। এডিপিআই যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা ধোপে টেকেনি। তখন ডিপিআই ছিলেন বৈজ্ঞানিক ড. কুদরাত-এ-খুদা। তাঁর অফিস তখন চট্টগ্রামে। তাঁর সঙ্গে আলোচনার জন্য আমরা ছুটে যাই চট্টগ্রামে। শিল্পী জয়নুল আবেদিন, আমি, সফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হকসহ চট্টগ্রামেই তাঁর সঙ্গে দেখা করি। ড. কুদরাত-এ-খুদার ঐকান্তিক সহযোগিতা ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ সহজ করে দেয়। আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে আর যে দুজন ব্যক্তির সক্রিয় সহযোগিতা ছিল, তাঁর একজন হলেন মরহুম আবুল কাসেম সাহেব। তিনি ছিলেন স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি। অন্যজন হলেন সলিমুল্লাহ ফাহমী। তা ছাড়া অন্যদিকে থেকে যাঁরা এই আন্দোলনে অংশীদার ছিলেন, তাঁরা হলেন স্বর্গীয় অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, আবদুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদ্দীন। তাঁরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।’
দীর্ঘ উদ্ধৃতি পেশ করা হলো কেবল অতীতের সেই ঐতিহাসিক সত্যকে অনুধাবন করার জন্য, যে অতীতকে বাদ দিয়ে আজকের শিল্পকলার অগ্রযাত্রার ইতিহাস কল্পনা করাও কঠিন।
উল্লিখিত এ রকমের ঘটনার পর ঘটনা-সংবলিত তথ্য হাজির করার ভেতর দিয়ে কামরুল হাসান শুরু করেছেন তাঁর বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা বইয়ের প্রারম্ভিক প্রবন্ধ। তাঁর জীবদ্দশায় নানা সময়ে লেখা মোট ১০টি প্রবন্ধের সমাহার এই গ্রন্থ। ঘরোয়া ভঙ্গিতে লেখা তাঁর এই রচনাগুলোর ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে যেমন নিজের জীবনের নানা খুঁটিনাটি বিষয়, তেমনি পাকিস্তানের চরম বিরুদ্ধ পরিবেশে এ দেশে শিল্প-আন্দোলনের পাশাপাশি তার নানা পর্বের নানামুখী প্রবণতার কথাও উঠে এসেছে সমভাবে। সৈয়দ আজিজুল হক প্রবন্ধগুলো কালানুক্রমিকভাবে গ্রন্থভুক্ত করার ফলে কামরুল হাসানের শিল্পীজীবনের ক্রমবিবর্তনগত মানসিকতার রূপটিকেও আমরা প্রতিভাত হতে দেখি।
এ গ্রন্থ সূত্রেই আমরা জানতে পারি কামরুল হাসানের অঙ্কনরীতির মুখ্য মাধ্যম কেন হয়ে উঠল লোকজ ধারানুসারী! তিনি জানাচ্ছেন, ‘ক্ল্যাসিক পেইন্টিং বলতে ভারতের মুঘল, কাংরা বা বাসুলি জাতির কোনো ক্ল্যাসিক চিত্রমালা বাংলাদেশের বর্তমান ভৌগোলিক সীমানার কোনো অংশেই প্রচলিত ছিল বলে আমার জানা নেই।’ ফলে তাঁর সিদ্ধান্ত: ‘বাংলাদেশে জলরঙের মাধ্যমে আঁকা ‘‘পটচিত্র’’ ছাড়া কোনো ক্ল্যাসিক পেইন্টিং দেখতে পাইনি।’ তিনি আরও বলছেন, ‘বাংলাদেশে পেইন্টিং বলতে একমাত্র লোকচিত্রমালাই অতীতের ঐতিহ্য বহন করে এবং গাজীর পট, সত্যপীরের পট, সত্যনারায়ণসহ নানা ধর্মীয় চিত্রমালাই সে ক্ষেত্রে দেখতে পাই। তা ছাড়া আর যা পাওয়া যায় তা কেবল কারুশিল্পের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ।’ এই রকম যাঁর পর্যবেক্ষণ, সেই তিনি স্বাভাবিকভাবে লোকজ শিল্পধারার প্রতিই আমগ্ন নিবেদিত হন এবং যখন তাঁকে ‘পটুয়া’ বিশেষণে বিভূষিত করা হয়, সেটা করা হয় খুবই সংগতভাবে।
গ্রন্থধৃত প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম হচ্ছে ‘আমার কথা: বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন’, ‘রূপসী বাংলার চালচিত্র’, ‘আমার মাস্টার মশাই: জয়নুল আবেদিন’, ‘শিল্পী জয়নুল আবেদিন’, ‘আমার স্কেচ ও প্রেমের ভ্রমরেরা,’ ‘আমার কিছু কথা’, ‘ফেরা ১-৬’, ‘ফর্রুখ ভাই’, ‘জাফর ভাই’ এবং ‘রসমণ্ডিত রশিদ চৌধুরী’।
শেষ তিনটি প্রবন্ধ স্মৃতিতর্পণমূলক। কিন্তু ব্যক্ত সেই স্মৃতির সূত্রেই আলোচিত মানুষগুলোর চরিত্রের দার্ঢ্য, তাদের মানবিক বোধ, সবলতা ও দুর্বলতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। গবেষকদের জন্য শেষোক্ত প্রবন্ধ তিনটি মূল্যবান তথ্যাধার হিসেবে কাজ দেবে।
কামরুল হাসান নিছক শিল্পচর্চাতেই নিরুপদ্রব জীবন যাপন করেননি, বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনে যেমন অংশ নিয়েছেন, তেমনি অংশ নিয়েছেন ঊনসত্তর ও সত্তরের পাকিস্তানি স্বৈরশাসকবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে; শেষত, সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে। বিশ শতকের পাঁচ ও ছয়ের দশকের নানা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। এ সবই সংক্ষিপ্তাকারে হলেও উঠে এসেছে এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোর ভেতর দিয়ে। অবতারণা করেছেন তিনি নিজের পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ঘরোয়া নানা প্রসঙ্গেরও। এবং এভাবেই উঠে এসেছে রক্তমাংসের একজন শিল্পীর স্পন্দনময় জীবনগাথা। যাঁরা এ দেশের শিল্পকলাচর্চার গোড়াপত্তনের ইতিহাস এবং পটুয়া কামরুল হাসান সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, এই বই তাঁদের কাছে মূল্য বহন না করে পারবে না।
এ রকম একটি বই সম্পাদনা করার জন্য আমরা সৈয়দ আজিজুল হককে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাই।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ১১, ২০১১