প্রতি-কবিতার জনককে অভিনন্দন
রাজু আলাউদ্দিন

ক্রিস্তোবাল কোলনের ডিয়ারিও দে আ বোর্দো (ভ্রমণের দিনলিপি), আন্তোনিও পিগাফেত্তার প্রিমের বিরাহে আলরেদেদোর দেল মুন্দো (প্রথম বিশ্বভ্রমণ) কিংবা হেরোনিমো দে বিবারের ক্রোনিকল দে লস রেইনোস দে চিলে (চিলি রাজ্য সম্পর্কে ক্রনিকল)-এর মাধ্যমে যখন এক অজানা মহাদেশের অদ্ভুতুড়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হলো স্পেনিয়রা, তখন তাদের বিস্ময়ের কোনো সীমা ছিল না, কেননা এই অজানা মানচিত্রে যা কিছুই দেখা গেল তার সঙ্গে মিল ছিল না তাদের চেনা বাস্তবতার।
গোটা মহাদেশটাকেই স্পেনিয়দের কাছে মনে হয়েছিল এক মাতাল মানচিত্র। এমনই ছিল লাতিন আমেরিকা আবিষ্কারের আদিপুরুষদের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা।
১৪৯২ সালে লাতিন আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকেই শাসকেরা এই মহাদেশ দখল ও লুটপাটের মাধ্যমে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল ওই বাস্তবতাকে নির্মমভাবে। তারা শুরু করেছিল এই বাস্তবতাকে নিজেদের মতো গড়ে নিতে। অতএব, এবার বিস্ময়ের পালা লাতিন আমেরিকা শাসনকারীদেরই। কেননা, তারা এই বর্বরতায় হতবাক হয়ে পড়েছিল।

কয়েক শতকের স্তব্ধতা ভেদ করে সাহিত্যে প্রথম যে কণ্ঠটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তিনি চিলির মহান কবি পাবলো নেরুদা। গোটা লাতিন আমেরিকাবাসীর শোষণ-বঞ্চনা ও নির্মম বাস্তবতার পাশাপাশি তাদের আত্মার মহিমাকে এমনভাবে রূপদান করলেন তিনি, যা গোটা বিশ্বকে অভিভূত করে দিয়েছিল।
যে মহাদেশকে একদা পশ্চিম দখল করে নিয়েছিল বর্বরতার মাধ্যমে, সেই মহাদেশ গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পাল্টা দখল শুরু করে দিয়েছিল বর্বরতার জবাবে তীব্র জীবনমুখিনতা, ভালোবাসা, শিল্প, গান আর সাহিত্যের মতো আরও টেকসই ধারালো ও অব্যর্থ অস্ত্রের মাধ্যমে। এই পাল্টা দখলে নেতৃত্ব দিয়েছিল চিলি, অন্তত কবিতার জায়গা থেকে তো বটেই। আর এতে কেবল নেরুদাই ছিলেন না, নেরুদার আগেও ছিলেন কেউ কেউ, যেমন—গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, বিসেন্তে উইদোব্রো, পাবলো দে রোকা, উমবের্ডো দিয়াস কাসানুয়েবা। আর নেরুদার পরে চিলিরই আরেক গুরুত্বপূর্ণ কবি নিকানোর পাররা।
যে বিপুল কল্পনাশক্তি, ইতিহাসচেতনা, আর গোটা জনগোষ্ঠীর যৌথ চেতনাকে অঙ্গীভূত করে নেরুদা হয়ে উঠেছিলেন আগ্নেয়গিরির মতো উদিগরণশীল এক কবি, তাঁকে এড়িয়ে স্প্যানিশ কবিতায় নতুন ধারা নির্মাণ পরবর্তী কবিদের জন্য ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। পাররা সেই দুঃসাধ্য কাজটি করেছিলেন নেরুদার জীবদ্দশাতেই। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও নেরুদার কবিতার সর্বগ্রাসী প্রবণতার গোপন দংশন থেকে সুরক্ষা করেছেন নিজেকে। এটা খুবই আশ্চর্যের যে চিলি ও আর্হেন্তিনায় গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে একাধিক সাহিত্যিক দল দেখা দিয়েছে কিন্তু এর কোনোটিই পাররাকে গণ্ডীভূত করে ফেলতে পারেনি। লুইস ওইয়ারসুন, হোর্হে মিইয়াস, আলবের্তো বায়েসা ফ্লোরেস, বেনানসিও লিসবোয়া এবং বিক্তোরিয়ানো বিকারিওকে নিয়ে যে দল গড়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে নিকানোর পাররা, নিজের মুদ্রাগুণে আলাদা হয়ে পড়েছিলেন প্রায় শুরু থেকেই।
পাররার প্রথম কবিতার বই কানসিওনেরো সিন নম্ব্রে বা বেনামি গানের খাতা বেরিয়েছিল ১৯৩৭ সালে। বিসেন্তে উইদোব্রো তখন খ্যাতি ও প্রতিপত্তির চূড়ায়। নেরুদাও তত দিনে পরিচিত। এঁদের প্রভাব এড়িয়ে সত্যিকারের নতুন ধরনের কবিতা লেখা ছিল প্রায় অসম্ভব। এঁদের লিরিক-স্বভাবের প্রভাব, আখ্যানধর্মিতা, এমনকি লোর্কার রোমান্সেরো হিতানে গ্রন্থের প্রভাবও এই বইয়ের মধ্যে পাওয়া যাবে।
কিন্তু আবার এই প্রথম বইটির মধ্যেই, পরবর্তী সময়ে তিনি যে প্রতি-কবিতা বা অ্যান্টি পোয়েমস-এর ধারণা নিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন, তার বীজও অতলে বুনে রেখেছিলেন। ১৯৫৪ সালে সেই বীজ পরিণত বৃক্ষ ও ফলে শোভিত হয়ে প্রকাশিত হয় পোয়েমাস ই আন্তিপোয়েমাস নামে। এই বইয়ে পাররা তাঁর চোখ-ধাঁধানো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।
পাবলো নেরুদার প্রভাবে ইতিমধ্যে যে কাব্যধারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, সেই ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল এই গ্রন্থের কবিতাগুলো। ঠাট্টা-মশকরা, ব্যাজস্তুতি, আর প্রতিনায়কধর্মী চরিত্রের অস্তিত্ব—এই সব উপাদানের হুল্লোড় পাঠকদের মনোযোগকে সচকিত করে তুলেছিল। আর এর ভাষাও ছিল আগের কবিদের কাব্যিক ভাষার জবরদস্ত চর্চার বাইরে, বাইরে মানে একেবারে কথ্য ভাষার আদলকে অবলম্বন করেছিলেন পাররা। এর মধ্যে অঙ্গীভূত করে নিয়েছিলেন সংলাপ, দৈনন্দিন আপাততুচ্ছ বিষয়গুলোকেও, কিন্তু পাররার প্রতি-কাব্যিক স্পর্শে, তির্যক পর্যবেক্ষণে আর ঠাট্টায় সেগুলো তারা-বাত্তির মতো জ্বলে উঠেছিল। শিশুর কাছে খেলনা যেমন লোভনীয়, তেমনি তাঁর কবিতাকেও বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন বুদ্ধির দীপ্তি, হাস্যরস, উল্লাস আর নিরাবেগ অ্যাবসার্ডিটির মাধ্যমে।
তাঁর প্রতি-কবিতার ধারণা গোটা লাতিন আমেরিকায় কাব্যতত্ত্বের ধারায় যেমন নতুন, তেমনি তা গভীরভাবে প্রভাবসঞ্চারী হয়ে উঠেছিল। প্রভাবের প্রধান কারণ এর সম্মোহনী সারল্য। কিন্তু সারল্য ছিল বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধের দ্বারা শাণিত। পাররার আগে স্প্যানিশ কবিতা নেরুদা বা উইদোব্রোর কাব্যিক আভিজাত্যের বাইরে যাওয়ার হিম্মত দেখাতে পেরেছে—এমন নজির প্রায় বিরল। যদিও ‘প্রতি-কবিতা’ শব্দবন্ধটি পাররা ব্যবহার করার আগে থেকেই ছিল। পেরুর কবি এনরিকে বুস্তামেন্তে বাইয়িরিয়ানের আন্তিপোয়েমাস শিরোনামে ১৯২৬ সালে একটি বই বেরিয়েছিল। কিন্তু পাররার প্রতি-কবিতাবিষয়ক কাব্যতত্ত্বের সঙ্গে এর মিল আছে খুব কমই। আরও একজনও এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন, চিলির উইদোব্রো তাঁর ১৯৩১ সালে প্রকাশিত আল্তাসোর কাব্যগ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে।
বলাই বাহুল্য, পাররার সঙ্গে শব্দের মিলটুকু ছাড়া আর কোনো মিলই তাতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। চিলির সুপরিচিত সাহিত্য সমালোচক হোসে মিগেল ইবানঞেস লানলোইস পাররার প্রতি-কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘পাঁচের দশকের প্রথম দিকে প্রতি-কবিতা যখন বিস্ফোরিত হলো, তখন পাররা আমাদের বিস্মৃতপ্রায় এই সচেতনতার কাছে নিয়ে গেল, “আবার! কবিতায় তাহলে সবই বলা যায়!’”
আসলেই তাই। আশ্চর্য জাদুবলে সবকিছুকেই তিনি কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। প্রচলিত কাব্যিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়েই তিনি কবিতাকে জনগ্রাহী করে তুলেছেন। আর্হেন্তিনার লেখক ও সাহিত্য সমালোচক রিকার্দো পিগলিয়ার ভাষায়, ‘আমরা সবাই বিশ্বাস করি, চিলির সাহিত্য, প্রথম এবং মুখ্যত, আসলে চিলির কবিতাই: উইদোব্রো, নেরুদা…আর ওই মহৎ কবিদের গোটা ধাবার মধ্যে আমার কাছে যিনি অন্য সবার ওপরে, তিনি নিকানোর পাররা। (নিকানোর পাররা, অ্যান্টিপোয়েমস হাউ টু লুক বেটার অ্যান্ড ফিল গ্রেট, (অনুবাদক: লিজ ওয়ার্নার), নিউ ডিরেকশনস, ২০০৪, পৃ: ভূমিকাংশ – ১১)’

শুধু স্প্যানিশভাষী সমালোচকদের কাছেই নন, ইংরেজিভাষী সমালোচকদের কাছেও তিনি সমাদৃত হয়েছেন তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য। মার্কিন সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম মনে করেন, ‘অবশ্যই আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্যের জন্য পাররার নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত…নিঃসন্দেহে তিনি পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন (নিকানোর পাররা, অ্যান্টিপোয়েমস হাউ টু লুক বেটার অ্যান্ড ফিল গ্রেট, (অনুবাদক: লিজ ওয়ার্নার), নিউ ডিরেকশনস, ২০০৪, পৃ: ভূমিকাংশ – ১১)’
বলা হয়ে থাকে, নেরুদার শেষের দিকের কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে এই অনুজের ছায়া। কী ভাবতেন এই অনুজ সম্পর্কে নেরুদা? স্পষ্টই যে নেরুদার বিরুদ্ধাচরণ করে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে দিলেন, তাঁকে তিনি কীভাবে নিয়েছেন? শেলডেন রোডম্যানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পাবলো নেরুদা পাররার কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘পাররা হচ্ছে আভিজাত্য আর জনপ্রিয়তার মিশ্রণ। এটা তাঁর ভাষাকে দিয়েছে দুর্দান্ত অভাবনীয়তা। সে আমাদের সবচেয়ে উদ্ভাবনাময় চিলীয় কবি। সে সাম্যবাদী না, তবে লাতিন আমেরিকার সব কবির মতোই বামপন্থী। (শেলডেন রোডম্যান, টাংস অব ফলেন অ্যানজেলস, নিউ ডিরেকশনস, ১৯৭৪, পৃ: ৭০)
বহু বছর ধরেই তিনি নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকায় আছেন। নোবেল কমিটি কি এই পুরস্কারটি তাঁকে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেরাই সম্মানটি অর্জন করার সুযোগ পাবে? প্রশ্নটা এ জন্য যে গত ৫ নভেম্বর ৯৬ বছর পূর্ণ হলো পারার। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পাররা এখনো বেঁচে আছেন—এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ, কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে নোবেল কমিটি এখনো তাঁকে বিবেচনায় আনতে পারেনি।
তবে স্প্যানিশভাষী জগতের নোবেল পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত ‘সের্বান্তেস পুরস্কার’টি তিনি দেরিতে হলেও এ মাসের ১ তারিখে অর্জন করেছেন। এ জন্য জানাই অভিনন্দন। পাররা দীর্ঘজীবী হোন।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৯, ২০১১