প্রায় প্রত্যেক কবির ভেতরেই থাকে কমবেশি পাগলামি বা মেডনেস বা অস্থিরতার তাড়না, যা তাঁকে প্রচল বাস্তবতার বাইরে অন্যতর এক বাস্তবতার দিকে ধাবিত করে। যেখানে ধারণাগত যুক্তি-শৃঙ্খলা কখনো বা অসংলগ্ন ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। সেই অন্যতর বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে কবি তাঁর মানসচক্ষে যা দেখেন বা উপলব্ধি করেন, তা-ই হয়তো কবিতাকারে প্রকাশ করতে চান। আর এই প্রকাশের চারুদক্ষতায়ই একজন থেকে অন্যজন আলাদা হয়ে ওঠেন।
তরুণ কবি মাজুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাতাসের বাইনোকুলার। কাব্যগ্রন্থের নামের মধ্যেই এক ধরনের পাগলামি বা যুক্তিপরম্পরাকে ভেঙে দেওয়ার আভাস মেলে। ‘বাতাস’ যা আসলে বিমূর্ত এক বিষয়, তার-ই তৈরি আবার বাইনোকুলার? তা কি সম্ভব? কবির কল্পনায় কী না হয়! জীবনানন্দ যেমন বলেছেন, ‘নিছক বুদ্ধির জোরে কবিতা লেখা যায় না।’ বর্তমানের কবিরা হয়তো এ কথা বিশ্বাস করেন বলেই অযৌক্তিকতার ভাবমণ্ডলে ছুড়ে দেন চৈতন্যের রশ্মিরেখা। আর সেই রশ্মিরেখায় যতটা দৃশ্যের দেখা মেলে, তার চেয়ে ঢের বেশি অদৃশ্যময়তায়ই নিজেকে ছড়িয়ে রাখে কবিতা। যা ইশারা-ইঙ্গিতে অন্যতর অর্থের মুখোমুখি করে পাঠককে। এ কারণেই পাঠক কখনো কখনো বিভ্রান্তিতেও পড়েন। মাজুলের কোনো কোনো কবিতা পড়েও পাঠক সেই বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন।
বাতাসের বাইনোকুলার-এর কবিতাগুলো পড়ে মনে হয়েছে, কবি মাঝেমধ্যেই পাঠককে চমকে দিতে চান। এ যেন তাঁর এক বিশেষ প্রবণতা! যেন অযৌক্তিক অসংলগ্ন একটা ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। প্রথম কবিতা ‘লাল ছাতা’য় ‘মানুষ খুশি হলে ক্র্যাচে ভর দিয়ে বর্ষা হেঁটে যায়।’ কিংবা ‘বাতাসে এত এত ঘোড়া ঠ্যাং তুলে বসে আছে—কাঁপন তো লাগবেই’ (‘সোনারগাঁও জনপথ’) কিংবা ‘ওই যে সবুজ ড্রাগনের বন ওটাও আশলে সাইনবোর্ড’ (‘প্রেমিকার মুড অফ’)। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। এসব চমকানো লাইনের পিছে ছুটে পাঠকের ভালোলাগার পাশাপাশি অস্বস্তিও জন্ম নিতে পারে।
কেননা, চমক দেওয়া একটি-দুটি লাইন বা দৃশ্যের সঙ্গে আগে-পরের লাইন বা বিষয়ের সংযোগ সেঁতুটি আর ঠিক রাখতে পারেন না এই কবি, হয়তোবা চানও না। ‘মানুষ খুশি হলে ক্র্যাচে ভর দিয়ে বর্ষা হেঁটে যায়। ডানে থানা বারান্দা/বামে বাস টার্মিনাল আর কোনাকুনি পুরনো বটগাছ,/এই ত্রিভূজ ক্ষেত্রের ভেতরে যে পদ্ম-গির্জা তার চূড়ায় আছড়ে পড়ে/চূড়ামণি সাপ।/তখন হিমরক্তের প্রেমিক যে আশলে কিশোর বুদ্ধ—তারও কমলার/খোসা ছড়ানোর ইচ্ছে হয়। আমার কোনো ইচ্ছে নেই’ (‘লাল ছাতা’)। প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষের খুশি হওয়ার সঙ্গে ক্র্যাচে ভর দিয়ে বর্ষার চলে যাওয়ার সম্পর্ক কী? আর বর্ষার চলে যাওয়ার পরই চূড়ামণি সাপ আছড়ে পড়ার হেতু কী? তা বোঝার জন্য হয়তো রীতিমতো একটা প্রকল্প হাতে নিয়ে পাঠককে এগোতে হবে।
আবার বিবৃতি বা অনুসিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রবণতাও মাজুলের কবিতায় যথেষ্ট। ‘প্রেম অবশ্যই রং বদলায়’ (‘দুঃখী ডাকাত’), ‘রাত আশলেই একটা টাইম মেশিন’ (‘ঘুম’), ‘রাত সে আশলে নগরসেবিকা’ (‘ময়ূর’), ‘প্রতিটি জোছনার রাত আশলে একেকটি সুইমিংপুল’ (‘মাতাল রাজকুমার’), ‘রাত অপ্সরীদের ডাইনিং টেবিল’ (‘দর্জিবালক’), ‘কিশোরী যুবতী হলে শহর এক মদমত্ত জলাধার’ (‘সোনারগাঁও জনপথ’)। এ রকম উদাহরণও কম নয়। উল্লিখিত পঙিক্তগুলোতে রাতকে কবি কখনো টাইম মেশিন, কখনো নগরসেবিকা, কখনো সুইমিংপুল, কখনো বা অপ্সরীদের ডাইনিং টেবিল রূপে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। ফলে রাতের যে অন্যতর অর্থ কবি দাঁড় করাতে চেয়েছেন, তা হয়তো ভেঙে পড়ল পাঠকের চোখের সামনে, বোধকে নাড়াতে পারল না। কেননা, ‘আশলে’ (আসলে?) শব্দটি লিখে কবি যে জোর সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, এরপর পাঠকের আর ভাবনার অবকাশ থাকে না। কিন্তু ‘আশলে’র জায়গায় যদি বা ‘যেন’ হতো, তা’হলে হয়তো পাঠকের চিন্তাকে ঢের বেশি উসকে দেওয়া যেত।
প্রচল ছন্দ নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা যেন নেই এই কবির। উপমা-উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাসের আলঙ্কারিক কাব্যকৌশলের চেয়ে ইচ্ছেমতো বলে যাওয়াতেই তিনি যেন স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ইচ্ছেমতো খেলেনও শব্দ নিয়ে। আবার ইংরেজি শব্দের অগণন ব্যবহারেও ক্লান্তি নেই যেন। ইন্টেক, বিলবোর্ড, ফ্রিজ, নাইটক্যাপ, অফ, মনোটোনাস, ফায়ারপ্লেস, হ্যান্ডশেক, পোর্টফোলিও, অফ-সিজন, ইনসাল্ট, রাডার-এর মতো অসংখ্য শব্দের উপস্থিতি আছে এই গ্রন্থে। এ ছাড়াও আছে বিমূর্ত-অসংলগ্ন উপমা-চিত্রকল্প তৈরির প্রতি কবির ঝোঁক। যেমন: ‘সময়ের মতো দীর্ঘ বেণীর নার্স’, ‘তেঁতুল পাতার মতো গা ছমছম বাতাস’, ‘গড়িয়ে আসে হাসির মার্বেল’, ‘ছাঁটকাগজের মতো প্রেমিকা’, ‘শালফুলের মতো সেই সত্য কথা’, ‘সময়ের কাঁপা হাত’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে এগুলোই শুধু এই গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য নয়। কাব্যভাবনায়, ভাষায় ও কৌশলে এই কবির পরিপক্বতাও নেহাত কম নয়। যে কারণে কবি অনায়াসে বলতে পারেন—‘জারুলের রহস্যময় হাসির মতো আমার মৃত্যু হবে/উলঙ্গ বাহার শাড়িপরা এক দুঃখী পরীর কড়ে-আঙুল আঁকড়ে ধরে’, ‘যতদূর নৈঃশব্দ্য ততদূর টানজিস্টার।’, ‘ঘুম পেলে লৌহজঙের লোহার রেলিং-দেয়া সাঁকোও ধসে পড়ে/চিপসের মতো মিহি, ভঙ্গুর—’। আবার সমাজ ও বাস্তবতাকে শ্লেষ করতেও ছাড়েন না তিনি—‘করমচা ফুল অন্ধ হও; অন্ধ হলেই দেখতে পাবে ঢের’, ‘কাঁঠালিচাঁপা এবাদতের চেয়ে ঢের পবিত্র।’ আমরা জানি, একটি ভালো কবিতা অন্যতর অর্থ ও সৌন্দর্যের জন্ম দেয়। এই গ্রন্থেও রয়েছে পাঠককে অন্যতর অর্থের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা।
এই গ্রন্থের বাকপ্রতিমার ফাঁকে ফাঁকে কবির এক ধরনের অস্থিরতার দেখা পাওয়া যায়। এটা কী যুগযন্ত্রণার প্রতিফলন? যেখানে জীবন ও বাস্তবতাকে ঘিরে নৈরাজ্য ও বিচ্ছিন্নতা পদে পদে? সেই নৈরাজ্যের সূত্রমুখই কি বাতাসের বাইনোকুলার-এ দেখতে চেয়েছেন মাজুল?

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ১৪, ২০১০

%d bloggers like this: