মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন নাকি অর্থহীন। তাহলে কেন নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবনে পবিত্র স্থানে গমনের আকাঙ্ক্ষা বেয়াড়া রকমের। এর কারণ কি এই যে তাদের মনটাই আসলে একটা ফাঁকি? শহুরে ব্যস্ততা আর জীবনের ঘানি টানার জোয়াল কাঁধে অসহায় মধ্যবিত্তের ভালো লাগাটুকু হয়তো এই পবিত্র স্থানে গমনের চিন্তাতেই কিছুটা স্বস্তি পায়। তাই হয়তো সে শাং-রি-লার খোঁজ করে। শাং-রি-লা খুঁজে না পেলে বক পাহাড়। অথবা কিছুই না পেলে সে অন্তত তার পথ চাওয়াতেই আনন্দ জেগে ওঠে।
পরের গোয়ালের গরু খুঁজে বেড়ানোর আগ্রহ বাঙালির ষোলোআনা। শহুরে জীবনের কানমলাতেও তার সেই স্বভাব যায় না। তবে খুঁজে বেড়ানোর উপায়টা ভিন্ন। এই নাগরিক মধ্যবিত্ত অন্তর্জালের পর্দায় আরেক দুনিয়া খুঁজে পেয়েছে। ঠিক অপর জগৎ নয়, বাস্তব জগতেরই প্রতিরূপ, মানবিক সম্পর্কের নতুন প্ল্যাটফর্ম ও যোগাযোগের মাধ্যম। যেমন, ফেসবুক—ঢাকা শহরের অসহায়ত্বই হয়তো এই ফেসবুক। কিন্তু এরও শেষ আছে। মাহবুব মোর্শেদ তাঁর উপন্যাসেই বলেছেন, যন্ত্র মানবিক সৃষ্টিশীলতাকে অতিক্রম করতে পারে না। একসময় মাইস্পেস, হাইফাইভের যুগ ছিল। এখন ফেসবুক। এরপর হয়তো ফেসবুকও থাকবে না। মানুষই নতুন করে আবার কোনো নাগরিক যোগাযোগের উপায় খুঁজে বের করবে। ফেস বাই ফেস উপন্যাসের গায়ে লেখক ফেসবুকের জামা চাপিয়েছেন। সেই জামার ভেতরে অস্থির, রুগ্ণ, লোভী আর দিকভ্রান্ত মধ্যবিত্তের গল্প। উপন্যাসের আদলটাই ফেসবুকের মতো। মুখের পর মুখ, একের পর এক চরিত্র, ঘটনা। নতুন কোনো চরিত্র আসে, আর তার প্রোফাইল বর্ণনা করে যান লেখক। ফেসবুকের মানুষেরা অন্তর্জালিক বন্ধু হয়ে ওঠে। তাদের হয়তো কখনোই দেখা হয় না। এক অপরের খোঁজ নেওয়া আর বিচিত্র গল্প শুনতে শুনতে নাগরিক মধ্যবিত্তের সময় কাটে। সেই গল্পে গল্পে অবাস্তব শাং-রি-লা আসে, বক পাহাড় আসে।
মাহবুব মোর্শেদ মানবিক সম্পর্কের সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে ফেসবুকে এসে প্রবেশ করেছেন বলে তাঁর বইয়ের ফ্ল্যাপে জানিয়েছেন। কিন্তু ফেসবুকে মানুষ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টাই সংশায়িত। উপন্যাসে সেই সংশয়ও ব্যক্ত আছে। উপন্যাসের চরিত্র রিনা কাওসারি বলছে, ‘শোনেন, একটা আড়াল আপনার আর আমার মধ্যে আছে, তাই না? এই আড়ালটা যদি না থাকত, তবে আমি কথাগুলো বলতে পারতাম না। আপনি রিয়েল ক্যারেক্টার। আপনি পুরুষ। আমি নারী। হয়তো আপনার পরিচিত, হয়তো অপরিচিত। হয়তো আমার এ ছবিটা নকল। কিন্তু এই আড়ালটুকু না থাকলে আমি আপনাকে আমার পিরিয়ডের গল্পটা কিন্তু বলতে পারতাম না। এমন অনেক কিছুই তো হয়। আপনি আমাকে একজন নারীই ভাবুন না কেন। ক্ষতি কী? ডু ইউ বিলিভ মি?’ এসকল প্রশ্ন এবং হয়তো এর ঘোলাজলে ফেসবুক যে মানুষকে হাজির করে তাদের মধ্যে সম্পর্কের চাইতে বিভ্রান্তি থাকে বেশি। তাছাড়া বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ ও নোংরা বলে ফেসবুকে মানবিক সম্পর্কজনিত জটিলতার অনুসন্ধান আদতে গোলক ধাঁধাকে আরো জটিল করে তোলে। ফলে এই উপন্যাসের অভিনবত্ব বিভ্রান্তির পথে গমন করে। আড়াল যখন আশ্রয় হয়ে যায়, তখন আর স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফেসবুক অনেকের জন্যই আড়াল, এই আড়ালে থাকার সুযোগ এবং হারানো সুঁই তালাশে আগ্রহী লোকদেরও জীবনযাপনের দার্শনিকতায় অভিনবত্ব আছে, স্বার্থ আছে এবং মুক্তির বাসনা আছে। সেই মুক্তির পথও বন্ধ। উপন্যাসের চরিত্র সাবিনা মেহনাজ সুপ্তি শুভকে ভালো থাকার উপায় বাতলে দেন, মোক্ষ লাভের কথা বলেন—‘কিন্তু মোক্ষ সম্ভব। ডোন্ট ট্রাই টু গেট আউট, স্টে হিয়ার। এ জীবন কি সুন্দর নয়? রাস্তার ভিড়, জ্যাম, জীবনযাপনের জন্য মানুষের পরিশ্রম, তার ঘর্মাক্ত মুখ কি সুন্দর নয়? এসবই তো টিকিয়ে রাখছে পৃথিবীকে। শত শত মানুষের বাঁচাকে সম্ভব করে তুলেছে এই রুটিনই তো। আপনি এর থেকে মুক্তি নিয়ে কোথায় যাবেন? সেটা কি সম্ভব? আপনি বরং মোক্ষ খোঁজেন।’ ফলে মাহবুব মোর্শেদ যে মধ্যবিত্তকে হাজির করছেন, তারা আচরণে ভাষায় এবং আদান-প্রদানের নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে আবদ্ধ।
ফেস বাই ফেস উপন্যাসের ভাষাও নির্দিষ্ট, অল্পকিছু লোকজনের মুখেই আবদ্ধ। ভাষার ব্যবহারে লেখক নিজস্ব আবহ তৈরি করতে চাইছেন হয়তো। কিন্তু এই ভাষাও একই সঙ্গে শিক্ষিত এবং ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে কয়েকজনের ভাষা—এই ভাষার ব্যবহারকারীরা ফাস্টফুড খায়। ফেসবুক ব্যবহার করে না—এমন কাউকে এই উপন্যাসে দেখা যায় না। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ইতিহাস থাকে না, প্রতিবেশ থাকে না। শুধু মনিটর আর নিজের হাত-চোখ-মাথার ব্যক্তিগত ব্যবহার হচ্ছে ফেসবুক। যা একটা অদৃষ্টের সম্পর্ক তৈরি করে। ইতিহাস বিচ্ছিন্নতার যে রোগ মধ্যবিত্তের আছে, তার আশ্রয় এই ফেসবুক। ফলে একটু ভালো করে বেঁচে থাকার খোরাকি জোগাড় করার মাধ্যম হিসেবে ফেসবুককে উপস্থাপনের চেষ্টায় ফেসবুক-বিছিন্ন জীবনটাই বরং বেজে উঠেছে। তাই শুভ এবং তিন্নি উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্রের সম্পর্ক ফেসবুক-বিচ্ছিন্ন। এমনকি শুভর বেঁচে থাকার জন্যও এই ফেসবুক জরুরি নয়। জরুরি বরং শুভর জীবনকে উপন্যাসময় করে তোলার জন্য। ফলে মানবিক সম্পর্কের জটাজালের সূত্র সন্ধানে ফেসবুকে গমন বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
মাহবুব মোর্শেদ উপন্যাসের মেজাজ ধরে রাখতে পেরেছেন। সব মিলিয়ে ফেস বাই ফেস জনপ্রিয় ধারার উপন্যাস। সুখপাঠ্য আর ঝরঝরে একটা গতিশীল লেখা পড়ার আনন্দ আছে এ উপন্যাসে। শহুরে মাঘ পেরিয়েও শীত না আসুক, বন্ধু আসে ফেসবুকে। মোক্ষ লাভের আলাপ আসে, শাং-রি-লার ডাক আসে। এই উপন্যাসে ঘাম আছে, সেন্ডোগেঞ্জি আছে—এমন অনেক কিছু নিয়েই তৈরি ফেস বাই ফেস। মাহবুব মোর্শেদ তাঁর কবিভাবও জিইয়ে রেখেছেন। এই উপন্যাসের একটা অন্য রকম স্বাদ আছে—গরম চায়ে পরোটা ভিজিয়ে খাওয়ার স্বাদটা যেমন হয়।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ১৪, ২০১০