জানা নেই, ডানা থাকলে আমি কী করতাম?

বেরিয়ে পড়বার প্রস্তুতি চাপিয়ে ঢাকা শহরে নেমে আসত ভোর, প্ররোচক হাওয়া এসে ডাকনাম ধরে ডাকত: যা তুই…খুঁটে খুঁটে নিয়ে আয় খড়কুটো-ভালোবাসা। হঠাৎ ফিসফিসিয়ে হাওয়া হয়তো কানে কানে সেই প্রাচীন নিয়মাবলিই বলে দিত—একাকিত্বের অসুখ ভেঙে ভালো হয়ে যা। যা তুই বাবুই বংশের ছোট ছেলে হয়ে যা। ওড়াউড়ি বাদ দিয়ে বাসা বুনে বসে থাক, যা। উড়ে আসবে অন্য কেউ, বন্য ঢেউ, যা তুই তার জন্য অপেক্ষা হয়ে যা…

ডানা থাকলে সীমানা ভাঙার উৎসাহব্যঞ্জনা থাকত বেশি। একদিন, আমি হয়তো আর বাবুই থাকতাম না। হয়তো শালিক থাকতাম। এই বর্ষায় ভিজে ভিজে বৃষ্টির জলকণা দিয়েই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কবিতা লিখতাম…যদিও, শালিক কোনো কবিতাই লেখে না, কিন্তু শালিক কবিতা হয়ে তুমুল ভিজতে থাকে তরুণ কবির খাতার ভেতর, মাথার ভেতর, সে কবিতা ছাপা হতে পারে লিটল লিটল মেঘে, সেই মেঘই অনুবাদপূর্বক পড়তে পড়তে মুগ্ধ কোনো কুরঙ্গবালিকার চোখে এক ফ্রেম চিকচিক করে ওঠা দুপুরবেলার নদী একটা গল্প হয়ে উঠত…

কিন্তু ডানা থাকলে হয়তো আমি একদিন আর শালিকও থাকতাম না। আত্মপ্রকাশের তরঙ্গে অনেক আথালি-পাথালি আর দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ সম্পর্কের অনেক টানা-হ্যাঁচড়ার একটা সফল পরিণতি হতে পারত। এই মনস্তাত্ত্বিক মেটাফর প্রযোজিত ভাবনাচিত্রে শেষ পর্যন্ত আমি ঈগল হয়ে উঠতাম কি না! চরিত্রে দস্যুবৃত্তির অভিযোগ নিতাম কিনা! বুনোপ্রাণে আমি গোত্রচ্যুত, সব সময়। নিঃসঙ্গতার আততায়ী উপস্থিতি নিয়েও তুলনামূলক দূরত্বসঞ্চারী ঈগলের চোখে এত বিষাদ কেন থাকবে—এর উত্তর লেখা থাকবে না। কোনো কবিতায়, পক্ষীগবেষণায়। মোটামুটি সব্বাই জানে, ঈগলের কোনো অভিমান থাকতে পারে না, ঈগলকে এড়িয়ে গেলেই অন্যান্যের ভালো থাকা হয়। কর্নেল ঈগলকে কেউ চিঠি লেখে না, ই-মেইল করে না, ফোন করে না, ‘কেমন আছ’ বলে না। ঈগল শুধু ঈগল হয়েই ওড়ে, দূরে, ডানা থাকলে আমিও যেতাম উড়ে

আরও কত নামহীন পাখি আছে, ডানা থাকলে আমার হয়তো কোনো নামই থাকত না, অপেক্ষা-বিষাদ দূরত্ব থাকত না…

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ০২, ২০১০