ক্লাস নাইনে পড়ি তখন। শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে টানা ধর্মঘট। ক্লাস বন্ধের দিনগুলোতে গল্প, কবিতা পড়ে দিন কাটছে। সে সময় শংকরের বই এপার বাংলা-ওপার বাংলায় পড়লাম জিয়া হায়দার নামে এক তরুণের কথা। আমার কিশোর বয়সের ভাবনায় তখন তীব্র কৌতূহল। কী ভাগ্য, শংকরের বইয়ে নাম। এর কয়েক বছর পর সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পাবনার ওপর প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। জানলাম, বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের হায়দার ভাইদের কথা।
২০০৩ সাল। বার্লিন থেকে দাউদ ভাইয়ের টেলিফোন, জিয়া হায়দার প্যারিসে আসছেন। সেবার জুনের ৩ তারিখে এলেন আমার কৈশোর উদ্বেল করা মানুষটি। তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু লেখককে প্রথম দেখা। চার দিন ছিলেন প্যারিসে। তাঁর ব্যবহারে, কথাবার্তায় আশ্চর্য অবলীলায় মুহূর্তগুলো গেছে ডানায় ভর করে। আমার ছোট দুই মেয়ের সঙ্গে গড়ে উঠল হূদ্যতা; সাহিত্য, জীবন, প্রেম, রাজনীতি নিয়ে বিহার করেছেন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। আড্ডা চলেছে গভীর রাত অবধি। পরের দিন সকালেই বিছানা ছেড়েছেন শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে যাওয়ার জন্য।
জিয়া ভাই দুটো বই দিয়ে গেছেন। নিজের লেখা নির্মেদ কবিতার বই। তোমার আমার পদ্য আর একই শিরোনামের দ্বিতীয় তরঙ্গ। প্রথমটিতে লিখেছেন ‘আনা ও শাহাবুদ্দীন, জল ও মীন ০৩.০৬.০৩, প্যারিস’ আর দ্বিতীয়টিতে ‘গভীর, গভীরতর চেনা ও জানা’। তাঁর অনুপস্থিতিতে এসব ছোট পঙিক্ত আর কয়েকটি চিঠিই এখন আমার কাছে জিয়া ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে।
প্যারিস থেকে দেশে ফেরার পর জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হতো টেলিফোনে আর চিঠিতে। তাঁর সৃষ্টিশীল হাতের স্পর্শ পাওয়া সব চিঠি—কখনো সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আন্তরিক।
২০০৬ সালের ৯ জুলাই ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা। ইতালি-ফ্রান্স। অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হলো ফ্রান্সের নীল দল। খেলার শেষ পর্যায়ে মাতেরাজ্জিকে জিদানের গুঁতো মারা, হেরে যাওয়া—সব মিলে বাড়িতে আমরা হতবাক। খেলা শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে জিয়া ভাইয়ের টেলিফোন, জিদান কেন মারল? ও প্রান্তে কৌতূহল বিস্ময়। টিভি থেকে যা জেনেছি, প্রাথমিকভাবে তাঁকে জানিয়ে বললাম, পুরো ঘটনা জেনে পরে বিস্তারিত জানাব। এমন সব নানা ঘটনা, প্রসঙ্গ আর বিশ্বাসের যুগলবন্দীতে জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে ছিল আমাদের সম্পর্কের নীড়।
প্যারিসে বেড়ানোর দিনগুলোতে সকালে, কখনো বা বিকেলে শাহাবুদ্দীনের কাজের মধ্যেই গল্প চলত। শাহাবুদ্দীন তখন ‘গান্ধী’ প্রতিকৃতিটি করছিলেন। কাজ করার সেই মুহূর্ত মনে রেখে জিয়া ভাই একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘গান্ধী ও শাহাবুদ্দীন’ শিরোনামে। পরে তা প্রকাশিত হয় জনকণ্ঠে। কাগজ থেকে কবিতাটি কেটে চিঠিসহ পাঠিয়েছিলেন।
২০০৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর সকালে টেলিফোনে দাউদ হায়দারের কান্না জড়ানো গলা। জানলাম, অদ্ভুত এক নির্জনতায় চলে গেছেন জিয়া ভাই। তাঁর কবিতা, নাটকের বর্ণমালাকে অনাথ করে চলে গেলেন এক অনিবার্য শুদ্ধ ঘুমে।
২০০৮ সালেই কি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সময় ফুরিয়ে আসছে? শব্দ ভেঙে তাঁর নিজস্ব বর্ণমালায় তৈরি সেই কবিতাটির জন্য কতবার টেলিফোন। নিজের কাছে কোনো কপি ছিল না। কথামতো ডাকে পাঠালাম। কিন্তু বাংলাদেশ ডাক বিভাগের অসীম কৃপায় ইস্পাহানি বিল্ডিং, লালখান বাজার, চট্টগ্রাম—এই ঠিকানায় কবিতাটি পৌঁছায়নি! কবিতাটি পেতে উদগ্রীব, ব্যাকুল ছিলেন তিনি। আবার টেলিফোন। এবার জিয়া ভাইয়ের কথা অনুযায়ী বার্লিনে দাউদ ভাইকে মেইল করলাম। কিন্তু খবরের কাগজে ছাপার অক্ষর এত ছোট, প্রিন্ট স্পষ্ট নয়। তত দিনে জিয়া ভাই ঢাকায়, সিদ্ধেশ্বরীতে। এপ্রিলে চিঠি লিখলেন। খামের ভেতর ঠিকানাসহ আরেকটি নতুন খাম। ঠিকানাসহ যেন ফিরতি ডাকে লেখাটা পাঠাই। টেলিফোনে আগেই বলেছিলেন কবিতা, প্রবন্ধসহ কয়েকটি বই প্রকাশিত হবে। জানালেন রশীদ ভাইয়ের (রশীদ হায়দার) মেয়ে ক্ষমা লন্ডন থেকে প্যারিসে এলে তার হাত দিয়ে কবিতাটি পাঠাতে। পরে ভিসা না পাওয়ায় ক্ষমার আসা হয়নি।
জুলাইয়ে কথা হলো, তিনি সিদ্ধেশ্বরীতে ছোট ভাইয়ের বাড়িতে। শরীরে পশ্চিমের সূর্যছায়া ফেলেছে। এখন মনে হয়, কবিতাটি বইয়ে দেওয়ার জন্য কী তীব্র ব্যাকুল ছিলেন তিনি। যেন সব বুঝতে পারছিলেন, তাই একক ভ্রমণে যাওয়ার আগে সব গুছিয়ে নেওয়া।
প্যারিস ছেড়ে যাওয়ার দিন একাই গেলেন সুপার মার্কেটে, দুপুরে। ফিরলেন শাহাবুদ্দীনের জন্য রেড ওয়াইন আর মেয়েদের জন্য শ্যাম্পিও দ্য বোয়া নামে অ্যালকোহল-ফ্রি পানীয় নিয়ে। আমাদের মেয়ে চিত্র ও চর্যার সঙ্গে গল্পের মধ্যে আগেই জেনে নিয়েছিলেন জন্মদিনে বা পার্টিতে অল্প বয়সীরা কী-জাতীয় পানীয় পান করে। ওদের বলেছিলেন, ‘বন্ধুদের নিয়ে খাবে।’
সে যাত্রায় জিয়া ভাইয়ের পিকাসো মিউজিয়াম দেখা হয়নি। প্যারিসে চলছিল শ্রমিক ধর্মঘট, পাতালরেল সর্বসাধারণের জন্য খোলা, কোনো টিকিট লাগছে না। দেখে খুব মজা পেলেন তিনি। মিউজিয়ামে গিয়ে দেখি বন্ধ। রসিকতা করে বললেন, ‘পিকাসোর চিত্রকর্ম দেখা হলো না, অন্তত মিউজিয়ামের ছবিটা তুলে নিই।’ পরে দেশে ফিরে তাঁর ক্যামেরায় তোলা ছবি দুটো পাঠিয়েছিলেন। ফেরার পথে ইহুদিপাড়া হয়ে সেন নদীর পাড় ধরে হাঁটছি। কথা হলো, সময় কুলালে একবার প্যারিসের সিনাগগে যাবেন। বললেন, বহু বছর আগে আমেরিকার সিনাগগে গিয়েছিলেন।
দীর্ঘদেহী, সুদর্শন মানুষটি ছিল অকৃত্রিম, সরলতা মাখা। জিয়া ভাই, আপনার স্মৃতিকথা লিখতে বসে মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে অকৃত্রিম মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
খুবই ইচ্ছা ছিল, পিটার ব্রুকের নাটক দেখার। সেই অনুযায়ী প্যারিসের তেয়াত দ্য বুফে দু নর্দের ঠিকানাও নিয়ে এসেছিলেন। ব্রুকের নাটক দেখা হলো না বলে কী আক্ষেপ! কারণ, মাসখানেক আগেই মঞ্চস্থ হয়েছিল মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে লা মর দ্য কৃষ্ণা, পিটার ব্রুকের প্রযোজনায়। ভবিষ্যতে দেখার প্রত্যাশা নিয়ে অন্য একটি ফরাসি নাটক দেখেছিলেন সন্ধ্যায়।
জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো সময়ের খণ্ডমুহূর্ত, প্যারিসের রাস্তায় ঘোরার ফাঁকে গল্প করা, বাড়িতে রাতের আড্ডা, টেলিফোনে কথা বলা আর কয়েকটি চিঠি—এসবই এখন তাঁর স্মৃতির তপ্ত শিরা-ধমনি। আটপৌরে বাঙালি চরিত্র থেকে যোজন দূরে নিজস্ব জগতে ছিলেন তিনি। ৭২ বছর বয়সে আপন স্বভাবের মতো আশ্চর্য মধুর সত্যের মতো চলে যাওয়া। ২০০৮ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহেই কথা হলো। খানিকটা নিস্তেজ গলা, ‘আছি কোনো রকম।’ অথচ ২২ মার্চের চিঠিতে লিখেছিলেন—
কল্যাণীয়াস আনা,
এত দিনে নিশ্চয়ই জেনে গেছ যে ক্ষমার প্যারিসে যাওয়ার সুযোগ আর হয়নি। ভিসা না পাওয়ায় ওর যেমন মন খারাপ, দাউদ ও আমাদেরও। যা-ই হোক, ওর না যাওয়ার কারণে তুমি তো ওর হাতে কবিতাটা দিয়ে দিতে পারছ না। (গতকাল পর্যন্ত তোমার পাঠানো খাম পাইনি) সে জন্য তুমি প্লিজ আবারও পোস্টাল ডাকযোগে পাঠিয়ে দাও। ‘গান্ধী ও শাহাবুদ্দীন’ কবিতাটার জন্য অপেক্ষা করছি। পাণ্ডুলিপির অন্য লেখা সাজিয়ে রেখেছি। শুধু ‘শাহাবুদ্দীন’কেই ফিট করাটা বাকি, তুমি এভাবে নিচের ঠিকানায় পোস্ট করবে—
জিয়া হায়দার/স্নেহালয় (ডা. রওশনারা বেগমের বাড়ি)/৫১/২ সিদ্ধেশ্বরী লেন/সিদ্ধেশ্বরী/ঢাকা /বাংলাদেশ।
আশা করি, আমার এবংবিধ জুলুমে বিরক্ত হবে না। সত্যি বলতে কি, আমি তেমন সুস্থ নই, তবু চেষ্টা করব এ বছরের মধ্যে একবার তোমাদের দেখতে যেতে। ইনশাল্লাহ।
তোমার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি।
তোমাদের/জিয়া ভাই।
এই এপ্রিলেই টেলিফোনে শাহাবুদ্দীনকে বলেছিলেন প্যারিসে আরেকবার আসার তীব্র বাসনার কথা। আর আপনার গুছিয়ে নেওয়ার স্বভাবে ইচ্ছা ছিল ২০০৮ সালেই কবিতা, নাটক বিষয়ে কয়েকটি বই প্রকাশ করার।
নিজের ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিম্নকণ্ঠ। আমার মনে হয়, নিজের প্রসঙ্গে সোচ্চারও ছিলেন না একেবারেই। নিজেকে ও পারিপার্শ্বিকতাকে ঘিরে সবকিছুই দেখেছেন গভীর অনুভূতি দিয়ে কিন্তু ব্যক্তির সীমানা ডিঙিয়ে। তিনি ছিলেন তেমন মানুষ, যে নিজের প্রতি, এমনকি অন্যদের প্রতিও বিশ্বস্ত থাকতে পেরেছেন। আর সম্পর্ককে লালন করেছেন গভীর মমতায়। ছোট ভাই দাউদকে (দাউদ হায়দার) নিয়ে সদা উদ্বিগ্ন থাকতেন। ২০০৫ সালের আগস্টে বার্লিনে গেছি গরমের ছুটিতে। সঙ্গে দুই কন্যা চিত্র-চর্যা। ফিরে এসে জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে কথা। ‘তোমরা দাউদের কাছে ছিলে, খুব খুশি হয়েছি। ও বড় একা, ওকে নিয়ে ভাবনা হয়’। বললেন টেলিফোনে। নিজের একাকীত্বের মধ্যেও তিনি ছোট ভাইয়ের নিঃসঙ্গতায় ছিলেন ব্যথিত।
প্যারিসে জুন মাসের নীল আকাশ মাথায় রেখে রাত যত গভীর হয়, আমাদের আড্ডা তত গাঢ়-জমাট হয়। জিয়া ভাইয়ের ভাষায়, গভীর, গভীরতর চেনা ও জানায়। ফেলে আসা জীবনের গল্প বলেন। মনের ক্যামেরায় নিঃশব্দে ধরে রেখেছেন স্মৃতি। স্মৃতির জলপথ এমন করে পাবনার শেখ ফয়সল আবদুল রউফ মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন হায়দার ক্রমেই হয়ে উঠেন বিশ্বনাটক, বিশ্বনিখিলের নাগরিক জিয়া হায়দার। কথার মধ্যে আপনাকে রশীদ ভাই সম্বোধন করায় আপনি থমকে গিয়ে পরক্ষণেই হেসে ফেলেছেন। এ ভুলটা আমি যতবার করেছি, আপনি হেসেই তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। আত্মজীবনীর গন্ধমাখা আড্ডার রাতে জীবনকাহিনী এসে থেমে গেছে প্রেম, পরিণয়ে। প্যারিসের মধ্যরাত, আমেরিকার মিনেসোটায় সন্ধ্যা, বান্ধবীকে টেলিফোন—কোনো এক নারীর জন্য বেদনার্ত সহিষ্ণুতার ধারাপাত। তাঁর আবেগ আর আশঙ্কায় এমন একটা প্রখরতা, পরিবেশটা কেমন দুলিয়ে দেয়। অথচ রাত্রি নামার আগেই অস্তগোধূলিতে তিনি একাই চলে গেলেন।
‘চিঠি পেতে কিন্তু আমারও ভালো লাগে।’ লিখেছিলেন পুনশ্চ শব্দটি যোগ করে। তাঁর ভালো লাগা, ভালোবাসার পরিধি ব্যাপ্ত ছিল। এক জনমে স্বপ্ন-সাধের খেয়া পূরণ হয়নি। কিন্তু তাঁর আপাত নিস্তরঙ্গ হূদয়ে আঁকা ছিল ভালোবাসার একটা ছবি। বয়সের বিস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও বন্ধুর মতো গল্পকথায় মজার ছলে শুনিয়েছেন জীবনের কথা। শুধু ব্যক্তি নয়, সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবেও শূন্য বুকে ডুবে ছিল বিরহ সময়। লিখেছেন, ‘ঋষির ধ্যানমগ্নতায়/একটি একটি করে কাঁটা সরিয়ে দিয়েছি।’
(তোমার আমার পদ্য, দ্বিতীয় তরঙ্গ)
শুধু কাঁটা সরানোই নয়, দায়িত্ব, কর্তব্য আর দিনযাপনও করেছেন জিয়া ভাই। পুরুষের প্রিয় কলতান যে নারী, তাকে জিয়া ভাই চেতনায় মাড়িয়ে কাটিয়ে গেছেন একাকী নয়, একক জীবন। সে জীবনের গোপন নির্ঝর-ভালোবাসা, যা জিয়া ভাইয়ের ভাষায়, ‘ব্যথার বৃন্দাবনে/বড় গভীর হয়ে আছো।’
(তোমার আমার পদ্য)

আনা ইসলাম
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ১৩, ২০০৯

Share This