এই রচনাটি নওয়াজেশ আহমদের ছবি তোলা নিয়ে লেখা আত্মস্মৃতির দ্বিতীয় পর্ব। সূচনা থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগেকার কথা আছে প্রথম পর্বে, যা ১৪ জুলাই ২০০৬ ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায়’ শিরোনামে ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে ছাপা হয়েছিল

আমার আলোকচিত্র কথামালার মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পর্ব এখানে তুলে ধরব। এ পর্বে ছিল চ্যালেঞ্জ আর উত্তরণ। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও আমি সরকারি চাকরিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পরিণামে আমাকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর হতে হলো। এর ফলে আমার কর্মক্ষমতা বেড়ে গেল; একাগ্রতা আরও প্রখর হয়ে উঠল। সৃজন ও উদ্ভাবন অনেক বেড়ে গেল—কী কৃষিবিজ্ঞানে, কী আলোকচিত্রে। বছর কয়েক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জীবনধারা ও কৃষ্টির অভিজ্ঞতা আমার মানসলোকে গভীর রেখাপাত করল।
স্বাধীনতার পরের পর্বের কিছু পরিকথা এখন তুলে ধরা যাক।
ঘরে ফেরার দিন, নভেম্বর ১৯৭২। নিউইয়র্কে ইস্ট সাইড টার্মিনাল থেকে আমার সদ্য কেনা ক্যামেরা ব্যাগ ও সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ওপর সব স্লাইড চুরি হয়ে গেল চোখের নিমিষে। ঢাকায় মার্চ মাসে অনেক কিছু হারিয়ে একটুও কষ্ট পাইনি, কিন্তু সেদিন এই ক্যামেরা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার লন্ডন ও আমেরিকার অনেক ছবি (স্লাইড) হারিয়ে প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। আজও সেই কষ্ট ভুলতে পারিনি। বাংলাদেশে ফিরে এসে ১৯৭৩ সালে টি বোর্ডে সরকারি চাকরিতে যোগ দিইনি। কারণ আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, বাংলাদেশের ওপর একটা ফটো অ্যালবাম তৈরি করতে হবে। তখন বাংলাদেশের ওপর সে রকম কোনো বইপত্র বা অ্যালবাম ছিল না। সারা দেশ ঘুরে প্রচুর ছবি তুললাম। সব স্লাইডে। প্রসেস করতে খুব অসুবিধা ছিল তখন। আমি তখন ছবি তুলতাম মূলত কোডাক্রোমে। তাই দেশের বাইরে পাঠাতে হতো প্রসেসিংয়ের জন্য। বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে সাহায্য ও অনুপ্রেরণা পেলাম। এঁদের মধ্যে ছিলেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল ভাই ও নাইব ভাই। বিদেশিদের মধ্যে মার্টি চেন, আলিয়ঁস ফ্রাঁসের জেগোদ গুঁছা, আর্জেন্টিনার অ্যাম্বেসডর, কানাডার প্যাট্রিসিয়া গডসেল সব ধরনের সাহায্য করেছিলেন। অ্যালবামের নামকরণ করা হয় ইংরেজিতে—বাংলাদেশ। একে ল্যান্ড, হিস্ট্রি, পিপল ও কালচার—এ চার ভাগে ভাগ করা হলো। প্রফেসর নজরুল ইসলাম সহযোগে টেক্সট ইংরেজিতে লেখা হলো। ফরাসি ও জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে রাখা হলো ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি। ইস্টার্ন রিগালের নাসির ভাইয়ের (নাসির উদ্দিন আহমেদ) সাহায্য না পেলে এটা প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। তখন কালার সেপারেশন ও প্লেট মেকিং অত্যন্ত দুরূহ কাজ ছিল। ছাপার কাজ ছিল আরও দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ। রিগাল কমার্শিয়াল কাজের ফাঁকে ফাঁকে অ্যালবামের ছাপার কাজ করত। ফলে প্রায় দেড় বছর লেগে গেল ছাপা শেষ করতে। প্রকাশিত হলো ’৭৫-এর শেষের দিকে। বাংলাদেশ অ্যালবামটি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। ছয় হাজার কপি ছাপানো হয়েছিল। এক হাজার কপির বেশি বিক্রি হয়ে গেল উদ্বোধনী দিনেই। এটা হয়তো বাংলাদেশের প্রথম অ্যালবাম বলেই হয়েছিল। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছিল এটি। ব্রিটিশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি এ অ্যালবামকে ‘বুক অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। তত্কালীন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা আমাকে এক চিঠিতে লিখলেন, ‘আই কান’ট বিলিভ, ইট কুড বি প্রডিউসড ইন বাংলাদেশ’।
১৯৭৩-এর বিজয় দিবসে আর্ট কলেজে ‘বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’ নামে তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রযোজনায় এক বিরাট আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। বঙ্গবন্ধু এ প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন। এই প্রদর্শনীতে দেশের প্রায় সব আলোকচিত্রী অংশ নেন। নাইব উদ্দিন আহমদ, সাইদুল ইসলাম, মনজুর আলম বেগ, আনোয়ার হোসেন, রশীদ তালুকদার, মনজুর আলম চৌধুরী, আলতাব আহমদ, গোলাম মুস্তফা, গোলাম মওলা, আলমাজী, লালভাই, আজিজুর রহমান ও বেশ কিছু ভারতীয় আলোকচিত্রীর ছবি এখানে প্রদর্শিত হয়েছিল। এই প্রদর্শনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলাম আমি ও চিফ ইনফরমেশন অফিসার এনামুল হক। এতে আমারও বেশ কিছু ছবি ছিল। দুই ভাগে বিভক্ত ছিল প্রদর্শনী—‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ ও ‘আমার বাংলাদেশ’। প্রথম অংশ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আর দ্বিতীয় অংশে জীবন ও বাংলাদেশের নিসর্গের ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল। বিপুল লোকসমাগম হয়েছিল এই প্রদর্শনীতে।
১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এতেও বাংলাদেশের প্রায় সব আলোকচিত্রশিল্পী অংশ নেন। আমাকে শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এক বছর পর ১৯৭৯ সালে একাডেমীতে আয়োজিত হয় আমার প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এ সময়ই আনোয়ার হোসেনের এক মনোজ্ঞ একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় শিল্পকলা একাডেমীতে।
আমি মূলত একজন কৃষিবিজ্ঞানী। ১৯৭৫ সালে লিখলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যাগ্রিকালচার অব বাংলাদেশ। কৃষি উন্নয়নের পথনির্দেশনা ছিল বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। এ বই ও সার্বিক কৃষি-গবেষণার জন্য আমাকে প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেলে সম্মানিত করা হয় ১৯৭৮ সালে।
১৯৭৯ সালে আমি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে কৃষি উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্পুচিয়ায়। ছবি তোলার জন্য আমার এক বিরাট দরজা খুলে গেল। এসব দেশের নিসর্গ, মানুষ, সংস্কৃতি ও উত্সবের ওপর প্রচুর ছবি তোলার সুযোগ পেলাম। আমার প্রচুর ছবি নিয়ে টাইমস গ্রুপ সিঙ্গাপুর থেকে বার্মা নামে একটি ছোট অ্যালবাম প্রকাশ করে (১৯৯০)। এই সময়ই থাই এয়ারের সাওয়াসদি ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের সিলভার ক্রিস ফ্লাইট ম্যাগাজিনে আমার ফটো স্টোরি প্রকাশিত হয়। পদ্মা প্রিন্টার্সের খান মুহাম্মদ আমীর কালার ছবি তুলত ক্যালেন্ডার ও বই প্রকাশের জন্য। তার বেশ কিছু ভালো ছবির কালেকশন দিয়ে রেইন অ্যান্ড রিভার নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।
এর মধ্যে ১৯৮৩ সালে পোর্ট্রেট অব বাংলাদেশ প্রকাশিত হলো। আমার এই দ্বিতীয় অ্যালবামটির ছাপার মান প্রথমটা থেকে অনেক ভালো ছিল। তখন বাংলাদেশে সার্বিক প্রিন্টিংয়ের গুণগত মান দিন দিন উন্নত হচ্ছিল। এই অ্যালবামটি কলকাতার জাস্টিস মাসুদ ও শওকত ভাই (শওকত ওসমান) সত্যজিত্ রায়কে উপহার দিয়েছিলেন। তখন তিনি অসুস্থ। বিছানায় শুয়েই পাতা উল্টে দেখছিলেন। তিনি ছবির কম্পোজিশন ও রঙের সমন্বয়ের প্রশংসা করেছিলেন। এ কথা শওকত ভাইয়ের মুখে শোনা। শওকত ভাইয়ের এক রচনায়ও এর উল্লেখ আছে। তাঁর মৃত্যুতে আমার সেসব অলিখিত সাফল্যের কথা চাপা পড়ে গেল।
১৯৯৬ সালে শিল্পকলা একাডেমীতে আমার আলোকচিত্র নিয়ে বাস্তবের অন্বেষা নামে একটি বড় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। সেই সঙ্গে একটি ছোট আকারের অ্যালবাম প্রকাশিত হলো একাডেমীর প্রযোজনায়। এর কিছু দিন পর, আমার অনেক পরিশ্রমের ফল সচিত্র ও বিজ্ঞানভিত্তিক উইন্ড ফ্লাওয়ারস অব বাংলাদেশ ও বাংলার বনফুল প্রকাশিত হলো।
লাওস ও থাইল্যান্ডে থাকাকালে (১৯৮০—১৯৯০) বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবনযাত্রা নিয়ে একটি ফটো আলেখ্য আরম্ভ করি। তখন আমি এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি। মাস চারেক ভিক্ষুদের সঙ্গে বাস করলাম থাইল্যান্ড, বার্মা ও লাওসের বৌদ্ধ মন্দিরে। থাইল্যান্ডের ধর্ম প্রভাত মন্দিরে একনাগাড়ে কাটিয়ে দিলাম ৯১ দিন। সে এক বিরাট অভিজ্ঞতা। শিখলাম কী করে বিনয়ী হওয়া যায়। এই আলোকচিত্র নিয়ে গৌতম নামে এক অ্যালবাম প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। এক ঘণ্টার এক স্লাইড সাউন্ড প্রোগ্রামও তৈরি করেছি। দেশ-বিদেশে বহু জায়গায় এর প্রদর্শনী করেছি। জাপানেই দেখিয়েছি ছয়বার।
রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র ও জীবনানন্দের ধানসিড়ি নদীটির পাশে নামের দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করি (২০০২—২০০৫)। দুটিই বেশ সময়সাপেক্ষ। ঘুরে ঘুরে পদ্মা নদী, ধানসিড়ি নদী এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি। এ দুটির ছাপা অত্যন্ত উঁচু মানের। এ দুটি বই ভিডিও প্রডাকশন করেছি। শান্তিনিকেতন, কলকাতা ও ঢাকার অনেক জায়গায় প্রদর্শনী করেছি। উভয় বাংলার টিভি চ্যানেলেও দেখানো হয়েছে। ১৯০৫ সালের জুন মাসে বেঙ্গল গ্যালারিতে হয়ে গেল ‘সমন্বয়ের সন্ধানে’ নামে আমার চিত্রের আরেক বড় প্রদর্শনী।
এবার বাংলাদেশের আলোকচিত্রের দিকে একটু তাকানো যাক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫-৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস)। এই ফোরাম নবীন আলোকচিত্রীদের জন্য অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। মনজুর আলম বেগ এর প্রাণপুরুষ ছিলেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অর্থাত্ ’৭২ সালের পর বেশ কিছু নবীন আলোকচিত্রশিল্পীর কাজ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো—আনোয়ার হোসেন, আলমাজী, নাফিজ আহমদ নদভী, নাসির আলী মামুন, হাসান সাইফুদ্দিন চন্দন, রফিকুল ইসলাম, চঞ্চল মাহমুদ, রশিদুল নবী, স্বপন সাহা, শফিকুল ইসলাম স্বপন, মাকসুদুল বারী, দেবব্রত চৌধুরী, আবির আবদুল্লা। এর মধ্যে ড. শহীদুল আলমের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ—দৃক গ্যালারি ও পাঠশালা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গ্যালারিটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর জন্য সুপরিচিত। এমনি করেই দ্রুত ঘটেছে সৃজনশীল আলোকচিত্রের সম্প্রসারণ। দৃকের ‘ছবি মেলা’ আলোকচিত্র উত্কর্ষের এক সবল পদসঞ্চার।
দেরি হলেও, একটা কথা না বললে আমার আলোকচিত্র কথামালা অসম্পাদিত থেকে যাবে। ১৯৫২ সালে কৃষি কলেজে আমার প্রথম প্রদর্শনীর ঘটনা। একদিন দামি স্যুট পরা একজন সুদর্শন পুরুষ কয়েকজন সুশ্রী তরুণী নিয়ে প্রদর্শনীতে এলেন। ভদ্রলোকের কাঁধে নতুন রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা। রেডিওর এক কর্মকর্তা। তাঁদের হাস্য-লাস্য আর ওডোকলোনের উগ্র গন্ধে প্রদর্শনী ভরপুর। ভদ্রলোক আমার ও আমানুল হকের এক ছবির দিকে আঙুল তুলে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করলেন, ‘এই দেখ, তুলো দিয়ে মেঘ করা হয়েছে। এটা আর্টিফিশিয়াল।’ আমানুল হকের ছবিটি একটি অতি চমত্কার শিল্পকর্ম। একদল কৃষাণ ধান কেটে মাথায় করে বাড়ি ফিরছে। পেছনে আকাশজুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। আমার খুব রাগ হলো। এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘এটা নেচারেল। শরেশষে এ ধরনের মেঘ দেখা যায়। এটা দেখতে হলে উন্মুক্ত মাঠে যেতে হবে।’ ভদ্রলোক আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বান্ধবীদের ‘চল চল’ বলে গডগড করে বেরিয়ে গেলেন।
বহু বছর পর এই ভদ্রলোক একদিন আমার কাছে এলেন। আমার কাছে কিছু স্লাইডস চাইলেন টোকিওতে এক সেমিনারে প্রদর্শনের জন্য।
আমি মনে করি, আলোকচিত্রও চিত্রকলার মতো সমান্তরালভাবেই শিল্পকলার মর্যাদা পেতে পারে। তাই আমার কথা শেষ করছি জর্জ বার্নাড শর এ উক্তি দিয়ে, ‘someday the camera will do the work Velasquez and pieter de hoogh, colour and all…।’

নওয়াজেশ আহমদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৪, ২০০৯

Share This