চুয়াত্তর সালই হবে। পঁচাত্তর না নিশ্চিত, তিয়াত্তর হওয়ার সম্ভাবনাও কম। সে বছর একুশে ফেব্রুয়ারি সকালবেলা বাংলা একাডেমী চত্বর বেশ সরগরম। তবে তা বইমেলার কারণে নয়—বইমেলা জাতীয় কিছু তখনো পোক্ত হয়ে দাঁড়ায়নি। জনসমাগমের মূল আকর্ষণ দেশের নবীন-প্রবীণ কবিদের স্বকণ্ঠে কবিতাপাঠ ও সংগীতানুষ্ঠান। এসবের পাশাপাশি একাডেমীর মূল গেট পেরিয়ে কয়েক পা ভেতরে উত্তরদিকে মাঝারি উঁচু দেয়াল ঘেঁষে অনুজ্জ্বল দু-তিনটি বইয়ের স্টল। প্রথমটি অবশ্যই মুক্তধারার, পাশের বা তার পাশেরটির কথা মনে নেই। সে বছর অন্য কিছু বইয়ের পাশাপাশি মুক্তধারা বের করেছে শওকত আলীর উপন্যাস যাত্রা। একাত্তরে ঢাকায় পাকিস্তানি আক্রমণের মুখে রাজধানী ছেড়ে নগরবাসী পালাচ্ছে—বুড়িগঙ্গায় নৌকা করে কেরানীগঞ্জের দিকে। উপন্যাসের শুরুটা এভাবে। মুক্তধারা বইটি বের করেছে কমলা-লাল মলাটে, ছাপা-বাঁধাই সে আমলের হিসেবে বেশ ভালো। তবে আজকের পাঠক-ক্রেতা ছুঁয়েও দেখবে না। স্টলের অদূরে দাঁড়িয়ে লেখক শওকত আলী, সঙ্গে তাঁরই বয়সী দু-তিনজন, যাঁদের লেখক-শিল্পী হওয়াই সংগত। এ সময় স্টল থেকে কিছুটা ঝুঁকে ঝুঁকে বেরিয়ে এলেন মুক্তধারার কর্ণধার চিত্তবাবু। শওকত আলীর কাছাকাছি এসে খানিকটা গলা চড়িয়ে বললেন, যাত্রার যাত্রানাস্তি। গলায় ঠিক হতাশা নেই, কিঞ্চিৎ পরিহাসপ্রবণ স্বগতোক্তি। কিন্তু অল্প সময়েই একটা ঘটনা ঘটল। একজন অসামান্যা রূপবতী রমণী এক কপি যাত্রা নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে লেখকের অটোগ্রাফ চাইলেন। হতচকিত শওকত আলী একবার অসামান্যাকে দেখলেন, একবার চিত্তবাবুকে।
সবে কৈশোর পেরোনো চোখে দেখা দৃশ্যটা আজও কেন জানি মনে তরতাজা-টাটকা হয়ে আছে।
বর্ধমান হাউসের খোলা প্রাঙ্গণটি একটু একটু করে পুরোদস্তুর বইমেলায় রূপ নেওয়ার আগের সময়টা আজ এত বছর পরও চোখে জ্বলজ্বলে। সে সময় গোটা প্রাঙ্গণটাই এক অর্থে দখলে থাকত সদ্য তরুণ লিটল ম্যাগ সম্পাদকদের। দু-তিন বড়জোর চার ফর্মার একেকটা পত্রিকা। ভেতরে কবিতা। গদ্যের ছিটেফোঁটা যা থাকত, তা হয়তো দুই-আড়াই পৃষ্ঠার একটা প্রবন্ধ, নয়তো তিন-সোয়া তিন পৃষ্ঠার গল্প। পত্রিকাগুলোর অধিকাংশই খোদ সম্পাদকেরা পরম গর্বে, মমতায় বয়ে বেড়াতেন। স্থবির প্রকৃতির কেউ কেউ বাড়ি থেকে বয়ে আনা ছোট টেবিল পেতে চোখের সামনে স্বসম্পাদিত পত্রিকার গন্ধ-বাহারে মশগুল থাকতেন। বিখ্যাত কবি-লেখক-অধ্যাপকদের সৌজন্য হিসেবে পত্রিকা গছানোর পাশাপাশি বিক্রি-বাট্টায়ও মনোযোগ প্রবল। একবারের ঘটনা। আমার সহপাঠী বন্ধু, ধরা যাক, দন্তস্য (লেখক নাম উচ্চারণ করা যাবে না, খুন করে ফেলবে) মাথাবোঝাই কোঁকড়া চুলে, শার্টের কলারে কাকের বিষ্টা ওরফে গু নিয়ে রণেশ দাশগুপ্তের পিছু পিছু ছুটছে, হাতে স্বসম্পাদিত চাররঙা মলাটের পত্রিকা। দীর্ঘকায় রণেশ দাশগুপ্তের ঋজু ভঙ্গির পেছনে এঁকেবেঁকে একবার ডানে একবার বাঁয়ে ইঁদুরের মতো তার বেমানান ছুটে চলা, পত্রিকা গছানোর আকুতি যে না দেখেছে, তার জীবন অন্তত দুআনা বৃথা। রণেশ দাশগুপ্ত যতই বলছেন—লাগবে না বাপু, সে ততই জোরের ওপর, যেন জেদের ওপর চলছে—আপনাকে কমপ্লিমেন্টারি দিচ্ছি। বিরক্তি নিয়ে রণেশ দাশগুপ্ত উঁচু ঘাড়-মাথাকে হাত দেড়েক নুইয়ে বললেন, ‘কী দিচ্ছ? আবার বলো, কমপ্লি…’
বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে আজ এ-জাতীয় খুচরো দৃশ্য খুঁটিয়ে দেখার অবকাশ নেই। বইয়ের স্টল আর নতুন বইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেমন মানুষের সমাগম বেড়েছে, তেমনি হরেক রকম জঞ্জালও। জঞ্জাল সাফ করা নিয়ে প্রতিবছর ঠিক মেলা চলাকালেই নানা কথাবার্তা শোনা যায়। ওই পর্যন্তই। তবে এখন যে অবস্থা, বইমেলাকে স্থানান্তর করা ছাড়া বুঝি আর কোনো উপায়ই নেই। পরিসর বাড়লে সুষ্ঠু নিয়মনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ অন্যান্য দিকে, বিশেষ করে জঞ্জাল দূর করায় মন দিতে পারবে।
বইমেলায় প্রতিবারই যাই, রোজ রোজ না হলেও বেশ কয়েকবার তো যেতেই হয়—নিজের নতুন বই মেলায় থাকুক না থাকুক। টিএসসির দিক থেকে ভিড়ভাট্টা, হাঁটাপথও কম না। ইদানীং বুদ্ধি খাটিয়ে দোয়েল চত্বর দিয়ে টুক করে ঢুকে পড়ি। একপাশে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের হুড়োহুড়ি ও দুর্ভেদ্য জটলা, অন্যপাশে বক্তৃতামঞ্চে স্থিতধি বক্তার গাঢ় উচ্চারণের কথামালা। বৈপরীত্যটুকু উপভোগ করি। ভাবি, উন্মোচনই মোক্ষ, যার যার মতো।
মেলায় নিজের নতুন বই থাকলেও স্টলে বসার ব্যাপারটাকে বরাবরই দুঃসাহস ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না। অল্প পরিসর জায়গায় আসন গেড়ে নতুন বই প্রকাশের আনন্দটাকেই যেন মাটি করা। পাঠক আমার বই কিনবে, এ ভাবনাটাই বিস্ময়কর ঠেকে। বেশ কয়েক বছর আগে ঐতিহ্যর স্বত্বাধিকারী নাইম ঠেলেঠুলে স্টলে বসালেন। জবুথবু হয়ে বসলাম। সম্ভবত সে বছর ঐতিহ্য আমার দুটো বই বের করেছিল। ঘণ্টা খানেক বসেছিলাম। এর মধ্যে তিন-চার কপি বই বিক্রি হয়ে যেতে ভেতরে ভেতরে আমি ভীষণ উত্তেজিত। আবার অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে কী যে বিপত্তি, কী লিখি? কী লিখেন জাফর ইকবাল, হুমায়ূন আহমেদ, মিলন? অনেক বছর পর এবার মেলার দ্বিতীয় দিনে শুদ্ধস্বর-এর তরুণ কর্ণধার আহমেদুর রশীদ হুকুম জারি করলেন, স্টলে বসতই হবে। শুদ্ধস্বর এবার মেলায় এনেছে আমার দুটো বই। ভাবলাম, আশপাশে তেমন লোকজন নেই, বসি কিছুক্ষণ। ভেতরে ঢুকে কেবল ঘাড় ফিরিয়েছি, বসিওনি, দেখি, মুখোমুখি ভুবনভোলানো হাসিসমেত নন্দিত কথাকার আনিসুল হক। কুশল বিনিময়ের পরই আনিস ঝটপট আমার বই দুটো তুলে দাম মেটাতে যাচ্ছেন, ভাবলাম বলি, আনিস, একটা কেনেন, অন্যটা আমার সেই বন্ধু দন্তস্যর কমপ্লিমেন্টারি। ততক্ষণে দাম মিটিয়ে আনিস বই বাড়িয়ে ধরেছেন কিছু লিখে দিতে। কী বিপত্তি, কী বিপত্তি!
জঞ্জালের কথা বলছিলাম। বইমেলার মতো মাসব্যাপী বড় আয়োজন নিপাট পরিশুদ্ধ হবে, এমন আশা বোধ হয় বাড়াবাড়ি। তবে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাম্য। সস্তা, চটুল, মাথামুণ্ডুহীন বই নামক মলাটবন্দী ছাপা কাগজ মেলার উৎ কর্ষের পথে বড় বাধা। কোথাও যেন একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের ব্যাপারও চোখে পড়ে। বই-ই তো, চুরি-ডাকাতি না, লিখুক না যে যেমন পারে। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন মেলায় কতটা নতুন বই এল, আগের বারের চেয়ে কম না বেশি—এসব বালখিল্য হিসাবনিকাশে আর যা-ই হোক বইমেলা এক কদমও এগোবে না। আর মেলাকে সামনে রেখেই বা কেন সারা বছরের বই বেরোবে, এও ভাবার বিষয়।
বইমেলা নাগরিক বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হবে, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ নেই। যাত্রা, সার্কাস বা রেসের মাঠও অগুনতি মানুষকে বিনোদন জোগায়। সে কারণেই ভেদরেখাটা জরুরি, যাতে বইকে আলাদা করে—মাথায় করে, নিদেন বুকে করে রাখা যায়।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০১০