আখতারুজ্জামান ইলিয়াস – তাঁর সঙ্গ অনুষঙ্গ
মহীবুল আজিজ

পাইপসমেত দুজন মানুষকে কখনই ভুলতে পারি না। তাঁদের একজন অবশ্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। পাইপসংক্রান্ত গৌরচন্দ্রিকাটুকু প্রথমেই সেরে নেওয়া যাক। বর্তমান লেখাটা দ্বিতীয় জনকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখি ১৯৭২-এ। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর জনসভায়, বাবার কাঁধে চড়ে দেখতে হয়েছে তাঁকে। তখন পাইপ দেখেছি কি না মনে নেই। কিন্তু দ্বিতীয় ও শেষবার ১৯৭৫ সালের পয়লা আগস্ট তারিখটি এখনো দপদপ করে জ্বলছে। আমরা সরকারি মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্ররা স্কুলের খেলার মাঠ লালদীঘি ময়দানে জড়ো হয়েছি। বঙ্গবন্ধু যাবেন বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনে। মঞ্চ তৈরি হয়েছে ময়দানে। আমাদের হাতে সজ্জিত রংবেরঙের মালা। আমার এক ক্লাস নিচে ছিলেন আজকের বিখ্যাত গায়ক আইয়ুব বাচ্চু এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হাসান মাহমুদ। ছিলেন তাঁরাও। সবটা সময় মঞ্চের সন্নিকট থেকেই দেখলাম। অপার মুগ্ধতা আর বিস্ময় নিয়ে সেই দেখা। সেই শেষ কিন্তু এখনো দাঁড়িয়ে আছেন তিনি পাইপ হাতে, বক্তৃতারত—ইতিহাসের বরপুত্র।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে আমি চিঠি লিখি ১৯৮৬-র জুলাই মাসে। উদ্দেশ্য, লিটল ম্যাগাজিন নামক ছোট কাগজের প্রথম সংখ্যার জন্য ছোটগল্প বিষয়ে একটি মিনি সাক্ষাত্কার নেওয়া। ২০-৭-১৯৮৬-তে ১২/৩ কে এম দাশ লেন, টিকাটুলি, ঢাকা-৩ থেকে চিঠি আসে তাঁর লেখাসহ, সেই সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ। চার পৃষ্ঠার সেই প্রশ্নোত্তর এখন আমারই সামনে রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘ব্যক্তিকে স্থাপন করতে হয় সমাজের প্রেক্ষিতেই, ব্যক্তির ভেতর দিয়ে সমাজ বিকশিত হয়, আবার সমাজ গড়ে তোলে ব্যক্তিকে’—ইত্যাদি। চিঠির মানুষটাকে এরপর দেখতে পেলাম কাছ থেকে। বহুবার বহু প্রসঙ্গে তাঁর কাছে গিয়েছি, অপ্রসঙ্গেও গিয়েছি। বাংলা উপন্যাসের অবিসংবাদিত এ স্রষ্টার সঙ্গে সময় কাটাবার লোভ—আমার মতন অনেকের কাছেই ছিল একদিন মহার্ঘ। এত দিন পরও দেখতে পাচ্ছি কে এম দাশ লেনের বেঙ্গল স্টুডিওর পেছনে হুমায়ুন সাহেবের বাড়ির গেটে দাঁড়ানো ইলিয়াস বলছেন, ‘এসো কিন্তু!’
টিকাটুলিতে হাড়ের ডাক্তার মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িটি আমাদের জন্য অচিরে একটি তীর্থস্থান হয়ে দাঁড়ায়। ইলিয়াসের উপস্থিতিতে সারাক্ষণ আলো ছড়াত পুরান ঢাকার এ বাড়িটি। হয়তো ইলিয়াসের অনেকটা সময় ছিনতাই করে নিয়েছি আমরা তরুণেরা কিন্তু তিনি সর্বদাই ছিলেন দানপ্রবণ। পৃথিবীর তাবত্ বিষয়ে আড্ডায় মেতেছি আমরা, সমৃদ্ধ হয়েছি, স্নাত হয়েছি। দুহাত বাড়িয়ে সবাইকে তিনি গ্রহণ করেছেন, কখনো কোনো কুণ্ঠাবোধ তাঁকে সিটিয়ে দেয়নি। অথচ এসবের ভেতরেই নিভৃতে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে কাত্লাহার বিলের কাহিনি কি ইলিয়াসীয় গল্পাবলি এবং টান টান প্রবন্ধসমুচ্চয়।
আমার নিবাস চট্টগ্রাম, সে সূত্রে সৌভাগ্য খানিকটা আমার দিকে ঝুঁকেছিল। মনে পড়ে একবার তাঁকে খুব খেপিয়ে দিয়েছিলাম। উপন্যাসটা প্রথমে পড়ি সাপ্তাহিক রোববার-এ চিলেকোঠা নামে, পরে হলো চিলেকোঠার সেপাই। পাঠ-অভিজ্ঞতার সূত্রে প্রশ্ন করেছি, ‘আপনার হাড্ডি খিজির অত গালিগালাজ করে কেন?’ দুম করেই উত্তর দেন তিনি, ‘কিসের গালিগালাজ ওইটা তো ওর ভাষা! আর ওর আসল ভাষা কেড়ে নিয়েছি আমরাই!’ ঢাকা থেকে ফিরে আসি এবং ২৩-৪-১৯৮৭ তারিখে লেখা তাঁর সেই বিখ্যাত চিঠি এসে পৌঁছায় এ অভাজনের কাছে। চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাস এবং এতে হাড্ডি খিজিরের স্ল্যাং এবং আনোয়ারের পরিণতি সম্পর্কে তাঁর নিজের ভাষ্য। সে চিঠি এখন অমূল্য সম্পদ এবং ইলিয়াস-সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে অমোঘ সহায়ক সূত্র। শুধু দুইটা লাইনেই ইলিয়াসের বক্তব্যের তীব্রতা ঝলকে ওঠে, ‘শোষণের চাপে তাদের ভেতরটা এমনভাবে কুঁকড়ে গেছে যে সেই গ্লানি বা তিক্ততায় কখনো প্রতিরোধে ফুঁসে উঠতে পারে না। বড় জোর ক্ষোভে পরিণত হয়। এই তিক্ততা, ক্ষোভ ও গ্লানি বের করার নালা হলো তাদের খিস্তিখেউড়ের চর্চা।’ সাহিত্য তাঁর কাছে ফ্যাশনের বস্তু ছিল না, ছিল রক্ত-ঘাম ঝরানো সৃজনকর্ম। তখন যাঁরা তাঁর সংস্পর্শ পেয়েছেন, কথাশিল্পী কায়েস আহমেদ, গল্পকার মামুন হুসাইন, সুশান্ত মজুমদার, শিল্পী ঢালী আল মামুন, ইলিয়াসের বন্ধু মাহবুবুল আলম জিনু, অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এ রকম আরও অনেকেই, আমাদের সবার কাছেই ইলিয়াসের যেকোনো রচনা ছিল আগ্রহের বিষয়।
কেবল নিজের লেখা নয়, অন্যের লেখা সম্পর্কেও সিরিয়াস ছিলেন ইলিয়াস। বিশেষ করে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ এবং সমকালীনদের সম্পর্কে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মতামত পাওয়া যেত। নির্গ্রন্থ মামুন হুসাইনের গল্প তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। ইলিয়াস অকুণ্ঠে জানান, মামুনের গল্পগ্রন্থ বের হওয়া দরকার। আহমদ বশীরকে নিয়েও তাঁর প্রত্যাশা ছিল, যদিও এঁকে আর লেখালেখিতে দেখা যায় না। মনে পড়ে জনৈক তরুণ কথাশিল্পী তাঁর একটি উপন্যাস পাঠান ইলিয়াসের কাছে, মূল্যায়ন ও মতামত চেয়ে। ইনি পরে বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার পান এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত কথাসহিত্যিক। সাহিত্যের বেলায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন পারফেকশনিস্ট। তাঁর ঘরের একটি সাইড-টেবিলে প্রায়ই দেখতাম একটি উপন্যাস রাখা—মিগুয়েল সার্ভান্তেসের দোন কিহোতে। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস। মাঝেমধ্যে বলতাম সার্ভান্তেস হচ্ছে তাঁর বাইবেল।
সার্ভান্তেসের সদর্থক প্রভাবও হয়তো ইলিয়াসে বর্তেছে খানিকটা। আমার প্রথম গল্পগ্রন্থের দ্বীপবাসীদের গল্প-এর বর্ণনভঙ্গি তাঁর ভালো লেগেছিল। পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে উপন্যাস লিখলে যাতে এর ভঙ্গিটি ব্যবহার করি। ঢাকা থেকে ১৬-১২-১৯৯০-এ লেখা চিঠিতে তিনি জানান, ‘চতুরঙ্গ পত্রিকার নভেম্বর সংখ্যায় তোমার “গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্স ও নবিতুনের ভাগ্যচাঁদ”-এর একটি ছোট আলোচনা বেরিয়েছে। …পত্রিকাটি থেকে ক্লিপিং পাঠালাম।’ আমার বই কলকাতায় পাঠান তিনিই। অন্যের মূল্যায়নে যাঁর এত উত্সাহ, সেই তিনিই লিরিক-এর বিষয়ে ছিলেন দারুণ নিরাসক্ত। আমাদের বন্ধু এজাজ ইউসুফীকে সে লিরিক-ইলিয়াস সংখ্যা প্রকাশে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে সেটা এজাজই জানে, আর জানি আমরা কজন। তাঁর প্রতি তরুণতরদের উত্সাহকে কিন্তু তিনি মূল্য দিতেন। লিরিক প্রকাশের পর একটি চিঠিতে (২৭ মার্চ ১৯৯৩) তাঁকে পাচ্ছি—
‘চট্টগ্রামে লিরিক গত বছর আমার ওপর একটি বিশেষ সংখ্যা বের করেছে, সেখানে তোমার একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা রয়েছে। ওখানে আমার একটি উপন্যাস খোয়াবনামার একটুখানি অংশ ছাপা হয়েছে, তিন মাস ধরে আমি দিনরাত ওই উপন্যাসের ওপরেই কাজ করে চলেছি। কিন্তু উপন্যাস আর এগোয় না। চতুর্থ অধ্যায় লেখার পর দ্বিতীয় অধ্যায় ফের লিখতে শুরু করলাম, সেটা শেষ হলো তো নতুন করে ধরলাম তৃতীয় অধ্যায়। লেখাটা ভালো হচ্ছে না, কিন্তু লিখতে আমার ভালো লাগছে।’
ঠাট্টা, ব্যঙ্গ এসব তাঁর স্বভাবের এবং লেখার বৈশিষ্ট্য বলেও মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ। মানুষের কাজের নিরিখে তাকে সঠিক মূল্য দিতে তিনি পিছপা হতেন না। সমকালীন লেখক হাসান আজিজুল হক এবং শওকত আলী সম্পর্কে সশ্রদ্ধ মূল্যায়ন করতে শুনেছি তাঁকে। বলতেন, ‘হাসান ভাইয়ের লেখার যেদিকটা আমার সবচাইতে ভালো লাগে, তা হলো তাঁর উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা। তিনি জানেন যে লেখাটা কতদূর পৌঁছাচ্ছে।’ কিংবা শওকত আলী সম্পর্কে, ‘আরও সময়নিষ্ঠ হয়ে লিখলে হয়তো শকওত ভাই আমাদের ইতিহাস এবং সমাজের অনেক অকথিত দিক তুলে আনতে পারবেন।’ সৈয়দ হক সম্পর্কে বলেছেন, ‘সৈয়দ হক নগরটাকে চেনেন, এর জটিলতা, এর অভদ্রতা-ইতরামির চেহারাটা তাঁর জানা।’ ইলিয়াস খুব ভক্ত ছিলেন অভিজিত্ সেনের বহু চণ্ডালের হাড় উপন্যাসের এবং মহাশ্বেতা দেবীর চেট্টি মুণ্ডা ও তার তীর এবং আরও কয়েকটি উপন্যাসের। দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত উপন্যাসের প্রশংসাও শুনেছি তাঁর মুখে। মানুষের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কারণেই একেবারে নামপরিচয়হীন মানুষটিকেও তিনি মূল্য দিতে জানতেন। গৃহপরিচারিকার সংসার-স্বজনের খবর নিতেন তিনি অত্যন্ত মনোযোগসহকারে। পুরান ঢাকার হোমিও চিকিত্সক ডাক্তার নেইমান, জনৈক ঘড়িমেরামতকারী কিংবা কোনো এক জুতা সেলাইওয়ালার কাহিনি এত ডিটেলসহ বলতে থাকেন যে মনে হয় এই ডাক্তার, এই মেকার এবং এই কবলার এঁরা সমাজের খুবই গুরুত্বধারী ব্যক্তিত্ব।
১৯৯০-তে তাঁকে নিয়ে যাই চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, চকরিয়া সফরে। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সেই সাংস্কৃতিক সফরের কান্ডারি ছিলেন অধ্যাপক আসহাবউদ্দিন আহমদ। আসহাবউদ্দিনের বাড়ি সাধনপুরে শীতের সকালে আমাদের ভাগে পড়ল নানা ধরনের পিঠে। একটা বিশেষ ধরনের পিঠের নামে বেশ আকৃষ্ট হলেন তিনি—‘আতিক্কা পিডা’। অতঃপর আমাকে জেনে নিতে হলো সে পিঠের প্রস্তুতপ্রণালি ও নামকরণের হেতু। চট্টগ্রামে ‘আতিক্কা’ শব্দের অর্থ ‘হঠাত্’ বা ‘আচমকা’। ঘরে মেহমান এলে স্বল্প উপাদানযোগে দ্রুত তৈরি করা যায় বলে পিঠার নাম ‘আতিক্কা পিডা’। আমি কৌতুক করে বলি, ‘নিশ্চয়ই কোনো লেখায় ঢোকাবেন!’ আসলে চির কৌতূহলী ইলিয়াস জানার মধ্যে কোনো ফাঁক রাখতেন না।
চট্টগ্রামের কথা উঠল। ১৯৯০-এ তিনি দুবার চট্টগ্রামে আসেন—প্রথমবার বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাংগঠনিক সফরে, সম্ভবত জুলাইয়ে এবং দ্বিতীয়বার অক্টোবরে লেখক শিবিরের সপ্তম দ্বিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে। সাংগঠনিক সফরে আরও আসেন বদরুদ্দীন উমর, হাসান আজিজুল হক ও আনু মুহাম্মদ। সাংগঠনিক ব্যস্ততার অবসরে তাঁর ইচ্ছেমতো আমরা ঘুরে বেড়াতে থাকি চট্টগ্রামের নানা জায়গায়, পতেঙ্গায়, বাটালি হিলে, ফয়’স লেকে। প্রসঙ্গক্রমে আমি তাঁর ‘যুগলবন্দী’ গল্পের কথা ওঠাই। সাপ্তাহিক রোববারে প্রথম পড়ি, পরে এটি ছাপা হয় দোজখের ওম গল্পগ্রন্থে। এটি চট্টগ্রাম শহরের প্রেক্ষাপটে লেখা—বন্দর, কাস্টমস, রিয়াজুদ্দিন বাজার, মাদারবাড়ি, স্ট্যান্ড রোড, স্টেশন রোড, কর্ণফুলী—এসব প্রামাণ্যভাবেই আছে গল্পে। তাঁকে বলি, চট্টগ্রাম শহরের সহায়তা পেলেন কীভাবে? জানালেন, সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে তিনি চট্টগ্রাম আসেন ছোট ভাই প্রখ্যাত অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের বিয়ে উপলক্ষে। খালিকুজ্জামানের স্ত্রী পারভীন জন্মসূত্রে ভারতীয়, অবাঙালি। কিন্তু কি ইংরেজি কি বাংলা উভয়ে পারভীনের দখল অসামান্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া পারভীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি করেন জোসেফ কনরাড এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লহর উপন্যাসের তুলনামূলক বিচার বিষয়ে। ইলিয়াসের উত্সাহে খুঁজে বের করা গেল মাঝিরঘাটের পারভীনদের বাড়ি। সম্ভবত ওর মা তখনো বেঁচে ছিলেন। ইলিয়াস ভাই এবং আমাকে স্বল্প সময়ের জন্য পেলেও বেশ আপ্যায়ন করলেন তাঁরা। ইলিয়াস বলেন, চট্টগ্রামের ছবি ভেসে উঠলেই শহরের এদিকটার কথাই মনে পড়ত। বেশ খোলামেলা, পুরোনো পুরোনো, অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট, বাড়ির দোতলা থেকেও সদরঘাটের, কর্ণফুলীর জাহাজের মাস্তুল চোখে পড়বে। তত দিনে চট্টগ্রাম যথেষ্ট বদলালেও মাদারবাড়ি, মাঝিরঘাট কি সদরঘাটের দিকটা বহুদিন প্রায় একই রকম থেকে যায়।
নব্বইয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একাধিকবার চট্টগ্রামে আসাটা এখানকার তরুণ সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মীদের বেশ অনুপ্রেরণা জোগায়। মনে রাখতে হবে, তখন দেশজুড়ে স্বৈরাচার এবং বিরোধী আন্দোলন চলছে সমান্তরালে। চট্টগ্রামের নানা স্থানে সাহিত্যের আড্ডাগুলোও জমজমাট। এত যে নিয়ন্ত্রণ, এত যে বিধিনিষেধ তবু আমাদের আড্ডাপ্রাবল্যকে ঠেকানো যায় না। ইলিয়াস এবং হাসান দুজনকেই আমরা নিয়ে যাই বাংলা বিভাগে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তখন বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক খালেদা হানুম। বাংলা উপন্যাস প্রসঙ্গে। সামাজিক বিবর্তন, ব্যক্তির অবস্থান এবং ঔপন্যাসিকের দর্শন—এসব বিষয় মুখ্য হয়ে ওঠে আলোচনায়। কিন্তু সব ছাপিয়ে তরুণদের সঙ্গে গড়ে ওঠে এক সখ্যসেতু। ইলিয়াস উত্সাহী হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামে তরুণদের আড্ডা সম্পর্কে। এক সন্ধ্যায় তাঁকে নিয়ে গেলাম চকবাজারের সবুজ আড্ডায়। অদ্ভুত ব্যাপার, পাশের টেবিলে দেখি পরিচিত এক ডিআইবির লোক। তাঁকে নিম্নস্বরে বলি, ভাই, এখনই আমরা সরকারকে টেনে নামাচ্ছি না। ভদ্রলোক বলেন, ভাই, চাকরি! সবুজ তখন আড্ডারুদের তাপে উত্তপ্ত। হাফিজ রশিদ খান, এজাজ ইউসুফী, আহমেদ রায়হান, জিললুর রহমান, খালেদ হামিদী এবং এঁদের কিছুক্ষণ পরেই এসে পড়েছেন জাফর আহমদ রাশেদ, রাজীব নূর, পুলক পাল এবং মাঝেমধ্যে অলকা নন্দিতা কিংবা তনুজা শর্মা। সাজিদুল হক, শাহীনুর রহমান, হাবিব আহসান, সিরাজুল হক সিরাজ এ রকম কত মুখ। ইলিয়াসকে ঘিরে সেই সন্ধ্যায় ক্লান্তিহীন আড্ডা হলো। এই ‘আড্ডা’র যোগাযোগেই এজাজ ইউসুফীর লিরিক-ইলিয়াস সংখ্যার উত্থাপনা। এটা খুব গৌরবের ব্যাপার যে ইলিয়াসের মতো একজন মহান ঔপন্যাসিকের সাহিত্যের মূল্যায়নের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নেয় চট্টগ্রাম। সেদিন এবং পরে নানা সময়ে দেখেছি লিরিক বিষয়ে কথা উঠতেই ইলিয়াস তরুণ পাঠক শ্রেণীর কথাই বলতেন। প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক-সমালোচক নয় এখনকার তরুণ লেখক-পাঠক ইলিয়াস-সাহিত্য বা চিলেকোঠার সেপাই পড়ে কীভাবে সেটা লিরিক-এর বিবেচ্য হওয়া উচিত। লিরিক ইলিয়াস সংখ্যা নিশ্চয়ই তাঁর মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে পেরেছিল। আরও উল্লেখ্য, ইলিয়াসের সবুজ-আড্ডায় উপস্থিতির কালে জাফর আহমদ রাশেদ উঠতি তরুণ। পরবর্তী সময় স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে তাঁর গবেষণার বিষয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প যেটি আরও পরে (২০০১) প্রকাশ পায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প: জীবনোপলব্ধির স্বরূপ ও শিল্প নামে। তা-ও চট্টগ্রামের গৌরব। তখন ইলিয়াস-সাহিত্য পাঠ্যসূচিতে ছিল না। কিন্তু রাশেদের গবেষণাকর্মটি একদিক থেকে পথিকৃতের ভূমিকার অহংকার করতে পারে। আজ বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠানে এবং পশ্চিমবঙ্গে ইলিয়াস-সাহিত্যের অধ্যয়ন চলছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের টেবিলে মিগুয়েল সার্ভান্তেসের দোল কিহোত-এর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি লক্ষ করেছি। আমার টেবিলে রয়েছে খোয়াবনামা ও চেলেকোঠার সেপাই। নিশ্চয়ই আজকের তরুণ লেখকেরাও ইলিয়াস-সাহিত্যের উত্সাহী পাঠক। ইলিয়াস তরুণদের কদর করতেন, তরুণদের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন তিনি। কেননা, তিনি জানতেন, আজকের তরুণরাই একদিন চিলেকোঠা ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে বিস্তৃত আঙিনায়। ইলিয়াসকে ভাবতে গেলেই আমরা ফের তরুণ হয়ে উঠি এবং পাইপসমেত মানুষটিকে কখনই আর ভুলতে পারি না, যেমন ভুলতে পারি না বঙ্গবন্ধুকেও।

মহীবুল আজিজ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারী ১২, ২০১০

Share This