ইতিহাসের অন্তরের ঝোঁক
তৈমুর রেজা

ভ্যান শেন্ডেল তাঁর বইয়ের ভূমিকা এই বাক্য দিয়ে শুরু করেছেন, ‘এই বইটির বিষয় সেই সব বিস্ময়কর বাঁক আর মোচড়, যা থেকে উদ্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ।’ কথাটা একেবারে নাকের ডগায় হ্যারিকেনের মতো ঝুলিয়ে দেবার ওজর হলো, নীহাররঞ্জন রায় বা দীনেশচন্দ্র সেনের মতো বাংলার ষোলআনা ইতিহাস রচনার ভার নেননি ভ্যান শেন্ডেল; তেমন ইতিহাস এখানে খুঁজতে গেলে পাঠক হতাশ হবেন। অর্জুন যেমন লক্ষ্যভেদের সময় শুধু পাখির চোখ দেখতে পান তেমনি এক একনিষ্ঠ মনোযোগ আছে শেন্ডেলের। সমাজের তলানিতে থেকে যেসব ঐতিহাসিক ঝোঁক শেকড়ের মতো রসদ জোগাচ্ছে সেগুলোকে মেলে ধরাই তাঁর অভিপ্রায়।
শেন্ডেল আধুনিক ঐতিহাসিক, তাই সেকেলে ঐতিহাসিকের মতো যুদ্ধের সন-তারিখ তালাশ করেননি। ইতিহাসের ছোট ছোট খুপরিঘরের বদলে তিনি মন দিয়েছেন লম্বা লম্বা বাঁক বুঝে নিতে, ঘূর্ণির ভেতরে টিকে থাকা প্রায় অবিকল কাঠামোকে চিনে রাখাই তাঁর ব্রত। এই সন্ধানের পথেই তিনি বুড়ি-ছোঁয়ার মতো করে ছুঁয়ে গেছেন ইতিহাসের প্রধান ঝোঁকগুলো।
তাঁর সুলুকসন্ধান শুরু হয়েছে ভূগোল থেকে। হিমালয় থেকে নামতে নামতে সাগর ছোঁয়ার পথে খাড়িটা যেখানে মিইয়ে এসেছে সেটা একটা বদ্বীপ, যার নিয়তি জল আর পলিমাটির কাছে বাঁধা—এর নাম বাংলাদেশ। আর দশজন পণ্ডিত বাংলাদেশের এই ভৌগোলিক দশাকে ‘জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাবসার্ডিটি’ বলে ক্ষ্যান্ত হয়েছেন। কিন্তু শেন্ডেলের প্রতিভাদীপ্ত সিদ্ধান্ত—এই ভৌগোলিক কাঠামোই বঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিমার গড়ন তৈয়ার করেছে।
লেখকের মতে, বঙ্গ মুল্লুক বোঝার ক্ষেত্রে আদি ধরতাই হলো ফ্রন্টিয়ার। ফ্রন্টিয়ার একটি কল্পিত রেখা, যার এপার-ওপারে বিরাট গরমিল থাকে। আর্য-সংস্কৃতি যখন ক্রমে বাংলায় ঢুকছিল, তার সামনে ছিল অনার্য সংস্কৃতি; এই দুই সংস্কৃতির মাঝখানের রেখা হলো ফ্রন্টিয়ার। এই দুই তরফের ঠোরামুরির মধ্যে বাংলার সমাজের পরিচয় মিলবে।
শেন্ডেলের প্রস্তাবের তুরুপের তাস বোধ করি মুসলিম-বাঙালি দ্বৈরথ (ডিকোটমি)। বাংলাদেশে ইসলামের এমন সর্বগ্রাসী চল হলো কেন সেটা ফিরিঙ্গি পণ্ডিতদের এক বিরাট সমস্যা। ইটনের কর্জ-স্বীকার করে শেন্ডেল ইসলাম-প্রতিষ্ঠার তাফসির করছেন—বিভিন্ন ফ্রন্টিয়ার একযোগে ভেঙে পড়ার কার্নিভালে ইসলাম জঙ্গল বশীকরণের ভাবাদর্শ হয়ে উঠেছিল। এর পর থেকে পুরো বইতে ঘুরেফিরে যাকে বুঝতে চেষ্টা করা হয়েছে তার নাম—বাঙালি মুসলমানের মন।
কেতাবি পাঠের হাওয়া দিয়ে সমাজের অন্তঃপুর সব সময় উদোম করা কঠিন। তাই বিদেশি লেখকের ইতিহাসে সাদামাটা ছবি নিয়েও গড়বড় হতে পারে। শেন্ডেল যেমন ধর্মীয় ফ্রন্টিয়ার বোঝাতে প্রবল মুসলিম সত্তার মুখোমুখি দাঁড় করান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে, এ ক্ষেত্রে হিন্দুবাদের কথা তিনি বিস্মৃত হন; যদিও সাংস্কৃতিক ব্যভিচার বোঝাতে হিন্দুয়ানি অনুষঙ্গের দোহাই আছে অনেকবার। এই বিভ্রান্তির কারণ সম্ভবত কিছু ক্ষুদ্র অনুষঙ্গ নিয়ে তাঁর তীব্র অনুরাগ (তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন)। ফলে ছোটখাটো অনুষঙ্গের ওপর প্রায় গন্ধমাদনের মতো মহাভার চেপে বসে।
বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্ব খোঁজাতেই জাতীয় ইতিহাসের আনন্দ। শেন্ডেল ঠিক উল্টো পথে হেঁটেছেন, তিনি একতার বদলে ভিন্নতা তালাশ করেছেন। ভাষার ফ্রন্টিয়ার নিয়ে আলাপের শেষদিকে তিনি লিখছেন, ‘এসব আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে তিনটি রূপ [সিলেটি, চাটগেঁয়ে, চাকমা] প্রমিত বাংলাভাষীদের কাছে বোধগম্য নয়, সে কারণে এসব আঞ্চলিক রূপকে পৃথক ভাষা বলে বিবেচনা করা উচিত।’
গ্রিয়ারসন তাঁর লিংগুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়াতে যদিও চাকমাকে বাংলার ‘ব্রোকেন ডায়ালেক্ট’ বলে মত দিয়েছেন, তবু এই মত মোটামুটি স্বীকৃত যে চাকমা স্বতন্ত্র ভাষা, তাদের নিজস্ব বর্ণমালা আছে। কিন্তু চাটগেঁয়ে বা সিলেটি ভাষার নির্বাংলাকরণে যে পরশুরামের বৈধ মনোযোগ থাকবে তার নাম—প্রমিত-মাস্টার।
মোগল-ব্রিটিশ-পাক—এই কলোনিয়াল ট্রিলজির একটা দুর্দান্ত ছবি এঁকেছেন তিনি। ছয় মাসের রাস্তা ছয় দিনে যাওয়ার মতো খুব ঘন ছোট্ট পরিসরে তিনি এই দীর্ঘ পথটা ছুটেছেন; যেন তিনি রূপকথার বুড়ি, সত্তর হাজার উট, রাজা-উজির সব তার ঝুলির মধ্যে পোরা।
মুসলিম আর বাঙালি ভাবাদর্শের দ্বৈরথ শেন্ডেল দেখতে পাচ্ছেন প্রায় পুরাকাল থেকে। মোটা দাগে বঙ্গের জাতীয় পরিচয়ের মূল বাঁকগুলো এ রকম: ক. চল্লিশের দশকে এক ‘ইসলামিক ভিশনে’র স্বপ্নে জাতীয়তা খাড়া করার কোশেশ; খ. সত্তরে আঞ্চলিক বাঙালি পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা—জাতীয় পরিচয় বাঙালি মুসলমান; গ. তারও পঁচিশ বছর পর ইসলামি জোশের জোয়ার—জাতীয় পরিচয় মুসলমান বাঙালি। জাতীয় ইতিহাস প্রসঙ্গে তাঁর অসামান্য পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের ফোকাল পয়েন্টে দেশভাগ নেই; এখানেই ভারত বা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস যুদা ও সাবালক হয়েছে।
মুসলিম মানস জুতমতো বুঝতে তিনি বাঙালি-বাংলাদেশি দ্বৈরথও এঁকেছেন নিপুণভাবে। বাঙালিবাদীদের বয়ান শুরু হয় বায়ান্নর ভাষাচেতনায়, পাকিস্তান একটা ছেদ মাত্র। অন্যদিকে, বাংলাদেশিবাদীরা আরম্ভ করেন সাতচল্লিশ, অর্থাৎ পাকিস্তানের জন্ম থেকে; ব্রিটিশ বা পাকিস্তান কালপর্বের ভেতর দিয়ে ক্রমে সেয়ানা হয়েছে এই জনপদের বাঙালি মুসলিম মনোভঙ্গি।
শেন্ডেলের ইতিহাস ছোট করে আনলে মূল বক্তব্য হবে, বাঙালি-মুসলিম দ্বৈরথই সমকালীন বাঙালিসমাজের প্রাণভোমরা, যেখানে মুসলিম সত্তারই আজকার দাপট। তিনি লিখছেন, ‘বঙ্গের অধিবাসীদের সিংহভাগ যদি মুসলমান না হতো তাহলে হয়ত কখনোই বাংলাদেশ নামক একুশ শতকের একটি রাষ্ট্র গড়ে উঠতো না।’
মূল কথা শেষ। এবার কিছু খুচরো কথা। শেন্ডেল এ দেশের পপুলার কালচার পাঠের চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক জনসংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর মন্তব্য, এই সংস্কৃতি আদ্যোপান্ত চুয়ান্নর নির্বাচনের সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত, সেই একই পুরোনো কৃত্য—ময়দানে গরম বক্তৃতা, বিক্ষোভ, হরতাল, নির্বাচনী ইশতেহার—অদ্যাবধি সমানে চলিতেছে। তবে কোথাও কোথাও তিনি প্রায় সর্বনাশ করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘নতুন সাংস্কৃতিক প্রতীক মোটেই আর সুকুমার কবি [রবীন্দ্রনাথ] ছিলেন না…সেটা হয়ে দাঁড়াল রাস্তার বখাটে মাস্তান।’ এই ভুতুড়ে উপলব্ধি তাঁর সম্ভবত হয়েছে ঢাকাই সিনেমার পোস্টার দেখে। রবীন্দ্রনাথ আর সিনেমার মাস্তান—সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই শ্রেণীর আইকন, যাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাসে কোনো বিপ্লব ঘটেনি।
বিদেশি মুদ্রায় কাপ্তাই বাঁধ হলো, লাখো মানুষের বসতি ডুবে গেল জলের তলায়—এই দুঃখ ভ্যান শেন্ডেলের বুকে ঠিকই বাজে। খয়রাতির ওপর ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো আমাদের পুরোনো অভ্যেস, তিনি তার প্রচ্ছন্ন নিন্দা করেছেন। কিন্তু খয়রাতি দেবার পেছনে পৃথিবীর বাবুদের মনোভাব শুদ্ধ সদকার নয়—নিও-ইম্পেরিয়েলিজমের এই গোড়ার কথাটা কিছুতেই তাঁর মনে আসে না। বাংলাদেশে এনজিওদের ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমে জোর বাহাস চালু আছে, কিন্তু শেন্ডেলের লেখায় তার কোনো অভিঘাত নেই। তিনি ইসলামের বিপরীতে এনজিওগুলোর উদারপন্থী প্রতিমা দেখেই তৃপ্ত।
বইটি যখন প্রকাশ হলো তখন এ দেশে ছদ্মবেশী সামরিক শাসন চলছে। ভ্যান শেনডেল এটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা করতে যাননি।
অ্যা হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ—ভেলেম ভ্যান শেন্ডেল, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস ইন্ডিয়া, ২০০৯; ৩৪৭ পৃষ্ঠা, ৪৯৫ রূপী।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ১৩, ২০১০

Print Friendly, PDF & Email
%d bloggers like this: