akshaykumar-mitra

সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ
অন্য অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

মুহাম্মদ লুৎফুল হক

অক্ষয় কুমার মৈত্রে ১৮৬১ সালে এ দেশে তিনজন বিখ্যাত বাঙালির জন্ম হয়, তাঁরা ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। এ বছর এ তিনজনের জন্মের সার্ধশততম বছর উত্তীর্ণ হচ্ছে। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে উভয় বাংলায় অনেক আয়োজন হয়েছে, প্রফুল্লচন্দ্রকে নিয়ে ওই বাংলায় কিছু কিছু আয়োজন হয়েছে, কিন্তু অক্ষয়কুমার দুই বাংলাতেই অগোচরে থেকে গেছেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলা ভাষায় আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস চর্চার প্রবক্তা। তিনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ, সুসাহিত্যিক, নাট্যানুরাগী, সম্পাদক, সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু এর বাইরেও তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছেন তা আমাদের অনেকেরই অজানা। দুটি ক্ষেত্রে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র অবদান নিচে উল্লেখ করলাম।

অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও বাঙালি পল্টন
ইংরেজ শাসনামলে বাঙালিকে অসামরিক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, সরলাদেবীসহ আরও অনেকে লেখনী, যুদ্ধে যোগদানের আগ্রহ, অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অসামরিক জাতির কলঙ্ক ঘোচানোর চেষ্টা করেন। এতে বিশেষ ফল লাভ না হলেও প্রথম মহাযুদ্ধকালে বাঙালির জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ আসে। বাঙালির প্রবল সামাজিক আন্দোলনের ফলস্বরূপ গঠিত হয় ‘বাঙালি পল্টন’, যার নাম ছিল ‘ফর্টিনাইনথ্ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট’। যেসব বাঙালি নেতার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং প্রচেষ্টার ফলে বাঙালি পল্টন গঠন হয়েছিল, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
১৯১৬ সালে গঠিত বাঙালি পল্টনের সফলতার জন্য বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সর্বাত্মক সহযোগিতা দেন। তাঁরা এর সফলতার জন্য কলকাতায় ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি’ নামের একটি বেসামরিক সংস্থা গঠন করেন। বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটির প্রধান দায়িত্ব ছিল বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা, সৈনিক ভর্তিতে সরকারকে সহযোগিতা করা, এর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা ইত্যাদি। প্রাথমিকভাবে বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি প্রতি জেলায় একজনকে পল্টন গঠনে সহযোগিতা করার দায়িত্ব দেয়। রাজশাহীতে পল্টন গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, তাঁর নাম ১৯১৬ সালের ২৯ আগস্ট দ্য বেঙ্গলি পত্রিকায় প্রকাশ পায়।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রাজশাহীতে বাঙালি পল্টন গঠনে সহযোগিতা করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যকেও বাঙালি পল্টনে যোগদানের অনুমতি দেন। মনবাহাদুর সিংহ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র দত্তক পুত্র ছিলেন। ১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে মনবাহাদুর কলকাতায় এসে বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। চাকরিকালে মনবাহাদুর ভারতীয় কমিশন পান এবং সুবেদার (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ) পদে উন্নীত হন।
প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে বাঙালির সামরিক ইতিহাস নিয়ে রাজেন্দ্রলাল আচার্য ‘বাঙালির বল’ নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থে বাঙালি পল্টনসহ বাঙালির বিভিন্ন সময়ের সামরিক অর্জন বা কৃতিত্ব তুলে ধরেন। গ্রন্থে অক্ষয়কুমারের মন্তব্য সংযোজন করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ‘যিনি এই বহু তথ্যপূর্ণ বৃহৎ গ্রন্থ আদ্যন্ত পাঠ করিবেন, তিনিই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিবেন, ইহাতে জানিবার ও ভাবিবার কথার অভাব নাই। কি সেকালে কি একালে কোনো কালেই বাঙ্গালীর বাহুবলের অভাব থাকা স্বীকার করা যায় না। বিগত জগদ্ব্যাপী মহাযুদ্ধেও বাঙ্গালী বাহুবলের পরিচয় দিয়া সমগ্র সভ্য সমাজের নিকট পুনঃ পুনঃ প্রশংসা লাভ করিয়াছে।…….যাঁহারা দেশের লোক, দেশের অভ্যুত্থানের জন্য আগ্রহপূর্ণ, তাঁহারা অবশ্যই এরূপ গ্রন্থের সমাদর করিতে ক্রটি করিবেন না। এই শ্রেণীর গ্রন্থ সঙ্কলনের প্রয়োজন আছে। একখানি গ্রন্থে সে প্রয়োজন পর্যাপ্তরূপে সিদ্ধ হইয়া যায় নাই।’

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও প্রযুক্তি
অক্ষয়কুমার বাংলাদেশে প্রযুক্তি শিক্ষার উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি ইউরোপের শিল্পবিপ্লব এবং তাদের উন্নতি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আধুনিক শিল্প বা কলকারখানা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশের বিশেষ কোনো উন্নতি হবে না। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজশাহী রেশম শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় রাজশাহী থেকে রেশম রপ্তানি হতো। ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসিসহ বহিরাগত অনেকেই রাজশাহীতে রেশম ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে উন্নত প্রযুক্তির অভাবে রাজশাহীর রেশম চাষ ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, রপ্তানিও কমতে থাকে। অক্ষয়কুমার এই অবস্থার উন্নতিকল্পে জেলা পরিষদের সহযোগিতায় এবং স্থানীয় জমিদারদের আর্থিক অনুদানে রাজশাহীতে ১৮৯৮ সালে একটি রেশম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। অক্ষয়কুমার নিজে রেশম স্কুলের সম্পাদক ও শিক্ষক ছিলেন। কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত সীতানাথ গুহ ছিলেন প্রধান শিক্ষক। উভয়ের প্রচেষ্টায় স্কুলের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ স্কুলে গুটিপোকার উন্নত বীজ এবং তা থেকে সুতা প্রস্তুত, সুতা রং করে বস্ত্র তৈরির নতুন প্রযুক্তি বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হতো। রেশম স্কুলের সাহায্যে অদক্ষ শ্রমিকদের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে দক্ষ বা যুগোপযোগী করে তোলা হতো। বিদ্যালয়ের সফলতায় রাজশাহী থেকে গুটিপোকার বীজ রপ্তানি বেড়ে যায়, এখান থেকে জাপান, ইতালি, ইংল্যান্ড এবং উপমহাদেশের নানা স্থানে বীজের চালান যেতে থাকে। অযোধ্যার মহারাজ রামপাল সিং পণ্ডিত শীতল প্রসাদ উপাধ্যায়কে এ বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠান, ফিরে গিয়ে শীতলপ্রসাদ অযোধ্যায় নয়টি রেশম কারখানা চালু করেন। অক্ষয়কুমার শিল্পে প্রযুক্তির প্রয়োগ বিষয়ে তখনকার পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালিখি করেন। রেশম শিল্পের উন্নয়ন এবং জাতীয় শিল্পের বিস্তারে অক্ষয়কুমারের দৃষ্টান্তে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে রেশম চাষ শুরু করেন, যদিও উদ্যোগটি বেশি দূর এগোতে পারেনি। তবে রশম স্কুলের ধারণা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে বয়ন বিদ্যালয় চালু করেন।
অক্ষয়কুমারের প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের জন্য সারা ভারতে স্বীকৃত হন। ১৯০০ সালের ৩১ জানুয়ারি হিন্দুরঞ্জিকা পত্রিকায় প্রকাশিত নিচের সংবাদটি এই স্বীকৃতির উত্তম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলো।
তাতার প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্ষয় বাবু। পার্শী ধনকুবের মিঃ জেমশেঠজী তাতা একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্থাপনের জন্য গবর্মেন্টের হাতে ৩০ লক্ষ টাকা প্রদান করিয়াছেন। উক্ত বিদ্যালয়ে কি প্রণালীতে শিক্ষাদান আবশ্যক, তা সম্বন্ধে শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর শ্রীযুক্ত পেডলার সাহেব রাজশাহী সেরিকালচারাল স্কুলের মাননীয় শিল্প……[অস্পষ্ট] শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার মৈত্র বি, এল মহাশয়ের অভিমত জানিতে চাহিয়াছেন। তিনি শীঘ্রই তাহার অশেষ পাণ্ডিত্যপূর্ণ সুদীর্ঘ মন্তব্য গবর্মেন্টের সমীপে পেশ করিবেন। আমরা তাহার মতামতের সংক্ষিপ্ত মর্ম্ম সঙ্কলন করিতেছি, বরান্তরে তাহার অবিকল অনূদিত পাঠ উদ্ধার করিবার ইচ্ছা রহিল:-
“আমাদের দেশের শিক্ষিত যুবকদের জ্ঞান কার্য্যক্ষেত্রে প্রকাশিত হইবার অবসর পায় না তাহার প্রধান কারণ যে, তাহাদের সে জ্ঞান শুধু কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহাতে চর্চ্চা রাখিবার উপায় নাই। যদিও বা দুই এক জন কোন নতুন শিক্ষা তত্ত্ব আবিষ্কার করিতে সমর্থ হন। কিন্তু তাহার আনুসাঙ্গিক অবশ্য প্রয়োজনীয় কলকারখানাদির অভাবে তিনি তাহা শুধু লেখনী মুখে ব্যক্ত করিয়াই জ্ঞানতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেন। জ্বদিচ সে নবাবিস্কৃত তত্ত্ব বৈদেশিক শিল্প ব্যবসায়ীর হস্তে পড়িয়া তাহাদের ধনাগমের পথ সুপ্রশস্ত এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিরুৎসাহী ও দারিদ্র্যাবর্দ্ধন করিয়া থাকে। আমাদের মস্তিষ্কের ফল তাহারা উদারে উপভোগ করেন।
ইউরোপের জার্ম্মানী, সুইজারল্যান্ড গভর্নমেন্ট যেমন তত্রত্য অধিবাসীবৃন্দকে “হাতে কলমে” শিক্ষাদান করিয়া থাকেন, তোমাদেরও [ভারত গভর্নমেন্ট] কর্তব্য আমাদিগকে সেই প্রণালীতে শিক্ষাদান করা। পূর্বাপর আমাদের ঈদৃশ অনুযোগের উত্তরে তোমরা টাকার অভাব প্রদর্শন করিয়া আমাদের মুখবন্ধ করিয়াছিলে। কিন্তু এখন সে আপত্তি করিলে চলিবে না। আমাদেরই একজন স্বদেশ বন্ধু এই সৎকার্য্য জন্য বহু লক্ষ টাকা প্রদান করিতেছেন। এ অর্থ যদি কেবল কলমের কুফল প্রসবিনী শিক্ষাতেই ব্যয়িত হয় তবে মনে করিতে হইবে তাহার অসদ্ব্যবহার হইয়াছে। আপাতত আমাদের দেশে একদেশদর্শিনী লেখনী-শিক্ষায় কোনো ফল হইবে না। কলম-জ্ঞান আমাদের যথেষ্ট হইয়াছে—অন্ততঃ যে টুকু হইয়াছে তাহাতেই হাতের কার্য্য কিছু কিঞ্চিৎ চলিতে পারে। [এস্থলে অক্ষয় বাবু, আত্ম-অভিজ্ঞতা হইতে দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়াছেন]। আমি নিজে অতি সামান্য সামান্য যন্ত্র ও দ্রব্য সংযোগে যে সকল রাসায়নিক বর্ণবৈচিত্র এবং সুমেদুর কৌষেয়-তত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছি। তাহা হইতে কলমের জ্ঞান যে আমাদের যৎ-সামান্যও নাই তাহা বুঝা যায় না। পরন্তু, সুবৃহৎ যন্ত্রাদি এবং সুপ্রশস্ত কারখানা পাইলে, এই তত্ত্বজ্ঞান দ্বারাই অনেক বেশি কার্য্য এবং দেশের প্রভূত ধনাগমের আনুকূল্য করা যাইতে পারে। সুতরাং এই প্রকৃষ্ট প্রণালীতে শিক্ষাদান আমি সর্ব্বতোভাবে গৃহিত বিবেচনা করি এবং গভর্নমেন্টকে নির্ব্বান্ধাতিশয্য সহকারে অনুরোধ করি।”
ইত্যাদি—
শ্রীযুক্ত অক্ষয়বাবুর নির্ভীক লেখনী, কি রাজনৈতিক কি ঐতিহাসিক কি ক্ষেম ক্ষেমতায় সর্ব্ব বিষয়েই আমাদের রাজসাহীর গৌরবস্থানীয় আশা করি গবর্মেন্ট এরূপ সুবিজ্ঞ ব্যক্তির বক্তব্যগুলো পালন করিতে অবহিত হইবেন।
বাংলাদেশে তো বটেই, সারা ভারতেই অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র মতো প্রতিভাধর বাঙালি বিরল। অথচ তাঁর মৃত্যুর ৮০ বছর পরও এ দেশে তাঁর কোনো স্বীকৃতি মেলেনি, সার্ধশততম বছরেও কেউ তাঁকে স্মরণ করেনি।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ৩০, ২০১১