সমরজিৎ রায় চৌধুরী বাংলাদেশের শিল্পচর্চার দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পী। পাদপ্রদীপের আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন তিনি। তাতে করে শিল্প সৃজনের সময়টুকু তৈরি হয়। আত্মমগ্নতায় ডুবে থেকে শিল্পের সঙ্গে বিচরণ করেন প্রাচীন ঋষির মতো; ‘কিছুটা সময় দিলে তবে দুধে সর ভেসে ওঠে’—বিনয় মজুমদারের কবিতার এ পঙিক্তর মতোই হয়তো তিনি সময়কে আরও গাঢ় করে তোলেন শিল্পের গভীর দ্যোতনায়। কৈশোরের সূচনা থেকেই ছবি আঁকার অদম্য নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন তিনি; চিত্রশিল্পী হিসেবেই তিনি জীবনের স্বাদ গ্রহণের পথ খুঁজবেন, এ সিদ্ধান্ত তাঁর বালকবেলার। প্রকৃতির প্রতি গভীর সংবেদনায় অনুরক্ত সমরজিৎ রায় চৌধুরী বলেন, তিনি মানুষ আর বাংলার নিসর্গেই ছবি আঁকার প্রেরণা পেয়েছেন। ষাটের দশকের এ শিল্পী শিল্পযাত্রার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ক্যানভাসে গল্প বলেছেন ধাপে ধাপে। মগ্ন ছিলেন নানা নিরীক্ষা ও স্বকীয়তা নির্মাণের কঠোর পরিশ্রমে। বাস্তবধর্মিতা আর মূর্ত বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ তাঁর ক্যানভাস সময়ের প্রয়োজনেই নানা আকার, কাঠামো, অবয়বে কখনো জ্যামিতিক আবার কখনো বিমূর্ত হয়ে ওঠে। উজ্জ্বল রঙের সাবলীল ব্যবহার তাঁর চিত্রপটকে সজীব করেছে বারবার। বিবিধ সব নিরীক্ষায় কখন যে তাঁর কাজ রেখাপ্রধান হয়ে ওঠে, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। ‘খুব সুস্পষ্ট তাগিদেই রেখাপ্রধান হয়ে ওঠে আমার শিল্পকর্ম, এখানে কোনো ভণিতা নেই, বরং শিল্পের সব অনুষঙ্গের মতোই সূক্ষ্ম রেখার বিচরণ আমার শিল্পকর্মে।’ বলেন শিল্পী।
শিল্পী সমরজিৎ রায়ের স্টুডিও ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি অ্যাপার্টমেন্টে। যতখানি শিল্পীর স্টুডিও, এর চেয়ে বেশি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ছায়ায় আবৃত। শিল্পীর নাতনির সরব মুখরিত পদচারণ, খেলনা-বই-স্কুলব্যাগ আর ছবি আঁকার উপাদানের বৈচিত্র্যে ভরপুর এই স্টুডিও। বর্ষীয়ান এ শিল্পীকে যেন প্রকৃতির নিয়মেই নতুন প্রজন্মের জন্য ছেড়ে দিতে হচ্ছে স্থান। বইয়ের আলমারি, কাগজের রোল, ইজেল, ক্যানভাস, রংতুলির রাশভারী চেহারার আড়ালে যেন মোনালিসার মতো কটাক্ষ ঝুলে আছে স্টুডিওর আনাচকানাচে; এই হালকা চালের কারণ তার ফুটফুটে নাতনির সর্বব্যাপী উপস্থিতি। মিতবাক আপাতগম্ভীর সমরজিৎ রায় চৌধুরীর জীবনকে হয়তো নতুনভাবে অর্থবহ করে তোলে তাঁর স্টুডিওর নিষ্পাপ পরিবেশ।
তাঁর ছবির বিষয় এ দেশের মানুষ ও প্রকৃতি। তেলরং, জলরং, অ্যাক্রেলিক, প্যাস্টেল আর মিশ্রমাধ্যমে শিল্পী সমরজিৎ রায় ছবি আঁকেন। চারপাশের পরিবেশ-বৈচিত্র্যকে তিনি মুগ্ধ বিস্ময়ে অবলোকন করেন। গ্রামের ফেলে আসা স্মৃতি, শ্যামল প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ, পুরোনো ঢাকা শহর, অতীত দিনের স্বপ্নচারী অনুভূতি, আবহমান বাংলার লোকজ ঘটনাবলি, ঋতুবৈচিত্র্য, নবান্নের দিন, রাতের বিষণ্ন সময়, ফুল ও বাগান, মাছ ও পাখি, জেলে ও চাষি, বধূ ও প্রসাধনরতা রমণী। প্রতিদিনের পরিচিত ঘটনাবলিই আরও আপন হয়ে উঠে আসে শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরীর ছবিতে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সাহচর্যে গড়ে ওঠা তাঁর জীবনের ব্রতই ছিল শিল্পের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, দীর্ঘ ৫০ বছরের শিক্ষকজীবনে তিনি পালন করে চলেছেন মহান ব্রত।

সমরজিৎ রায় চৌধুরী: জন্ম ১৯৩৭ সালে কুমিল্লা জেলায়। তিনি ১৯৬০ সালে কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস, ঢাকা (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ থেকে স্নাতক করেন। পরবর্তী সময়ে গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে শিক্ষকতা করেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি দেশে-বিদেশে একক ও যৌথ প্রদর্শনী ও কর্মশালায় অংশ নেন। বর্তমানে তিনি ডিন হিসেবে রয়েছেন শান্ত-মারিয়ম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ফ্যাকাল্টি অব ফাইন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্ট বিভাগে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ২৫, ২০১১

%d bloggers like this: